(দিনাজপুর ২৪.কম) দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সার্বিক অবনতির কারণ অনুসন্ধান করে ২০১২ সালে ১৮ মে সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। দেশের এক সময়ের এবং বর্তমানের সাড়া জাগানো ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের সাথে কথা বলেই তৈরি করা হয়েছিল প্রতিবেদনটি। ‘ফোরামের দাপটে অস্থির ক্রীড়াঙ্গন’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ছাপা হওয়ার পর ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংগঠক পরিষদের (ফোরাম) মহাসচিব এবং নড়াই জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকু। আদালত বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেন। আদালতের এ নির্দেশ ওই বছর ৮ ডিসেম্বর থানায় পৌঁছালে ওসি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাবিবুর রহমানকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করেন। তদন্ত কর্মকর্তা মাত্র ৫টি কার্যদিবসের মধ্যে কেবলমাত্র বাদি ও স্বাক্ষীদের সাথে কথা বলেই বাদির পক্ষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে দেন।

কী ছিল বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে?

‘ফোরামের দাপটে অস্থির ক্রীড়াঙ্গন’ শীর্ষক বাংলাদেশ প্রতিদিনের ওই প্রতিবেদনে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মানের ক্রমাবনতির কারণ খোঁজা হয়েছিল। নানাভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছিল, ১৯৯৮ সাল থেকে ক্রীড়াঙ্গনে নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু হয়। এই নির্বাচনে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে জেলা পর্যায়ের সংগঠকরা আলাদা ফোরাম গঠন করেন। প্রথম পর্যায়ে ভালো সংগঠকরা এ ফোরামের নেতৃত্বে থাকায় ক্রীড়াঙ্গন তার সুফলও পেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই ফোরাম প্রধান দুই রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দলটির লেবাসধারী একশ্রেণীর ক্রীড়াসংগঠক ফোরামকে অর্থবিত্ত বানানোর মেশিনে পরিণত করেন। একই অবস্থা হয় বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে। মোটামুটি এই ছিল প্রতিবেদনটির বক্তব্য।

পুলিশ কী তদন্ত প্রতিবেদন দিল?

তদন্ত রিপোর্টে এসআই হাবিবুর রহমান দাবি করেছেন, তদন্তভার পাওয়ার পর তিনি ফোর্স নিয়ে নড়াইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার অফিস কক্ষে সরেজমিন উপস্থিত হন। সেখানে তিনি গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্ত করেন। মামলার বাদী, স্বাক্ষী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আর এরপরই তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান, ‘ফোরামের দাপটে অস্থির ক্রীড়াঙ্গন’ শীর্ষক সংবাদটির কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। বাদী নড়াইলের একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব এবং যথেষ্ট মান-সম্মানের অধিকারী। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় বাদী ও বাদীর সংগঠন ফোরামের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই মামলার আসামিদের বির’দ্ধে দণ্ডবিধির ৫০০/৫০১/৫০২ শাস্তিযোগ্য ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’

প্রমাণ হলো কীভাবে?

যেখানে প্রায় সব মামলার তদন্ত পুলিশের কাছে মাসের পর মাস ঝুলতে থাকে, সেখানে কীসের মোহে মাত্র ৫ কার্যদিবসের মধ্যেই এসআই হাবিবুর রহমান ও ওসি মতিয়ার রহমান এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে দিলেন? বাদীর অফিসে বসে বাদী ও স্বাক্ষীদের সাথে কথা বলেই তিনি বাদী মামলার বিবরণে যা দাবি করেছেন তার সত্যতা পেয়ে গেলেন! ‘বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদন মিথ্যা’-এটি কীভাবে প্রমাণ করলেন? বাংলাদেশ প্রতিদিনের ওই প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কী তদন্ত করা হয়েছে? প্রতিবেদনটিতে যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের অফিসে বসে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করা হলো। অথচ বাদী যাদের অভিযুক্ত করলেন, তাদের সাথে বিন্দুমাত্র কথা বলারও প্রয়োজন মনে করলেন না তদন্ত কর্মকর্তা! প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে রাজধানীতে। প্রতিবেদনের বিষয় সারাদেশের ক্রীড়াঙ্গন। অথচ, নড়াইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার অফিসে বসেই তদন্ত (!) করে বাদির অভিযোগ প্রমাণ করে ফেললেন উপ-পরিদর্শক হাবিবুর রহমান। সংশিস্নষ্টরা বলছেন, কোনরকম তদন্ত ছাড়াই কেবল ডেস্কে বসেই যে এই তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে, তা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাদীর কাছ থেকে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এমন তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হাবিবুর রহমান এখন নড়াইলেরই লোহাগড়া থানায় এবং ওসি মতিয়ার রহমান একই জেলার কালিয়া থানায় কর্মরত রয়েছেন।সুত্র-বাংলাদেশ প্রতিদিন