-সংগ্রহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) বহুল আলোচিত ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ আসামিরই ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টা ১৮ মিনিটে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

নুসরাত হত্যা মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১৬ জন। রায় ঘোষণার সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রায়ে বলা হয়, নারীর প্রতি সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনায় ১৬ আসামির অংশগ্রহণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। এছাড়া প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশ দেয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপাওয়া আসামিরা কে কিভাবে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসুন জেনে নেই।

১. অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা: হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেননি। কিন্তু পিবিআইয়ের ভাষায়, ‘তার চেয়ে বেশি’ করেছেন। নুসরাতের যৌন হয়রানির মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ, তাতে কাজ না হওয়ায় ভয়ভীতি দেখানো এবং পরে নুসরাতকে হত্যার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।

২. নূর উদ্দিন: নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নূর উদ্দিনের। পিবিআই বলছে, নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার আগে রেকি করেন তিনি আর নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার সময় নিচে থেকে পুরো ঘটনার তদারকিও করেন নূর উদ্দিন।

৩. শাহাদাত হোসেন শামীম: নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে শামীম ছিলেন ক্ষুব্ধ। হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে কার কী ভূমিকা হবে সেই পরিকল্পনা সাজান শামীম। কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে তিনি তার বোরখা ও কেরোসিন কেনার ব্যবস্থা করেন। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার সময় তিনি হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরেন।

৪. কাউন্সিলর মাকসুদ আলম: অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হলে ২৮ মার্চ তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ। বোরখা ও কেরোসিন কেনার জন্য তিনিই ১০ হাজার টাকা দেন।

৫. সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের: নুসরাতের ওড়না ছিঁড়ে দুই ভাগ করে পা বাঁধা এবং কেরোসিন ঢালার পর ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরানোর কাজটি জোবায়েরই করেন।

৬. জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন: বোরখা পরে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন জাবেদ। পা বাঁধা হলে পলিথিন থেকে কেরোসিন গ্লাসে ঢেলে তিনি নুসরাতের গায়ে ছিটিয়ে দেন। সব কাজ শেষে বোরখা খুলে পরীক্ষার হলে ঢুকে যান।

৭. হাফেজ আব্দুল কাদের: নুসরাতের ভাই নোমান মাদ্রাসার মূল ফটকে পাহারায় ছিলেন। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া হলে ২ মিনিট পরে তিনিই ফোন করে নোমানকে বলেন, তার বোন গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।

৮. আবছার উদ্দিন: ঘটনার সময় গেটে পাহারায় ছিলেন আবছার উদ্দিন। মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়াও তার দায়িত্ব ছিল।

৯. কামরুন নাহার মনি: কামরুন্নাহার মনি ২ হাজার টাকা নিয়ে দুটি বোরখা ও হাতমোজা কেনেন। হত্যাকাণ্ডে মনি সরাসরি অংশ নেন। ছাদের ওপর নুসরাতের হাত বাঁধা হলে তাকে শুইয়ে ফেলে বুকের ওপর চেপে ধরেন মনি।

১০. উম্মে সুলতানা পপি: অধ্যক্ষ সিরাজের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি সেদিন নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে যান। পরে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। তাতে রাজি না হওয়ার নুসরাতের ওড়না দিয়ে তার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলেন। নুসরাতকে ছাদে শুইয়ে চেপে ধরেন পপি।

১১. আব্দুর রহিম শরীফ: ঘটনার সময় তিনি মাদ্রাসার ফটকে পাহারায় ছিলেন। পরে তিনি ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার চালাতে থাকেন এলাকায়।

১২. ইফতেখার উদ্দিন রানা: মাদ্রাসার মূল গেটের পাশে পাহারা দেয়ার দায়িত্ব ছিল রানার। সে দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেন।

১৩. ইমরান হোসেন ওরফে মামুন: আগুন দেয়ার সময় মামুনও ছিলেন মাদ্রাসার মূল গেটের পাশে পাহারায়।

১৪. মোহাম্মদ শামীম: সাইক্লোন সেন্টারের সিঁড়ির সামনে পাহারায় ছিলেন। কেউ যেন ওই সময় ছাদে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করেন শামীম।

১৫. মাদ্রাসার সহ-সভাপতি রুহুল আমীন: স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন শুরু থেকেই এ হত্যা পরিকল্পনায় ছিলেন। ঘটনার পর পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। ঘটনার পর শামীমের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়। ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করেন।

১৬. মহিউদ্দিন শাকিল: ঘটনার সময় সাইক্লোন সেন্টারের সিঁড়ির সামনে পাহারায় ছিলেন। কাউকে উপরে উঠতে দেননি।

বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ফেনীর এই মাদরাসা ছাত্রীর খুনিদের ফাঁসির আদেশের খবর বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যম।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি রায় ঘোষণার পরপরই তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রধান সংবাদ করেছে নুসরাত হত্যা মামলার রায়ের এই খবর।

বিবিসি বলছে, এ ধরনের হত্যা মামলা যে দেশটিতে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে সেখানে নুসরাত হত্যার মামলায় রায় খুব অল্পদিনের মধ্যে দেয়া হয়েছে। আইনজীবী হাফিজ আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশে কেউ খুন করে যে পালিয়ে যেতে পারেন না; এটা প্রমাণিত। -ডেস্ক