(দিনাজপুর ২৪.কম) দেশে দুধের ঘাটতি থাকায় গুঁড়া দুধ আমদানি বাড়ছেই। সেইসঙ্গে আসছে নিম্নমানের গুঁড়া দুধও। এদিকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গুঁড়া দুধ থেকে কিছু দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানি পাস্তুরিত তরল দুধ তৈরি করছে। তৈরিকৃত এ দুধ আসল দুধের সঙ্গে মিলিয়ে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খামারিরা অন্যদিকে প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে একজন মানুষের প্রতিদিন ২৫০ মিলিলিটার দুধ পান করা উচিত। এ হিসেবে বছরে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টন দুধ প্রয়োজন। কিন্তু প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসেবে, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ৪৫ লাখ ৪১ হাজার টন তরল দুধ উত্পাদন হয়েছে। ঘাটতি প্রায় ১ কোটি টন। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে গুঁড়া দুধ আমদানিকারক ও দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী কিছু কোম্পানি। ফলে দেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ডেইরী শিল্প বিকাশ দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

গুঁড়াদুধ আমদানি বাড়ছেই

আসছে নিম্নমানের দুধও

দেশে চাহিদার তুলনায় দুধের ঘাটতি থাকায় প্রতি বছরই বাড়ছে গুঁড়া দুধ আমদানি। সেইসাথে আসছে নিম্নমানের গুঁড়া দুধও। বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার গুঁড়া দুধ আমদানি করা হয়। আর গুঁড়া দুধ আমদানির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে শুল্কহার কমায় এক্ষেত্রে উত্সাহিত হচ্ছে আমদানিকারকরা। গত পাঁচ অর্থবছরে গুঁড়া দুধ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কহার ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে ২৮ শতাংশ হয়েছে। বাজেটে শিশুখাদ্যের কথা বলে গুঁড়া দুধ আমদানিতে প্রায় প্রতি বছরই শুল্কহার কমানো হয়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে উত্পাদিত তরল দুধের ভ্যাট মওকুফ সুবিধা ছাড়া আর কোনো সুবিধা নেই। এমনকি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী মেশিনপত্র, মোড়কীকরণ উপাদান আমদানিতে ভ্যাট প্রদান করতে হয়।

জানা গেছে, দুগ্ধশিল্পে ব্যবহূত মিল্ক ট্যাংকার, এসেপটিক প্যাকেজিং আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ, দুগ্ধজাত পণ্যের মোড়কীকরণ উপাদান আমদানি পর্যায়ে ৩২ শতাংশ শুল্ক ও দুগ্ধশিল্পের জন্য শীতলীকরণ ট্যাংক, মিল্কিং মেশিন আমদানির ক্ষেত্রে ৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। এছাড়া দুগ্ধশিল্পের ওপর ৫ শতাংশ করপোরেট কর রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে দুধের বাজার সমপ্রসারণের বিরাট সুযোগ রয়েছে। এজন্য সরকারের নীতি সহায়তার কোন বিকল্প নেই। সরকারের নীতি সহায়তা পেলে দেশ একদিকে যেমন দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে অন্যদিকে এ খাতে বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

গুঁড়া দুধ থেকে তৈরি হচ্ছে পাস্তুরিত তরল দুধ!

অধিক লাভের আশায় কিছু দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান গুঁড়া দুধ থেকে পাস্তুরিত তরল দুধ তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছে। কিন্তু এভাবে গুঁড়া দুধ থেকে তরল দুধ তৈরিতে দুধে গুণগত মান বজায় থাকে না। যা স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে দু’ভাবে দুধ বাজারজাত করা হয়। একটি তরল, অন্যটি গুঁড়া দুধ। কোম্পানিগুলো চিলিং সেন্টারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গোয়ালা এবং সমিতির মাধ্যমে দুধ সংগ্রহ করে। এরপর চিলিং সেন্টার থেকে কুলিং ট্যাংকার (শিতলীকরণ)-এর মাধ্যমে দুধকে দুই ডিগ্রি তাপমাত্রায় নিয়ে আসা হয়। ওই দুই ডিগ্রি তাপমাত্রার দুধ কুলিং ট্রাকে করে ফ্যাক্টরিতে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রক্রিয়াজাত কারখানায় দুধকে কয়েকটি প্রক্রিয়ার পর প্যাকেটজাত করে বাজারে সরবরাহ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছর রমজানসহ বিভিন্ন উত্সব-পার্বণে যখন তরল দুধের চাহিদা বেশি থাকে, মূলত তখনই অধিক মুনাফার আশায় গুঁড়া দুধ থেকে তরল দুধ তৈরি করে কিছু কোম্পানি।

এ প্রসঙ্গে প্রাণ ফুডস্-এর (প্রাণ দুধ) বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় তরল দুধের সরবরাহ কম। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে কোন কোন কোম্পানি গুঁড়া দুধ থেকে তরল দুধ তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রাণ তা করে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)- এর মহাপরিচালক ইকরামুল হক গতকাল দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, কোন কোম্পানি যদি তরল দুধ তৈরিতে আমদানিকৃত গুঁড়া দুধ ব্যবহার করে তবে তা অবৈধ। কারণ গুঁড়া দুধ থেকে আবার তরল দুধ তৈরি করলে গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

তৈরি হচ্ছে নকল দুধ

দুধের চাহিদাকে পুঁজি করে তৈরি হচ্ছে নকল দুধ। দুগ্ধভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত পাবনা ও   সিরাজগঞ্জে একটি চক্র এই নকল দুধ তৈরি করছে। এই দুধ তারা বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করছে। এরসঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও কিছু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ছানার পানিই নকল দুধ তৈরির প্রধান উপকরণ। আর এই ছানার পানির সঙ্গে ক্ষতিকর স্কিম মিল্ক পাউডার, ফরমালিন, কাটার অয়েল, সোডা ও দুধের ননীর সঙ্গে দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করা হয়। পরে আসল দুধের সঙ্গে নকল দুধ মিশিয়ে বিভিন্ন নামি-দামি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে তা সরবরাহ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুধের ঘনত্ব নির্ণয়ে ল্যাকটোমিটার ব্যবহার করে ভেজাল শনাক্ত করা যায়। কিন্তু এ অসাধু চক্র ভেজাল দুধে ফরমালিনসহ স্কিম মিল্ক পাউডার ব্যবহার করে। এতে দুধের ঘনত্ব বেড়ে যায়, দুধ তাজা থাকে। ফলে ভেজাল বিরোধী অভিযানে ল্যাকটো-মিটার দিয়ে এই সূক্ষ্ম প্রতারণা ধরা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না।

এ প্রসঙ্গে মিল্কভিটার অন্তর্বর্তীকালিন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য (পরিচালক) এ্যাড. শেখ আব্দুল হামিদ লাবলু দিনাজপুর ২৪.কমকে বলেন, সমপ্রতি মোহনপুর প্লান্টে দুধ সংগ্রহের সময় হাতেনাতে ভেজাল দুধ সনাক্ত করা হয়েছে। পরে এজন্য কয়েকটি সমিতিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, একটি সিন্ডিকেট রয়েছে এর পেছনে। দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।(ডেস্ক)