(দিনাজপুর২৪.কম) একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকরের পর জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীর লাশ কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পাবনার সাঁথিয়ায় তার নিজ গ্রাম মনমথপুরে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে তার নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়।  বুধবার ভোরে লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পাবনার সাঁথিয়ায় পৌঁছায়।

নিজামীর জানাজায় ইমামতি করেন তার ছেলে ব্যারিস্টার নাজীব মোমেন। পুরো দাফনের সময় বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশ মোতায়েন ছিল। এর আগে আজ ভোরে নিজামীর লাশ মনমথপুর গ্রামে পৌঁছলে তা গ্রহণ করেন তার চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ আল মামুন ও ভাতিজা আবদুর রহিম খান।

মঙ্গলবার দিনগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। মরদেহ দাফন করার জন্য সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। আগে-পিছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও পুলিশ প্রহরায় মরদেহ ঢাকার শাহাবাগ, মহাখালী, উত্তরা, গাজীপুরের চন্দ্রা, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জের ওপর দিয়ে তার গ্রামের বাড়ি পাবনার সাঁথিয়ায় নেওয়া হয়।

মরদেহ ঢাকা থেকে বাড়ি পর্যন্ত নেওয়া নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে নেয়। এজন্য ঢাকা থেকে সাঁথিয়া পর্যন্ত মহাসড়কের প্রতি আধা কিলোমিটার পর পর সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, কারাগার থেকে বেরিয়ে ফার্মগেট, উত্তরা হয়ে বাইপাইল দিয়ে টাঙ্গাইল হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর উপর দিয়ে পাবনার সাঁথিয়ায় যাবে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। এজন্য মহাসড়কের গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ অংশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

ফাঁসি কার্যকরের পরেই সাঁথিয়ায় আনন্দ মিছিল বের করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা নিজামীকে সাঁথিয়ায় কবর না দেওয়ার দাবি জানান। রাতে সাঁথিয়া পৌর সদরে আনন্দ মিছিল বের করে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীরা। মিছিলটি পৌর সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

কবর খননসহ মরদেহ দাফন সম্পন্ন করে নিজামীর স্বজনরা। এলাকায় এখানো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছে।

৫ মে বৃহস্পতিবার জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর রিভিউ খারিজ করে ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। এর আগে গত মঙ্গলবার রিভিউ শুনানি শেষে ৫ মে রায়ের দিন ধার্য করা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর আসামিপক্ষে ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন।

বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১

মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতাসহ মানবতাবিরোধী তিনটি অপরাধে গত ৬ জানুয়ারি মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে নিজামীর করা আপিল আংশিক মঞ্জুর করে রায় ঘোষণা করা হয়।

গত ১৫ মার্চ নিজামীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতির স্বাক্ষরের পর এ রায় প্রকাশ করা হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আপিলেও মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহালের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে গত ২৯ মার্চ আবেদন করেন নিজামী। ৭০ পৃষ্ঠার মূল রিভিউ আবেদনের সঙ্গে ২২৯ পৃষ্ঠার নথিপত্রে তাঁর দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে ৪৬টি (গ্রাউন্ড) যুক্তি তুলে ধরা হয়।

নিজামীর বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযোগের মধ্যে আটটি প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে চারটি অভিযোগে তাকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের বিরুদ্ধে নিজামীর আপিলের রায় ঘোষণা করা হয় চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি। আপিলে আরও তিনটি অভিযোগ থেকে নিজামী খালাস পান। বাকি পাঁচটি অভিযোগে তাকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ, এর মধ্যে তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এগুলো হলো পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার রূপসী, বাউসগাড়ি ও ডেমরা গ্রামের ৪৫০ জনকে নির্বিচার হত্যা ও ধর্ষণ, ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে হত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা। বাকি দুটি অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন সর্বোচ্চ আদালত। -ডেস্ক