মো. আব্দুল আজিজ,(দিনাজপুর২৪.কম) নাটোরে এখন চলছে সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের শাসন। নিজস্ব সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব আর পুলিশের নির্লিপ্ততায় নাটোরে একচ্ছত্র অধিপতি হয়েছেন সরকারদলীয় এই এমপি। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তিনি। সম্প্রতি র‌্যাবের হাত থেকে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনায় সমালোচিত এমপি শিমুলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী লালনসহ বিভিন্ন অপকর্মের হোতাদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিমুল এমপির প্রশ্রয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। এমপির নির্দেশ ছাড়া সদর থানায় মামলা পর্যন্ত করতে পারেন না ভুক্তভোগীরা। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস-নির্যাতনের     শিকার হয়ে মামলা করতে গেলে উল্টো পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হয়। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, মামলা করতে গেলে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন এমপির অনুমতি ছাড়া মামলা করা যাবে না। এমনকি এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে গিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। এসপি অভিযোগকারীকে এমপির সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি শহরের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাব্বির বাহিনীর প্রধান রেদওয়ান সাব্বিরকে হাতকড়া পরানো অবস্থায় র‌্যাবের হাত থেকে জনসম্মুখে ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনায় এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এমপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রেদওয়ান সাব্বিরের বাহিনীর বিরুদ্ধে শহরে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, নিরীহ মানুষকে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, এমপি শিমুলের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে রেদওয়ান সাব্বির বাহিনী শহরবাসীর জন্য মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। নাটোর শহরে একচ্ছত্র শাসন কায়েম করতে এমপি শিমুল রেদওয়ান সাব্বির বাহিনীকে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রেদওয়ান সাব্বির নিজেকে নাটোর জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বলে দাবি করেছেন। কিন্তু নাটোর জেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বাশিরুর রহমান খান চৌধুরী এহিয়া জানান, সাব্বির যুবলীগের কোনো পদে নেই। দলের নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা করেন। তিনি একজন অস্ত্রধারী ক্যাডার। তাকে এমপির গাড়িবহরে এবং তার বিভিন্ন সভায় দেখা যায়। বাশিরুর আরও জানান, সাব্বির তার একমাত্র ছেলে আকিবের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, ২৩ মার্চ শহরের ব্যস্ততম ছায়াবাণী সিনেমার মোড় থেকে জেলা ওলামা দলের সাধারণ সম্পাদক ও ঠিকাদার হাফেজ শফিকুল ইসলামকে অপহরণ করে সাব্বির বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় নাটোরের ক্রীড়া সংগঠক আবদুল্লাহ আল মামুন বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা মামুনকে মারধর করে এবং তার মালিকানাধীন ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রয় প্রতিষ্ঠান রেদোয়ান স্পোর্টস ভাঙচুর করে হাফেজ শফিককে তুলে নিয়ে যায়। পরে অপহৃত ঠিকাদারকে অমানুষিক নির্যাতনের পর ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দিলে সদর থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর প্রাণের ভয়ে নির্যাতিত ব্যবসায়ী থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করা থেকে বিরত থাকেন। পুলিশ এ ঘটনা জানার পরও সাব্বির বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। রেদোয়ান সাব্বিরের হাতে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নাটোরের ইউপি চেয়ারম্যান পঞ্চাশোর্ধ্ব গোলাম সারোয়ার। তার চোখ, হাত-পা বেঁধে সারা শরীরে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে উবুড় করে শুইয়ে পাথরচাপা দিয়ে রাখা হয়। মুক্তিপণের ৩ লাখ টাকা জোগাড় করতে তার পরিবারের ৮-৯ ঘণ্টা দেরি হয়। পুরো সময়টাই সারোয়ারকে পাথরচাপা দিয়ে রাখা হয়। নির্যাতনে তার হাত ভেঙে যায়। পাথরচাপার কারণে তার হার্টের সমস্যা দেখা দিয়েছে। মারাÍক আহত এই চেয়ারম্যান বর্তমানে আত্মগোপনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গোলাম সারোয়ারসহ তার পুরো পরিবার এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ১৭ জুলাই নাটোর আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাব্বির ও তার লোকজন তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। সাব্বিরের টর্চার সেল ছায়াবাণী সিনেমা হলের একটি কক্ষে নেওয়া হয় গোলাম সারোয়ারকে। সেখানেই তাকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। গোলাম সারোয়ারের দুই ভাই ৩ লাখ টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। এ সময় তার দুই ভাইকেও বেঁধে রেখে নির্যাতন করে সাব্বির ও তার লোকজন।আহত গোলাম সারোয়ারের সঙ্গে রবিবার সন্ধ্যায় যোগাযোগের পর তিনি আতঙ্কে কোনো কথাই বলতে চাচ্ছিলেন না। এক পর্যায়ে বলেন, পুলিশ একটি জিডিও নেয়নি। বর্তমান যে এসপি রয়েছেন তিনি এমপির দোহাই দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এমপি যা বলবেন সেটাই করতে হবে। গোলাম সারোয়ার বলেন, আমরা এই নতুন এসপির বদলির অপেক্ষায় আছি। একই কায়দায় সাব্বির বাহিনী শহরের কানাইখালী উত্তরা ব্যাংকের সামনে থেকে ইটভাটা মালিক মহির উদ্দীনকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায় তাদের টর্চার সেলে। পরে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে তাকে ছাড়িয়ে নেন তার স্বজনরা। একই কায়দায় ইউসিবিএল ব্যাংক থেকে কাজ শেষে বেরিয়ে আসার পর ছাতনী ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার বাবর আলীকে মারধর করে ৭০ হাজার টাকা ও তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সাব্বির বাহিনীর হাতে এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন।রেদওয়ান সাব্বিরের কর্মকাণ্ড ফেসবুকে তুলে ধরার অপরাধে গত শুক্রবার বিকালে শহরের কানাইখালী চাউলপট্টি এলাকায় গুলমেরাজ হ্যামলেট ও জিয়াউল হক হিমেলকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় হ্যামলেট দৌড়ে পালাতে পারলেও হিমেলকে তুলে নিয়ে গিয়ে সাব্বির বাহিনীর ক্যাডাররা প্রায় ৫ ঘণ্টা নির্যাতন করে ১০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এ ব্যাপারে নাটোর সদর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, হিমেল আটকের বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে সাব্বিরের বিরুদ্ধে থানায় দুটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। অভিযোগ রয়েছে, নাটোর সদর থানার ওসির সঙ্গে সাব্বিরের রয়েছে সখ্য। গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও সাব্বির নিয়মিত সদর থানায় যাতায়াত করে এবং তাকে ওসির সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখা যায়।শহরের নিমতলার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ছায়াবাণী সিনেমা হলসংলগ্ন টর্চার রুমে শুধু নির্যাতনই করা হয় না, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে নারী নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। সাব্বির ছাড়াও এ বাহিনীর সদস্যরা হলো গোবিন্দ মালু, বান্ধি হাসান, রনি, খোকন, রকি, বাপ্পী, কাজল ও আরিফ। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নাটোর সদর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। রেদওয়ান সাব্বির রবিবার সন্ধ্যায় দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও অপবাদ। অভিযোগকারীদের কাউকেই তিনি চেনেন না। তিনি বলেন, শুধু চেয়ারম্যান সারোয়ার সাহেবকে চিনি। তাকে আমি চাচা ডাকি। তিনি এত জনপ্রিয় যে তাকে তো এক ঘণ্টাও আটকে রাখা যাবে না। নিজের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে স্বীকার করে সাব্বির বলেন, এসব মামলায় আমি জামিনে রয়েছি। জেলা পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার দিনাজপুর২৪.কমকে জানান, তিনি নতুন দায়িত্বে এসেছেন। এমপির নির্দেশ ছাড়া মামলা দায়ের করা যায় না বলে যে অভিযোগ উঠেছে তা সঠিক নয়। শহরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে রানা নামে এক ব্যক্তি নিজেকে এমপির পিএ পরিচয় দিয়ে বলেন, এমপি সাহেব একটি প্রোগ্রামে রয়েছেন। আধা ঘণ্টা পর কলব্যাক করবেন। পরে বার বার চেষ্টা করেও এমপি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।