(দিনাজপুর২৪.কম) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮৯ জন বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসীর মধ্যে ৭ লাখ ২৭৮ জন নারী রয়েছেন। পুরুষ কর্মীদের বিদেশে যাওয়া তাদের পরিবার ও সমাজ ভালোভাবে গ্রহণ করলেও নারীরা নানাভাবে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সমস্যার মধ্যে বিদেশে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছেন। আবার বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের অধিকাংশই যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। ওইসব নারী শ্রমিক পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
এসব নারী শ্রমিক বাড়িঘর সংসার– সবকিছু হারাচ্ছেন ঋণের কারণে। দেশের কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট করার সুযোগ করা হয়েছে। কিন্তু সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। নারী শ্রমিকদের প্রর্যাপ্ত লোন দেওয়া হলে তাদের জন্য সুবিধা হতো। অথচ বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো থেকে কোটি কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিজ্ঞমহল দাবি করছেন।
বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের বড় অংশকেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শারীরিক নির্যাতন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়া, কর্ম-ঘণ্টা বেশি, ফোন ব্যবহারের সুযোগ না থাকার চিত্র প্রতিনিয়ত সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নির্যাতিত কোনো নারী শ্রমিকের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কোনো দূতাবাস নির্যাতনকারী এমপ্লেয়ারের বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশি নারী কর্মীদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কূটনীতি শক্তিশালী নয় বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছেন।
জানা গেছে, পুরুষ কর্মীর তুলনায় উপার্জিত অর্থ নারীরা বেশি দেশে প্রেরণ করছেন। যেখানে বেশিরভাগ পুরুষ শ্রমিক গড়ে ৫০ ভাগ টাকা প্রেরণ করে সেখানে গড়ে নারী শ্রমিকরা ৯০ ভাগ টাকা দেশে প্রেরণ করছেন। জিরো মাইগ্রেশনে নারী শ্রমিকরা এখন বিদেশ যেতে পারছেন। কিন্তু জিরো মাইগ্রেশনে নারী শ্রমিক প্রেরণ সর্বমহলে প্রশংসিত হলেও প্রত্যেক নারীকর্মী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দালালি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দালালের মাধ্যমে নারীকর্মী সংগ্রহ করার কারণে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী প্রেরণের সার্ভিস চার্জের প্রাপ্ত অর্থ থেকে উল্লিখিত অর্থ দালালকে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
শ্রম অভিবাসন বিশ্লেষক, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, গত বছর সাড়ে ১০ লাখ কর্মী বিদেশে প্রেরণ করার সফলতা থাকলেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাটা বড় ব্যর্থতা। জিরো মাইগ্রেশনে নারীকর্মী প্রেরণ আমাদের বড় সাফল্য। ফলে স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা অথবা হতদরিদ্র নারীদের প্রভাব ফেলছে। অদক্ষ কর্মী প্রেরণের পাশাপাশি দক্ষ কর্মী প্রেরণে বেশি মনোযোগী হওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
অপর সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে নারী শ্রম অভিবাসী ছিলেন ১ লাখ ২১ হাজার ৯৮৫ জন। এরমধ্যে ৮৩ হাজার নারী শ্রমিক সৌদি আরবে। বর্তমানে ২ লাখ ৪ হাজার ৭২৯ জন নারী রয়েছেন সৌদি আরবে। মোট কর্মীর ৩০ শতাংশই সেদেশে রয়েছেন। এরপর ১ লাখ ২৯ হাজার ৮০২ জন নারী শ্রমিক রয়েছেন জর্দানে। ১ লাখ ২৬ হাজার ১ জন রয়েছেন, আরব আমিরাতে। এছাড়া লেবাননে ১ লাখ ৪ হাজার ২০৭ জন। ওমানে ৬৪ হাজার ৬০২ জন। এসব নারী অভিবাসীরা উল্লিখিত দেশগুলোতে গৃহকর্মী, হাসপাতাল, পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর সূত্র মতে, বিশ্বের ১৬৫টি দেশে ১ কোটি ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৯ জন বাংলাদেশি শ্রমঅভিবাসী কাজ করছেন। এরমধ্যে ১১টি দেশÑ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, লেবানন, জর্ডান ও লিবিয়ায় সবচেয়ে বেশি অভিবাসী রয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, বিদেশে নারী অভিবাসী শ্রমিকরা যৌনসহ নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়টি কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও বিশেষ কারণে পদক্ষেপ নিতে পারছে না। অনেক দরিদ্র পরিবারের নারী শ্রমিক দালালের খপ্পরে পড়ে বিনা টাকায় বিদেশ যাচ্ছেন। সেখানে দালালরা তাদের দিয়ে অর্থ উপার্জন করছে। এতে অধিকাংশ নারীই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এখনো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ফিলিপাইনের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের কম মজুরির কারণ হচ্ছে অধিক পরিমাণ প্রফেশনালস ও দক্ষ কর্মীর অভাব।
এদিকে গত মঙ্গলবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ‘জার্নালিস্ট’স ফোরাম অন মাইগ্রেশন’ (জেএফএম) আয়োজিত ‘বিশ্ব শ্রমবাজার ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অথিতির বক্তব্যে বলেন, বিদেশে কর্মী প্রেরণে কোনো সিন্ডিকেট গ্রহণযোগ্য নয়। এধরনের কোনো সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। দুষ্টচক্রের হাত থেকে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে মুক্ত করতে হবে। রাজধানীর রমনা চায়নিজ রেস্টুরেন্টে অভিবাসনবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠনের অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ কুয়েতের শ্রমবাজারের জটিলতা নিরসনে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শ্রম রপ্তানিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট বন্ধে সরকার তৎপর রয়েছে। অভিবাসন খাত নিয়ে বেশি লেখালিখির মাধ্যমে তা জনগণের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরো সহজ করতে সরকার কাজ করছে। এ কাজে সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি সঠিকভাবে তুলে ধরলে অবশ্যই তা বিবেচনায় নেওয়া হবে। দালালদের খপ্পর থেকে অভিবাসীদের রক্ষার জন্য সকলকে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেন তিনি।
ওই সংগঠনের সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সিনিয়র রিপোর্টার মো. সাজ্জাদ হোসেনের সঞ্চালনায় শ্রমঅভিবাসন বিশ্লেষক, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ, সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির প্রমুখ শ্রমঅভিবাসী ও নারী শ্রমিকদের নানা সমস্যা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। -ডেস্ক