(দিনাজপুর২৪.কম) চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ দেশের মানুষ বেশিরভাগ সময়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে কারণ দেশজুড়ে ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তারের ছড়াছড়ি। বাড়ছে তাদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য। বিভিন্ন নামের বাহারি ডিগ্রি ব্যবহার করে চকচকে সাইনবোর্ড সেঁটে নিরীহ ও সাধারণ রোগীদের প্রতারিত করে আসছে তারা। ফলে সেবার ক্ষেত্রে এক চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভুয়া ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার খবর মিলছে। দেশজুড়ে এই অবস্থা এখন উদ্বেগজনক। চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন প্রদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নীরব দর্শকের ভূমিকা যা দেশবাসীর স্বাস্থ্য সেবার প্রতি চরম অবহেলা। আমরা এবিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করি। বিএমডিসির হিসাবে শুধু রাজধানীতে আড়াই সহস্রাধিক ভুয়া ডাক্তার রয়েছেন। সারা দেশে এই সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। তবে বাস্তবে বিএমডিসির দেওয়া পরিসংখ্যানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ভুয়া ডাক্তার দেশজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভুয়া ডাক্তারের পাশাপাশি জাল ডিগ্রিধারী ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের’ সংখ্যাও কম নয়। তারা এমবিবিএস পাসের পর নামের আগে-পরে দেশ-বিদেশের ভুয়া উচ্চতর ডিগ্রি ব্যবহার করে বছরের পর বছর রোগী দেখছেন, হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের ফি। ভুল চিকিৎসা, অবহেলা আর চিকিৎসা-বাণিজ্যের নির্মমতায় একের পর এক রোগী মারা যাচ্ছেন। গত বছর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে দুই শতাধিক রোগীর ‘ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু’ ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সময়সীমায় র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভ্রাম্যমাণ আদালতে অর্ধশতাধিক ভুয়া ডাক্তারকে আটক এবং তাদের জেল-জরিমানা করেছে। ভুয়া ডিগ্রিধারী চিকিৎসকদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যের সত্যতা স্বাস্থ্য মহাপরিচালক নিশ্চিত করেছেন। তার মতে, চিকিৎসা সেক্টরে ভুয়া ডাক্তার ও অপচিকিৎসা ব্যবস্থাটি বছরের পর বছর ধরে দুরারোগ্য ক্যানসারের মতোই চেপে আছে। এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার লক্ষ্যে বিএমডিসিকে ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি। তারপরেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পড়াশোনা না জানলেও যে কেউ পেয়ে যান সব ধরনের সার্টিফিকেট। সামান্য কিছু টাকা খরচ করলে তারা হতে পারবেন সার্টিফিকেটধারী ডাক্তার। পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত থাকলেও চলবে। খরচের পরিমাণও নাগালের মধ্যেই। ভারত বা অন্য দেশের সার্টিফিকেট পেতে ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ করলেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘেঁষা এলাকা থেকে এসব সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে সব মিলিয়ে ৫-৬ হাজার টাকা লাগে। ডেন্টাল কলেজের সার্টিফিকেটের জন্য ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা গুণতে হয়। কেবলমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজের সার্টিফিকেট পেতে হলে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা গুনতে হয়। এখানেই শেষ নয়, ভারত থেকে এমবিবিএস ও মেডিসিন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি এমডির সার্টিফিকেট মাত্র ১২ হাজার টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। এমনি একজন কথিত ডাক্তার পাঁচ বছর ধরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেজে প্র্যাকটিস চালিয়েছেন। ভেজালবিরোধী মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে র‌্যাব-৪-এর সদস্যরা মিরপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন পিসিল্যাব নামের প্রাইভেট চেম্বার থেকে তাকে আটক করে। তখনই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। এরপর র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা রাজধানীর অলিগলি ও অভিজাত এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে ধরনের দেড় শতাধিক ভুয়া ডাক্তারের সন্ধান পান। দেশের চিকিৎসাসেবায় নাজুক পরিস্থিতি বিদ্যমান। সুচিকিৎসা যেমন দুর্লভ তেমনি দুর্লভ সুচিকিৎসকের। সরকার প্রতিবছরই চিকিৎসা খাতে বড় আকারের বাজেট বরাদ্দ দেয়। কেবল চিকিৎসক বা চিকিৎসা উপকরণের জন্যই এই বাজেট বরাদ্দ করা হয় না। বাজেটে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারে যে বিভাগগুলো রয়েছে তাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালনের জন্য বাজেটের অর্থ ব্যয় করার কথা। কিন্তু ফলাফল কেবল বেদনাদায়কই নয় আতঙ্কেরও বটে। ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। আমরা সরকারকে সেই দাবিপূরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই। সুস্থ জাতি গঠনের জন্য যা খুবই জরুরি। -ডেস্ক