দেশে কিডনি রোগে মৃত্যু প্রায় তিনগুণ বেড়েছে - ছবি : সংগৃহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) দেশে দিন দিন কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বেড়েছে মৃত্যুর পরিমাণও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, কিডনি জটিলতায় দেশে ২০১৯ সালে যত মানুষ মারা গেছেন, তার প্রায় তিনগুণ মারা গেছেন ২০২০ সালে।

২০২০ সালে শীর্ষ মৃত্যুর কারণ
বিবিএসের নতুন জরিপে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে সাড়ে আট লাখের বেশি মানুষ বিভিন্নভাবে মারা গেছেন। মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হার্ট অ্যাটাক।

বিবিএসের মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২০ সালে জন্ম ও মৃত্যুসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এ কে এম আশরাফুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ইতোমধ্যে ২০২০ সালে জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত প্রাক্কলিত তথ্য সমন্বয় করা হয়েছে। জুন মাসে পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

আশরাফুল হক বলেন, এটি একটি খানা জরিপ। তিন লাখের বেশি গৃহস্থালির ওপর গবেষণা চালানো হয়েছে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০২০ সালে সর্বমোট আট লাখ ৫৪ হাজার ২৫৩ জন মানুষ মারা গেছেন। এর মধ্যে শীর্ষ মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে হার্ট অ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক, শ্বাসতন্ত্রের অসুখ, ক্যান্সার, অ্যাজমা, কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা ও নিউমোনিয়া ইত্যাদি।

প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল হক জানান, ২০২০ সালের সংগৃহীত তথ্যের সাথে ২০১৯ সালের তথ্য তুলনা করেছেন তারা। এতে দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকে ২০২০ সালে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ মারা গেছেন। এই সংখ্যা আনুমানিক এক লাখ ৮০ হাজার ৪০৮ জন। ২০১৯ সালেও দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যুর কারণ ছিল হার্ট অ্যাটাক।

২০২০ সালে বাংলাদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মানুষের মৃত্যু হয়েছে ব্রেইন স্ট্রোকে। এতে মারা গেছেন ৮৫ হাজার ৩৬০ জন। ২০১৯ সালে ব্রেইন স্ট্রোকে মারা যান ৪৫ হাজার ৫০২ জন। এ ছাড়া কিডনি সংক্রান্ত জটিলতায় ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে প্রায় তিনগুণ মানুষ মারা গেছেন। ২০২০ সালে কিডনি জটিলতায় মারা গেছেন ২৮ হাজার ১৭ জন, যা ২০১৯ সালে ছিল ১০ হাজার ৬২২ জন।

কিডনি রোগে মৃত্যু বাড়ার কারণ
অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর নতুন পরিসংখ্যান নিয়ে বিবিএসের জরিপ নিয়ে এখনো কোনো পর্যালোচনা করেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বিবিসিকে বলেছেন, ২০২০ সালে মৃত্যুর কারণগুলোর সাথে কোভিড-১৯-এর সংযোগ কতটা রয়েছে সে বিষয়ে কোনো বিশ্লেষণ এখনো করেনি অধিদফতর।

কিডনি সংক্রান্ত জটিলতায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়ে যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক সুলতানা বলেছেন, ‘সাধারণভাবে ধারণা করা যায়, করোনার কারণে হাসপাতালগুলোতে কিডনি সংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যাহত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা নিজেরাও সতর্কতার অংশ হিসেবে হাসপাতালে যাননি। সেটা মৃত্যুর হার বাড়ার একটা কারণ হতে পারে।’

বাংলাদেশে ১০ মার্চ পর্যন্ত কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আট হাজার ৪৯৬ জন মানুষ।

অধ্যাপক সুলতানা বলেছেন, করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মানুষের বড় অংশটির বয়স ৬০ বছরের বেশি। তাদের শরীরে কো-মরবিডিটি বা একাধিক প্রাণঘাতী ব্যাধির উপস্থিতি ছিল।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজীর সহযোগী অধ্যাপক হাসিনাতুল জান্নাত বলছেন, মহামারীর কারণে কিডনি চিকিৎসা বিশেষ করে যাদের নিয়মিত চেকআপ ও ফলোআপ করতে হয় তাদের চিকিৎসা বিঘ্নিত হয়েছে, আর তার ফলেই হয়তো মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশে করো শনাক্ত হওয়ার কিছু দিন পরই লকডাউন শুরু হয়। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য অনেক হাসপাতালকেই কেবলমাত্র করোনার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়।

সহযোগী অধ্যাপক হাসিনাতুল জান্নাত বলেন, ‘যে কারণে কিডনি রোগীদের নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হয়। করোনার সময় তারা সেটা করতে পারেননি। তাছাড়াও বেশিরভাগ সড়ক বন্ধ ছিল, গণপরিবহন ছিল না, সতর্কতার জন্যও হাসপাতালে যেতে পারেননি অনেক রোগী। এর ফলে যথাসময়ে চিকিৎসা পাননি হয়তো অনেক জটিল রোগী। যে কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে হয়।’

তবে এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজির আউটডোরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ জন মানুষ সেবা নিতে আসেন।

বাংলাদেশে কত মানুষ কিডনি সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন, সে সংক্রান্ত সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে দুই কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে ভুগছে।

সূত্র : বিবিসি