(দিনাজপুর২৪.কম) ডাক ভবন, আদালত ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার নকল স্ট্যাম্প ছাপিয়ে বাজারজাত করছে জালিয়াতচক্র। চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। অন্যদের ধরতে ডাকভবনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গোয়েন্দা নজরদারি করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ডাক বিভাগের কতিপয় দুর্নীতিবাজের সহযোগিতায় নগরীর ফকিরাপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ছাপানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নকল স্ট্যাম্প বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের ডাকঘরসহ স্টেশনারি দোকানেও সরবরাহ করছে। শুধু তাই নয়, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার-ক্যাশিয়ারদের মাধ্যমেও তা বিক্রি করছে।

এতে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জালিয়াতচক্র নকল স্ট্যাম্পগুলো উচ্চ কমিশনে আফিস, আদালত,গার্মেন্ট ও কলকারখানার জিএম বা ক্যাশিয়ার, সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্যাশিয়ারদের কাছেই বেশি সরবরাহ করছে।

চক্রটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ এবং স্ট্যাম্প বিক্রির টাকা বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন করছে। ওইসব মোবাইল ফোনের সূত্র ধরেই গোয়েন্দা পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম অভিযানে মাঠে নেমেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের সর্বত্র প্রতিদিনই মানুষ নকল স্ট্যাম্প কিনলেও তা ধরা পড়ছে না। নকল টাকা যত সহজে শনাক্ত করা সম্ভব, নকল স্ট্যাম্প ধরা ততটাই কঠিন। নকল স্ট্যাম্পের বিরুদ্ধে কখনো কোনো বিশেষ অভিযান বা পদক্ষেপ নেয় না প্রশাসন।

এ সুযোগে নকল স্ট্যাম্পের মার্কেট গড়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত কোর্ট-কাছারি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও নোটারি চেম্বারসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের কাছে জিএমরা লাখ লাখ টাকার নকল স্ট্যামপ বিক্রি করছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম্পিউটার প্রিন্টার ও ডিভাইসের মাধ্যমে খুব সহজেই নকল স্ট্যাম্প তৈরি করছে চক্রটি। চক্রটি স্ট্যাম্পগুলো পুরান ঢাকার কোর্ট-কাচারি এলাকায় গুদামজাত করে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাজধানীর পল্টন এলাকায় অবৈধভাবে সরকারি রেভিনিউ স্ট্যাম্প নকল করে দেশের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একাউন্টস শাখার কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বিক্রি করার তথ্য পাওয়া যায়। এ তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের টিম গত ৯ আগস্ট অভিযানে নামে।

একপর্যায়ে ১১৯ নম্বর ফকিরাপুলের একটি প্রেসে নকল স্ট্যাম্প ছাপানোর সন্ধান পায়। পরে ওই প্রেস থেকে রেভিনিউ গাম্প ছাপানো অবস্থায় মো. নাইম ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম নামে ২ জনকে গ্রেপ্তার করে। এসময় সেখান থেকে ১০ টাকা মূল্য মানের মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকার নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প, বিভিন্ন মূল্যের স্ট্যাম্প, ছাপানোর প্লেট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি উদ্ধার করে।

ওইদ্ধ প্রেস থেকে সরকারবিরোধী হিজবুত তাজরীরের পোস্টার, লিফলেটও পায় ডিবি। এ ঘটনায় পল্টন থানায় ডিবির কর্মকর্তা সুশংকর মল্লিক বাদি হয়ে ১০ আগস্ট ২০ নম্বর মামলা করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গত ২২ আগস্ট চক্রের প্রধান রাসেল আহমেদ শান্তকে গ্রেপ্তার করে।

ডাক বিভাগের সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ নন পোস্টাল স্ট্যাম্প জালিয়াতি প্রতিরোধে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে নন-পোস্টাল স্ট্যাম্প, আঁঠালো স্ট্যাম্প, কোর্ট ফিসহ এইসব রেভিনিউ স্ট্যাম্প গাজীপুরের ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস (টাকশাল)-এ ছাপিয়ে দেশের সকাল জেলা প্রশাসকদের (ট্রেজারি) মাধ্যমে বিক্রি করা হয়।

ডাক বিভাগের সহকারী পরিচালক (স্ট্যাম্প) সাকিল আহম্মেদ জানান, দুই ধরনের স্ট্যাম্প ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপিয়ে জেলা প্রশাসকের ট্রেজারির মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। নন পোস্টাল স্ট্যাম্প ও পোস্টাল স্ট্যাম্প। আর এসব স্ট্যাম্প ইউভি, লাইটের মাধ্যমে নকল কিনা তা সনাক্ত করা হয়ে থাকে।

স্ট্যাম্পের ওপর ইউভি লাইট ধরলে তাতে ফাইভার কাগজে ‘জি ও ভি’ ছাপ দেখা যাবে। আর নকলকারীদের বিষয়ে বলেন, প্রশাসনের কাজ। একবার ডাক ভবনের পাশের বিভন্ন দোকান থেকে গোয়েন্দারা স্ট্যাম্প নিয়ে এসে দেখিয়েছিলেন।

তা আসল ছিল বলে জানান তিনি। তিনি আরও জানান, গত ২০১৮- ২০১৯ অর্থ বছরে ডাক বিভাগ শুধু ১৬৩৬ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৫শ টাকার নন পোস্টাল স্ট্যাম্প বিক্রি করে রাজস্ব আয় করা হয়েছে।

অপর এক সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে বিভিন্ন মূল্যের ১ হাজার ৩৫৭ কোটি ৮৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকার রেভিনিউ স্ট্যাম্পসহ ননপোস্টাল স্ট্যাম্প বিক্রি করেছে ডাক বিভাগ।

এর মধ্য থেকে ৪০ কোটি ৭৩ লাখ ৫৪ হাজার ৬৪০ টাকা ডাক বিভাগ কমিশন পেয়েছিল। আর ১০ টাকা মূল্যের ১৬৬ কোটি টাকার রেভিনিউ স্ট্যাম্প বিক্রি করা হয়েছে। নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি করা হয়েছিল ৪৪১ কোটি ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। কপি স্ট্যাম্প বিক্রি করা হয়েছে ২ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার।

ডাক বিভাগের এই বিপুল অংকের রেভিনিউ স্ট্যাম্পের পাশাপাশি জালিয়াতচক্রও নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ছাপিয়ে ব্যবসা করছে।

ডিবি অফিস সূত্র জানায়, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উত্তোলন, চিঠিপত্র আদান-প্রদানসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার রেভিনিউ স্ট্যাম্প সাধারণত ডাকা বিভাগ থেকেই ক্রয়-বিক্রয় হয়। রেভিনিউ স্ট্যাম্প বিক্রির পুরো অর্থই বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব খাতে জমা হয়। কিন্তু নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প বাজারে না থাকলে রাজস্ব অনেক বেশি হতো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের কয়েকটি চক্র নগরীর ফকিরাপুল, টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিখুঁতভাবে সরকারের রাজস্ব খাতের ‘রেভিনিউ স্ট্যাম্প’ ছাপছে। চক্রটি বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে সুকৌশলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিক্রি করছে। এগুলো সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসের বেতনের খাতায় লাগিয়ে অভিনব পন্থায় বিক্রি হচ্ছে।

আর যারা বেতন নিচ্ছেন, তারা ওই রেভিনিউ স্ট্যাম্পটি জাল না আসল তার খবর নেন না। আবার বিভিন্ন পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টারের মাধ্যমেও জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প বিক্রি করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চক্র দশ টাকার রেভিনিউ স্ট্যাম্প মাত্র ২ টাকা দামে গার্মেন্ট, কলকারখানার জিএম বা ক্যাশিয়ারের কাছে পাইকারী দরে বিক্রি করে।

প্রতিষ্ঠানের জিএম বা ক্যাশিয়ার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের খাতায় ১০ টাকার স্ট্যাম্প লাগিয়ে বেতন দেওয়ার সময় ওই স্ট্যাম্পের দশ টাকা করে আদায় করে। এভাবেই সারা দেশে সরকারের রেভিনিউ স্ট্যাম্প ছাপিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। রাজধানীতে ১৫ থেকে ১৬ জনের একচক্র রয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজনের নাম ঠিকানা পেয়েছে ডিবি। তাদের নজরদারিতেও রাখা হয়েছে। জাল টাকার মতো স্ট্যাম্পের বিরুদ্ধেও কোর্ট-কাচারি ও অন্যান্য স্থানে নজরদারি চলছে। চক্রটি বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে বলে ফকিরাপুলের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, এ ঘটনায় প্রথম ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর গত ২২ আগস্ট রাসেল নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের পাশাপাশি স্ট্যাম্প নকলকারীদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। -ডেস্ক