(দিনাজপুর২৪.কম) ভারত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হলেও এদেশে ধর্মের ভিত্তিতে জনগণনা করাটা দস্তুর। এ ছাড়াও ভারতে জাতিগত জনগণনা করা হয়। জাতিগত গণনার রিপোর্ট দিল্লি এখনও প্রকাশ করেনি। যাকে সাদা বাংলায় জাতপাত বলা হয়, তারই একটি সাধুবাংলা হল জাতি, ইংরেজিতে বংশগত এই জাতিকে কাস্ট (পধংঃব) বলে। ভারতবর্ষে জাতপাত বা এই কাস্টের বা জাতিকেন্দ্রিক রাজনীতির একটি বেগবান ধারা বয়ে চলেছে দীর্ঘদিন। কাস্ট-কে সামাজিক শ্রেণি হিসেবে গণ্য করার রাজনৈতিক আদর্শ একটি স্বীকৃত আদর্শ। এই রাজনৈতিক আদর্শের বর্তমান প্রবক্তা হলেন মুলায়ম সিংহ যাদব, লালুপ্রসাদ যাদব, শরদ যাদব প্রমুখ। এঁরা চান জাতিগত জনগণনার রিপোর্ট কেন্দ্র (দিল্লি) দ্রুত প্রকাশ করুক। তা না করে ধর্ম-পরিচয় ভিত্তিক জনগণনার রিপোর্ট কেন্দ্র এত সোত্সাহে প্রকাশ করল কেন?
এই রিপোর্টটি হল ২০০১-২০১১, এই দশ বছরের গণনার রিপোর্ট, যা চার বছর চাপা ছিল, কেন্দ্র প্রকাশ করেনি। চার বছর পর জনসমক্ষে আনা হল। আনা হল কখন? বিহারের নির্বাচন সামনেই। ঠিক তার আগে বিজেপি তার ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির ফায়দা তুলতে এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনতে কেন্দ্রকে প্রণোদনা দিয়েছে। এটি বিরোধীদের অভিযোগ। মনে রাখতে হবে এই অভিযোগ এনেছেন যাদবরাও। তারা বিজেপিকে জব্দ করতে জাতিগত গণনার রিপোর্ট হাতে পেতে চাইছেন।
মনে রাখতে হবে, জাতি মানে শ্রেণি। তপোসিলি জাতি ও উপজাতি নিয়ে ভারতবর্ষের রাজনীতি শ্রেণি-রাজনীতির এক চরম উত্তালতা অর্জন করেছে। কারণ জাতি-উপজাতিরা নিম্নবৃত্তিক শ্রেণি ও নিতান্ত দরিদ্র। ভারতবর্ষের সংবিধান অনগ্রসর শ্রেণিকে এগিয়ে নেবার রাজনীতিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংবিধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও এক মস্ত ব্যাপার। এমনকী ভারতবর্ষে সংরক্ষণের রাজনীতি কখনও কখনও প্রচণ্ড উগ্র পন্থায় আত্মপ্রকাশ করে। ভারতের গণতন্ত্র এই উগ্রতাকে সমীহ করে। আদাব জানায়। নমস্কার করে।
আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহের শেষের দিকে দেখা গেল সংরক্ষণ নিয়ে এক অতি উগ্র আন্দোলনে তহিসনহিস হয়ে যাচ্ছে গুজরাত। নরেন্দ্র মোদীর গুজরাতে পটেল (পতিদার)-রা সংরক্ষণের দাবিতে ক্ষেপে উঠেছে। যত দিন যাচ্ছে, সংরক্ষণের দাবিতে ভারতীয় নানান অনগ্রসর শ্রেণি (ঙ.ই.ঈ.)- আন্দোলন ৩৩ জোরদার হচ্ছে। ওবিসি হল আদার ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস। জাতি ও অনগ্রসর শ্রেণি-আন্দোলন বর্তমান ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদার পরিসরকেই প্রসারিত করে চলেছে বলে অনেকে মনে করেন। অনেকের বিচারে এই সব আন্দোলনের উগ্রতা মোটে সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু পটেলরা বরাবর প্রভাবশালী সচ্ছল গোষ্ঠী, এরা সংরক্ষণের আওতায় পড়ে না। এমনটাই মনে করে গুজরাত প্রশাসন। তা হলে এই আন্দোলন কেন? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, এই আন্দোলনের অসারতার যুক্তি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভবিষ্যতে জাতপাত ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাটাকেই তুলে দেবেন এমন সম্ভাবনা রয়েছে।
এই যখন অবস্থা তখন বিজেপিকে আহ্লাদিত করবে এমন একটি রিপোর্ট হল ধর্মভিত্তিক আদমশুমারি। তাতে দেখা যাচ্ছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে হিন্দু কমেছে, কিঞ্চিত্ বেড়েছে মুসলিমরা। কিন্তু এই কিঞ্চিত্ বাড়াটাও কি মুসলিমদের পক্ষে ঠিক হয়েছে? বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ এ ব্যাপারে কিঞ্চিত্ শোরগোল তোলবার চেষ্টা করে কেমন যেন মিইয়ে গেলেন। ঠিক যেন জমাতে পারলেন না। তার কারণ কী? সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র ভাই মোদী চাইছেন না, তাঁর দলের নেতারা কোনও ধরনের সাম্প্রদায়িক আচরণ ও কথাবার্তায় লিপ্ত হয়ে বিরোধীদের রাজনৈতিক সুবিধা করে দেয়। ফলে কোনও কোনও নেতা শোরগোল তোলবার চেষ্টা করলেন নিতান্ত মৃদু কণ্ঠে। তাছাড়া মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিটা আসলে বৃদ্ধিই নয়।
যে-দশকটি নিয়ে কথা হচ্ছে, সেই দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি তো কোনও ধর্মগোষ্ঠীর মানুষেরই থামেনি। বৃদ্ধিটা কী পরিমাণে এবং কী হারে ঘটল তাই নিয়ে বচসা চলেছে। পরিসংখ্যানবিদরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন এ কথা যে, এই দশকে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার (স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের হিসেব ধরলে) সবচেয়ে নিম্নমুখী। কাজিয়া বা জিগিরটা তা হলে কিসের? হিন্দুর বৃদ্ধির যে-হার তার তুলনায় কিছুটা বেশি মুসলিমদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার। সেই স্বল্পতা বোঝাতে বাঙালি সাংবাদিক ‘কিঞ্চিৎ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কিছুটা’ না লিখে ‘কিঞ্চিৎ’ লিখলে অভিব্যক্তি এক্ষেত্রে জোরদার হয়, এ জন্য ওই সাংবাদিককে ধন্যবাদ এই প্রতিবেদকের। কিন্তু এ কথাও ঠিক, বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর মধ্যে তুলনা টানাটা এই রিপোর্টের উদ্দেশ্য। তা নইলে এই রিপোর্টের কোনও মানে হয় না।
ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সেক্ষেত্রে ভারত কি এই জাতীয় ধর্মপরিচয়ভিত্তিক জনগণনা সমর্থন করে? যদি নাই করে, তা হলে এমন রিপোর্ট প্রকাশ পায় কী করে? এটা যদি বেআইনি হত, তা হলে কথা ছিল! কিন্তু কাজটা ভারতবর্ষের আইন-বিরুদ্ধ নয়। কিন্তু কেন নয়? এই রিপোর্ট কী কাজে লাগবে? সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি ছাড়া কী কাজে লাগবে? জবাব হচ্ছে, লাগবে। অনগ্রসর মুসলিম সমাজকে এগিয়ে নিতে গেলে এই রিপোর্ট কাজ দেবে। শুধু জন্মহার বৃদ্ধি না হ্রাস, তা দিয়েই হবে না ঠিক, সেই সঙ্গে যুক্ত করতে হবে মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বা অবস্থানের বিবরণ; যদি সেটাও সামনে আনা যায়, তা হলে এই রিপোর্ট উন্নয়নকামী প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন কাজের রূপায়নে বিশেষ কাজ দেবে, কারণ তিনি সংখ্যালঘু মুসলিমদের সামগ্রিক উন্নয়নের ব্যাপারে আন্তরিকভাবে আগ্রহশীল।
মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আলোচ্য দশকে সবচেয়ে নিম্নমুখী, কিন্তু হিন্দুর তুলনায় হারের হিসেবে অল্পই বেশি, যদি এই অল্পত্ব ঘুচিয়ে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে আরও নিম্নমুখী করতে হয় এবং হিন্দুর সমপরিমাণ হ্রাস সম্ভব করতে হয়, তা হলে কী করতে হবে? সমাজতত্ত্ববিদরা বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে যে সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছি, সেই সম্প্রদায়ের যাবতীয় অনগ্রসরতা দূর করা। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, উন্নত আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোর সুযোগ ভারতবর্ষের মুসলিমরা কতটুকু পায়- নিতান্ত কম! সাচার কমিটির রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মুসলিমদের অবস্থা অনগ্রসর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষদের চেয়েও খারাপ এবং করুণ। এই রিপোর্ট হাতের কাছে রেখে বিজেপি নেতাদের মানুষের ধর্মীয় খতিয়ানের চর্চা করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর বোঝা উচিত, তিনি বিকাশ-পুরুষ; মুসলিমদের বাদ দিয়ে কোনও বিকাশ কি আদতে বিকাশ? এই সব প্রশ্নের সত্ দিশার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, একটি দেশের খাঁটি গণতন্ত্রের ধ্বজা।
বিজেপির সকলে নয়, কোনও কোনও নেতা এবং আশ্চর্যের বিষয়, সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনাকে ‘বেআইনি অনুপ্রবেশের’ সঙ্গে জুড়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন। অথচ পুরোটা তথ্য-বিশ্লেষক, উন্নত বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়েছে বলে মনে হয় না। তথ্যগুলি কিছু এই বেলা দিই। পাঠক বিচার করবেন। বাংলাদেশ-সীমান্তবর্তী আসামে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে বেশি (৩.৩)। পশ্চিমবঙ্গে বৃদ্ধির হার ১.৮। অথচ কেরলে এই বৃদ্ধি ১.৯ (এটি সীমান্তরাজ্য নয়)। উত্তরাখন্ড ২.০ (সীমান্তরাজ্য নয়)। দেখা যাচ্ছে সঙ্ঘ-পরিবার এবং বিজেপির অনুপ্রবেশতত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে তথ্য সমর্থিত নয়।
প্রধানমন্ত্রী মোদীজিই সকল ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ভরসাস্থল। মনে রাখতে হবে, খ্রিস্টান জনসংখ্যার বিশেষ হেরফের হয়নি। হারের দিক থেকে ‘কিঞ্চিৎ’ বৃদ্ধিও ঘটেনি হিন্দুর তুলনায়। হিন্দুত্ববাদীরা যেন গির্জা জ্বালিয়ে না দেয়, দেখবেন নরেন্দ্র ভাই, প্রার্থনা করি। (সংগৃহীত)

লেখক :পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত কথাশিল্পী।(ডেস্ক)