(দিনাজপুর২৪.কম) ঘড়িতে বারোটা বাজতেই বাড়ি -লাগোয়া ঘাটের দিকে ছুট লাগায় সে৷ দিনভর গঙ্গায় গা ডুবিয়ে বসে থাকে৷ রোদ পড়লে তবেই ঘরে ফেরা৷ সমুদ্রগড়ের ডাঙাপাড়ার বছর বারোর কিশোর আনোয়ারের এটাই এখন প্রতিদিনকার রুটিন৷ মাত্র ১২ বছরেই তার ওজন যে ১০১ কেজি! গরম সহ্য হয় না৷ শরীর ঠাণ্ডা রাখতেই গঙ্গাবক্ষে আশ্রয় নেয় রোজ৷ সঙ্গে দু’বেলা চার কিলো চালের ভাত, আর তাল তাল আলুসেদ্ধ৷ মুর্শিদাবাদের সেই লোকমান শেখের মতো৷ এলাকার এক হাতুড়ের কাছে ছ ‘মাস অন্তর ছেলের ওজন মাপান বাবা আক্কালনবি শেখ আর মা শহরবানু বিবি৷ এ বার তা করতে গিয়েই দেখা গেল বিরাট কিশোরের ওজন ছাড়িয়েছে ১০০৷
তাতেই বাবা -মায়ের চক্ষু চড়কগাছ৷ পাঁচ বোনের একটা আদরের ভাই৷ বাবা -মায়েরও চোখের মণি৷ অতিরিক্ত ওজনের জন্য পাড়ায় কেউ পাত্তা দেয় না আনোয়ারকে৷ গঙ্গায় যখন ডুব দিয়ে বসে থাকে, পাড়ার ছেলেরা জলহস্তি বলে খেপায়৷ কিছু দিন আগে পর্যন্তও স্কুলে যেত সে৷ ডাঙাপাড়া থেকে দু’কিলোমিটার দূরে সেই স্কুল৷ সব কিছু ঠিক থাকলে এ বার ক্লাস সিক্সে পড়ত ছেলেটা৷ একে দূরত্ব, তায় বন্ধুদের টেরাবাঁকা কথা৷ পড়াশোনাটাই ছাড়তে বাধ্য হলো সে৷ কাঁহাতকই বা ছোট্ট আনোয়ারের এই অপমান মেনে নেবে পরিবার! আনোয়ারের বয়স যখন ৩, তখন থেকেই তার ওজন বৃদ্ধিতে এমন অস্বাভাবিকতা নজরে আসে৷
দাদা মঞ্জুর আলি শেখ বলছিলেন, ‘ওকে নিয়ে খুব ভয়ে থাকি৷ রাতে নিঃশ্বাস নেয়ার সময় মনে হয় এই বুঝি দম আটকে গেল৷ গরমকাল তো বটেই, শীতেও গঙ্গায় বেশ কিছুক্ষণ গা ডুবিয়ে থাকতে হয় ওকে৷’
দিনে কেজি তিনেক গোশত একাই খেয়ে নিত পারত ছেলেটা৷ এখন তাই গোশত দেয়াই হয় না ওকে৷ মা শহরবানু বিবির আক্ষেপ করছিলেন, ‘বুঝতে পারি, ছেলেটার খিদে মেটে না৷ কী করব, সামর্থ্যে কুলোয় না৷’ টানাটানির সংসার৷ অনেক সময় চালটুকুও বাড়িতে থাকে না৷ খিদের জ্বালায় আনোয়ার তখন বাসনপত্র ভাঙাভাঙি শুরু করে৷ রাতভর কান্নাকাটি করে৷ বিদ্যুৎ চলে গেলে আর এক সমস্যা৷

ঘরের মধ্যেই বালতি বালতি পানি ঢালতে হয় ছেলের গায়ে৷ ছেলেকে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরাতে এ বার তাই উঠেপড়ে লেগেছেন পরিজনরা৷ খাবারের লোভ দেখিয়ে আনোয়ারকে প্রায়শই সকাল সকাল নিজের দোকানে নিয়ে যাচ্ছেন দাদা৷ লুচি, মন্ডা -মিঠাইয়ে ভালোই মন ভরছে আনোয়ারের৷ ছেলেকে তার পর জোর করে খেলতে পাঠানো হচ্ছে৷ পাড়ার সমবয়সীরা এ বিষয়ে সহযোগিতা করছে তাকে৷ খেলা বলতে শুধু ক্যারামে মন আনোয়ারের৷

তবে বাইরে দৌড়াদৌড়ির চেয়ে ঘরে বসে ক্যারম খেলাই বেশি পছন্দ ছেলের৷ বাড়তি ওজনের সমস্যা মেটাতে কিছু দিন আগে ডাক্তারের পরামর্শও নিয়েছিলেন মা-বাবা৷ আনোয়ারকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কালনা মহকুমা হাসপাতালে৷ চিকিৎসকেরা সন্তাহ খানেক ভর্তি রেখেছিলেন তাকে৷ তবে তাতে কাজের কাজ কিছু হয়নি৷ সেখান থেকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে রেফার করে দেয়া হয় আনোয়ারকে৷ কালনা মহকুমা হাসপাতালের সুপার কৃষ্ণচন্দ্র বড়াই জানান, ‘আনোয়ারের যে ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন, তার পরিকাঠামো নেই এখানে৷ তাই পিজিতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি৷’
কালনার চিকিত্সকের পরামর্শ মতো কয়েক দিন আগে আনোয়ারকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পিজিতে৷ দিন দুয়েক সেখানে ভর্তি ছিল সে৷
নানা পরীক্ষানিরীক্ষা হয়৷ তাতেও আনোয়ারের বাবা-মা খুব যে আশার আলো দেখছেন, এমন নয়৷ বাবা আক্কালনবি শেখ তো বলেই ফেললেন, ‘কথাবার্তা শুনে খুব একটা ভরসা পাইনি৷ ছেলেটাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ঘুম ছুটেছে৷’ যত দিন যাচ্ছে, বাড়তি ওজনের কারণে শারীরিক ও মানসিক দু’দিক থেকেই ক্রমশ ভেঙে পড়ছে আনোয়ার৷ এই অবসাদ কাটানোর উপায় তা হলে কী ? কলকাতার মেডিকা সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালের নিওন্যাটোলজি অ্যান্ড পেরিনেটাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান তথা শিশু বিশেষজ্ঞ অশোক মিত্তল জানালেন, সমস্যাটা আনোয়ারের একার নয়৷ শুধু শিশু কেন, ভারতে আবালবৃদ্ধবনিতা এখন স্থূলতার শিকার৷ সমস্যাটা কিছুটা বংশগত, কিছুটা পরিবেশজনিত৷ আনোয়ার যদি বংশগতভাবে এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়, তা হলে তার জেনেটিক থেরাপি প্রয়োজন৷
যা খুব বড়সড় হাসপাতাল ছাড়া হয় না৷ আর সমস্যাটা যদি পরিবেশজনিত হয়, সে ক্ষেত্রে ছেলেটার খাদ্যাভাস আর জীবনযাত্রাকেই দায়ী করছেন তিনি৷ কয়েক দিন আগে একই রকম সমস্যা নিয়ে অশোকবাবুর কাছে আর এক শিশু এসেছিল৷ বাড়তি ওজনের জন্য ঘুম হতো না তার৷ জিভ ভারী হয়ে পিছনের দিকে চলে যেত, নিঃশ্বাসে বাধা দিত৷ যার জেরে শিশুটির হূদযন্ত্রে সমস্যাও তৈরি হয়েছিল৷ আনোয়ারের পরিবারের তা হলে কী করণীয়? অশোকবাবুর মত, শিশুটিকে এখনই কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ দেখানো হোক৷ তার পর প্রয়োজনে হরমোন বিশেষজ্ঞ৷ স্কুলে ফেরাতে ওর কিছুদিন কাউন্সেলিংও প্রয়োজন হতে পারে৷ সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা আর ঠিকঠাক খাদ্যাভাস৷ কিছু দিনের মধ্যেই আনোয়ার ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে বলে আশা তার৷ -ডেস্ক
সূত্র : এ. সময়