মো: কায়ছার আলী (দিনাজপুর২৪.কম) “এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান, জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তুপ পীঠে, চরে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল। এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। অবশেষে সব কাজে সেরে আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে করে যাব আশীর্বাদ, তারপর হব ইতিহাস।” ক্ষণজন্মা কিশোর কিন্তু কালজয়ী কবি যাঁকে কালিক ভাবনার অনন্য প্রতিভাস বলা হয়। সেই সুকান্ত ভট্টাচার্য্য তাঁর “ছাড়পত্র” কবিতায় নতুনদের জন্য স্থান ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। ১৯৮০ সালে মে মাসে শিশুদের বিনোদনের জন্য প্রয়োজনীতা উপলব্ধি করে সে সময় মহামান্য উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি জনাব আব্দুস সাত্তার দিনাজপুর শহরের গোর-এ-শহীদ ময়দান বা বড় মাঠের দক্ষিণে শিল্পনগরী পুলহাট রোডের পশ্চিমে কয়েক একরের বিশাল জায়গা নিয়ে মনোরম এবং সুন্দর পরিবেশে “দিনাজপুর পৌরসভার শিশু পার্ক” এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে ছিলেন ১৩ সদস্য বিশিষ্ট “দিনাজপুর পৌরসভা কমিটি এবং তত্ত্বাবধায়নে ছিলেন ৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। সেই ঐতিহাসিক নাম ফলক এবং স্বপ্নের শিশু পার্ক আজ চরম অনাদর আর অবহেলার স্বীকার। দিনাজপুর জিলা স্কুলের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক মোঃ তসলিম উদ্দীন এবং সাপ্তাহিক বিরল সংবাদের স্নেহের সাংবাদিক মতিউর রহমান এর বারবার উদাক্ত আহবানে শেষ পর্যন্ত সাড়া দিয়ে গতকাল চিরচেনা শিশু পার্কে একাকী ঘুরতে গেলাম। পার্ক মানে উদ্যান, বাগান। শিশু পার্ক মানে শিশুদের বাগান, যেটা বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু। তবে দুঃখের সাথে বলতে হয় আজ সেটা শিশুদের নামে আছে, বাস্তব পরিবেশে বা দখলে নেই। এখন জটিল এবং ইতিহাসের কঠিনতম সময় ঘরে বসে পার করছে আমাদের ছোট্ট সোনামণিরা। ফলে তারা স্থূলতায় ভুগছে আর মুটিয়ে যাচ্ছে। শিশু পার্কে সকালে আর বিকালে দেখা যাচ্ছে যে, ডায়াবেটিস রোগীরা হাঁটাহাঁটি এবং ব্যায়াম করছেন। দূর থেকে পার্কটি দেখতে এখনো সুন্দর, চারিদিকে গাছপালা আর প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে শিশুদের জন্য নানারকম রাইড আছে, দোলনা আছে কিন্তু সেগুলো বেশি ব্যবহার হয় বলে মনে হয় না। ব্যবহার অনুপযোগী শাপলার ফোয়ারা আছে, নেই ওয়াটার সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা। সবুজ শ্যামল ঘাসগুলিতে শিশুদের পদচারণায় অভাবে কোথাও কোথাও অপ্রয়োজনীয় আগাছা জন্মেছে। নেই সঠিক পরিচর্যা। গেইট আছে, গেইট ম্যান নেই। পশ্চিমে সীমানা প্রাচীরের একটি গেইট ভেঙ্গে গেছে। প্রাচীরের উপরে লোহার গ্রীল গুলো কোথাও কোথাও ভেঙ্গে গেছে। ১৯৭৩ সালে নির্মিত টিনসেডের দিনাজপুর শিশু খেলা ঘর নামে শরীর চর্চা কেন্দ্র আছে। তবে সেটা অনেক পুরাতন এবং ব্যবহার অনুপযোগী। জোড়ায় জোড়ায় তরুণ-তরুণী বা কপোত-কপোতী বিভিন্ন জায়গায় অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে বসে মধুরতম সময় পার করছে। তাদের মেলামেশা দেখে মনে হচ্ছে আসলে এটা ডেটিং স্পট। চটপটি, ফুচকা বাদাম বিক্রেতারা প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিলে তাদের বসতে দিয়ে খাওয়া দাওয়ার মাধ্যমে ব্যবসার সাথে উৎসাহ দিচ্ছে। আপনি বা আপনারা যদি সেখানে পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে যান তবে অবশ্যই বিব্রতবোধ করবেন। তাদের প্রেমলীলা বা নিরাপদ অভয় আশ্রমের দৃশ্য শতভাগ দৃষ্টিকটু বটে। পার্কের পাশে কাদের বাসভবন বা অফিস তা লিখলাম না। পাঠকের সাথে দিনাজপুর শহরবাসী তা জানেন। এর আগে গণমাধ্যমে শিশু পার্কের খবর বা প্রতিবেদন প্রচার হয়েছিল কি না তা আমার জানা নেই। রাজধানী বা বিভাগীয় শহুরে শিশুদের জন্য চিড়িয়াখানা বা বিনোদনের জায়গা আছে। তবে প্রতিটি জেলা শহরে তা নেই। আমাদের শিশু পার্কটিতে রোলার স্কেটিং (ট্রাক) গ্রাউন্ড আছে। এটি ২০১৪ সালে মাননীয় জেলা প্রশাসক জনাব আহমেদ শামীম আল রাজী উদ্বোধন করেন। আজকে দেশের শুধু জেলা শহর নয়, উপজেলা শহরেও নিত্য নতুন আধুনিক মান সম্মত শিশু পার্ক, শিশু স্বর্গ নামে বিনোদন পার্ক গড়ে উঠছে। আমাদের পার্কটি বিশাল জায়গা জুড়ে রয়েছে, নেই শুধু পরিকল্পনা মাফিক আধুনিকতার ছোঁয়া। ফটো সাংবাদিক, ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিক ভাইয়েরা তাঁদের লেখা, প্রতিবেদন তৈরি বা অন্য কোন উপায়ে সরকারের উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নজরে আনেন বা আনতে পারেন তবে অবশ্যই তা দৃষ্টিনন্দন হবে। ভ্রমণ পিপাসু বা বিনোদনের জন্য তৃষ্ণায় ছটফট করা অভিভাবকেরা তাদের সন্তানাদি নিয়ে টিকেট কেটে সেখানে বিনোদন পাবে, এ প্রত্যাশা করি। আমার অভ্যাস হলো অবুঝ শিশুর মতো সামনে হামাগুড়ি দিয়ে একটু এগিয়ে যাওয়া, হাঁটা বা দৌড়ানোর ক্ষমতা নেই। যাঁদের সে ক্ষমতা পূরণের শক্তি সামর্থ্য আছে, তাঁদের পানে চাতক পাখির মত চেয়ে রইলাম।

//////////////////////////////////////////////////////////////////
লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, kaisardinajpur@yahoo.com