আজিমপুর করবরস্থান। -পুরোনো ছবি

(দিনাজপুর২৪.কম) রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে ২০১৮ সালের মে মাসে লাশ দাফন করা হয়েছিল ৭০৫টি, ২০১৯ সালের মে মাসে ৭৭৭টি। অথচ এ বছর মে মাসে দাফন করা হয়েছে ১০৩৪টি লাশ। আর চলতি জুনের প্রথম ১৫ দিনে লাশ দাফন করা হয়েছে ৫১৫টি। অথচ ২০১৮ সালের পুরো জুন মাসে লাশ দাফন হয়েছিল ৬৬৫টি; ২০১৯ সালের জুনে ৭০৭টি। এ তো গেল শুধু আজিমপুর কবরস্থানের হিসাব। শুধু এখানেই নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনাধীন ২টি কবরস্থানে ও ২টি শ্মশানে এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনাধীন ৭টি কবরস্থানে লাশ দাফনের সালওয়ারি তুলনামূলক বিশ্লেষণেও একই রকম চিত্র উঠে এসেছে।

করোনার প্রাদুর্ভাবে দীর্ঘমেয়াদে চলা সাধারণ ছুটি প্রকারান্তরে লকডাউনে রাজধানীতে চলতি বছর লোকজন অনেক কমে গেছে; সপরিবারে গ্রামে চলে গেছে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী। এর পরও লাশ দাফন বৃদ্ধির এমন হার অস্বাভাবিক। আজিমপুর কবরস্থানে তো লাশ দাফনের জায়গাও সংকুলান হচ্ছে না। তাই এখানে এক পাশের কবর ভেঙে তার ওপর নতুন করে কবর দিতে হচ্ছে।

রাজধানীর বৃহৎ শ্মশান হিসেবে পরিচিত পোস্তগোলা শ্মশান। ২০১৮ সালের জুন মাসে এখানে লাশ সৎকার করা হয়েছিল ৫২টি, ২০১৯ সালে ৭৬টি। কিন্তু এ বছর জুন মাসের প্রথম ১৫ দিনে এ হার বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। চলতি জুন মাসের প্রথম দিনই এ শ্মশানে লাশ সৎকার করা হয়েছে ৮৫টি। গড় হিসাবে গত তিন বছরের যে কোনো মাসের চেয়েও বেশি। এ শ্মশানে ২০১৮ সালে মোট লাশ সৎকার করা হয় ৭৯৯টি, ২০১৯ সালে ৮৩৩টি লাশ। আর চলতি বছরের ১৫ জুন পর্যন্ত সৎকার করা হয়েছে ৫৯৯টি। এর মধ্যে চলতি বছরের মে মাসে লাশ সৎকার করা হয়েছে ১৮৪টি। অথচ ২০১৯ সালের মে মাসে ৮১টি ও ২০১৮ সালের মে মাসে লাশ সৎকার করা হয়েছিল ৬৬টি। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে লাশ সৎকার করা হয়েছে ১০০টি। একই মাসে ২০১৯ সালে ৭৪টি, ২০১৮ সালে ৬২টি লাশ সৎকার করা হয়েছে।

একইভাবে কামরাঙ্গীরচর শ্মশানে চলতি বছরের মার্চে ২০টি, এপ্রিলে ২১টি, মেতে ২০টি ও চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে ১১টি লাশ সৎকার করা হয়েছে। ২০১৯ সালে এটি ছিল মার্চে ১৫, এপ্রিলে ১৭, মেতে ২৩ ও জুনে ১৬ জন। ২০১৮ সালে ছিল যথাক্রমে মার্চে ১৯, এপ্রিলে ১০, মেতে ১৫ ও জুনে ৭ জন।

জুরাইন কবরস্থানে চলতি বছরের মার্চে ৩০৭, এপ্রিলে ৩১৫, মে মাসে ৪০৮ ও চলতি জুন মাসের প্রথম দিনে ১৭২টি লাশ দাফন করা হয়েছে। ২০১৯ সালের মার্চে ২৭৩টি, এপ্রিলে ২৬৪টি, মেতে ৩১২ ও জুন মাসে ২৯১টি লাশ দাফন করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের মার্চে ৩১৬, এপ্রিলে ২৭০, মেতে ২৭২ ও জুন মাসে ২০১টি লাশ দাফন করা হয়েছিল।

২০১৮ ও ২০১৯ সালের দাফনকৃত লাশের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় চলতি বছরের দাফনকৃত লাশের সংখ্যা অনেক বেশি। এমনকি ২০১৮ সালের জুনে ২০১টি, ২০১৯ সালের জুনে ২৯১টি লাশ দাফন হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জুনের প্রথম ১৫ দিনেই এ সংখ্যা ১৭২টি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটির কবরস্থানগুলোর মধ্যে খিলগাঁও তালতলা কবরস্থান এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থানে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া লাশ দাফনের অনুমতি রয়েছে।

রায়েরবাজার বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থানে জানুয়ারিতে ১৬২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৪৮ জন, মার্চে ১৫৬ জন, এপ্রিলে ১৭৪ জন এবং মে মাসে ২৭২ জনের লাশ দাফন করা হয়। এর বাইরে করোনায় মারা যাওয়া রোগী ছিল ৩৮৮ জন। কবরস্থানটির সিনিয়র মোহরার আব্দুল আজিজ বলেন, এই কবরস্থানে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ১৫০-১৬০ জনের লাশ দাফন হতো। তবে চলতি জুন মাসের ১৭ তারিখ পর্যন্ত ১৪০টি সাধারণ লাশ দাফন করা হয়েছে। অন্যদিকে করোনা আক্রান্ত ১৬০টি লাশ দাফন করা হয়েছে।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এখানে দাফন হয়েছিল ১৩১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১৭ জন, মার্চে ১৩৬ জন, এপ্রিলে ১৩২ জন, মেতে ১৯৪ জনের লাশ।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জানুয়ারিতে ১৫২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৩৬ জন, মার্চে ১৪২ জন, এপ্রিলে ১৫১ জন এবং মে মাসে ২০৮ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এখানে ১৫৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২৪টি, মার্চে ১৩১টি, এপ্রিলে ১৩৭টি ও মে মাসে ১২৭টি লাশ দাফন করা হয়েছিল।

তালতলা কবরস্থানে জানুয়ারিতে ৪১ জন, ফেব্রুয়ারিকে ৩৪ জন, মার্চে ৫২ জন, এপ্রিলে ৩৪ জন এবং মে মাসে ৬৪ জনের লাশ দাফন করা হয়। গত পাঁচ মাসে মোট দাফন করা হয় ২২৫ জনের লাশ। এর মধ্যে ১৯১ জন ছিলেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির লাশ।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এখানে লাশ দাফন করা হয় ২৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৯টি, মার্চে ৩৩টি, এপ্রিলে ৩১টি, মেতে ৩৪টি লাশ দাফন করা হয়েছিল।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এখানে লাশ দাফন করা হয় ২৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৯টি, মার্চে ৩৩টি, এপ্রিলে ৩১টি, মেতে ৩৪টি লাশ দাফন করা হয়েছিল।

বনানী কবরস্থানে জানুয়ারিতে ৫৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬৮ জন, মার্চে ৭৭ জন, এপ্রিলে ৭১ জন এবং মে মাসে ৯৫ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৫১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৮টি, মার্চে ৪৩টি, এপ্রিলে ৫৩টি, মেতে ৫৫টি লাশ দাফন করা হয়েছিল।

উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে জানুয়ারিতে ১৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২১ জন, মার্চে ১৭ জন, এপ্রিলে ১৯ জন এবং মে মাসে ২০ জনের লাশ দাফন করা হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১২ জন, মার্চে ১৮ জন, এপ্রিলে ১৪ জন, মেতে ১১ জনের লাশ দাফন করা হয়।

উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে জানুয়ারি মাসে ২৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৪ জন, মার্চে ২২ জন, এপ্রিলে ২১ জন এবং মে মাসে ২৩ জনের লাশ দাফন করা হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ১৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৫ জন, মার্চে ১৭ জন, এপ্রিলে ১৩ জন, মেতে ২০ জনের লাশ দাফন করা হয়।

উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে জানুয়ারিতে ৫, ফেব্রুয়ারিতে ৪, মার্চে ৯, এপ্রিলে ৬ আর মে মাসে ১২ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এই কবরস্থানে লাশ দাফন ছিল না, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন, মার্চে ১ জন, এপ্রিলে ৫ জন, মে মাসে ৩ জনের লাশ দাফন করা হয়েছিল।

এদিকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন হচ্ছে সর্বাধিক লাশ। তবে পর্যাপ্ত জায়গা নেই এ কবরস্থানে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পুরনো কবর ভেঙে নতুন কবর তৈরি করা হচ্ছে। আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার মো. হাফিজুর রহমান বলেন, কবরস্থানে লাশের সংখ্যা বেড়েছে। ইতোমধ্যে কবরস্থানের পূর্ব পাশ ভরাট হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে পশ্চিমপাশে কবরগুলো টানা হচ্ছে। সেখানেই এখন দাফন করা হয়। সূত্র : আ. সময়