স্টাফ রিপোর্টার (দিনাজপুর২৪.কম) ভারত থেকে প্রচুর আমদানী ও পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্বেও ধানের জেলা দিনাজপুরসহ এই অঞ্চলে হু হু করে বেড়েই চলেছে চালের দাম। বাজারে অব্যাহতভাবে চালের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে মিল মালিকদের কারসাজি ও সিন্ডিকেটকেই দায়ী করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। আর মিল মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি ও আমদানী নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে চালের দাম। এদিকে মিল মালিকরা ইচ্ছামত দাম বৃদ্ধি করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনাজপুরের মিলগুলোতে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্বেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের দাম ৩’শ থেকে ৪’শ টাকা বৃদ্ধি করেছে মিল মালিকরা।
দিনাজপুরের খুচরা বাজারের চাল ব্যবসায়ীরা জানান, মিলগুলোতে চাল পাওয়া গেলেও তারা ইচ্ছামত দাম নির্ধারন করছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, এক সপ্তাহ আগে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল মিল মালিকরা বিক্রি করছিলো ২,৪০০ টাকা থেকে ২,৫০০ টাকা। এখন তা বিক্রি করছে ২,৭৫০ থেকে ২,৯০০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিআর-২৮ চাল ২,৩৫০ টাকার স্থলে ২,৬০০ টাকা, স্বর্ণা ২,১০০ টাকার স্থলে ২,৩৫০ টাকা, হাইব্রিড মোটা ১,৮০০ টাকার স্থলে ২,২০০ টাকা এবং বিআর-২৯ চাল এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২,৩০০ টাকার স্থলে ২,৫৫০ টাকায় বিক্রি করছে মিল মালিকরা।
দিনাজপুর বাহাদুর বাজারের চাল ব্যবসায়ী জাভেদ জানান, মিলে চাল নেই-এমন কথা বলছেন না কোন মিল মালিকই। তবে সব মিল মালিকই একসাথে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এ জন্য তাদের বাধ্য হয়েই বেশী দামে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে। আর এতে ক্রেতাদের সাথে প্রায়ই ব্যবসা হচ্ছে তাদের।
এদিকে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও এই মুহুর্তে চালের দাম বৃদ্ধির কোন যৌক্তিক কারন নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। যে সব ধান ব্যবসায়ী এবার বোরো মৌসুমে ধান কিনে মিল মালিকদের কাছে সরবরাহ করেছেন, তারা জানান, বোরো মৌসুমে পর্যাপ্ত ধান কিনে মজুদ করেছে মিল মালিকরা। বিরল উপজেলার ধান ব্যবসায়ী কুদ্দুস জানান, তাদের কাছে বোরো মৌসুমে এবার ৭৫ কেজির প্রতিবস্তা মিনিকেট ধান ১,৭০০ টাকা, বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ ধান ১,৬০০ টাকা এবং হাইব্রিড মোটা ধান ১,৫০০ টাকা দরে ক্রয় করেছে মিল মালিকরা। এই হিসেবে মিলের উৎপাদন খরচসহ প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৩৬ টাকা, বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ চাল ৩৩ টাকা এবং প্রতিকেজি হাইব্রিড মোটা চাল ৩০ থেকে ৩২ টাকার বেশী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বর্তমানে মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল ব্যবসায়ীদের বস্তার হিসেবে অনুযায়ী প্রতিকেজি মিনিকেট চাল ৫৫ টাকা, বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ চাল ৫১ টাকা এবং হাইব্রিড মোটা চাল কিনতে হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজি দরে। মিল মালিকরা তাদের বাজার থেকে ধান কেনা ও উৎপাদন খরচ ধরে বস্তার হিসেব অনুযায়ী প্রতি কেজি চাল গড়ে প্রায় ২০ টাকা বেশী দরে বিক্রি করায় বাজারে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে চালের দাম।
খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, তারা মিলগুলোতে চাল কিনতে গিয়ে প্রচুর মজুদ লক্ষ্য করেছে। তারা জানান, মিলগুলোতে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করলে চালের বাজার অনেকটাই স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সাম্প্রতিক বন্যা, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং ভারত চাল রফতানী করবে না এমন গুজবে অধিক মুনাফার আশায় ইচ্ছমত চালের দাম বৃদ্ধি করেছে। আর এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধির অভিযোগ অস্বীকার করে দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারনেই বেড়েছে চালের দাম। এক্ষেত্রে মিল মালিকদের কোন কারসাজি নেই। মিলে মজুদ থাকা সত্বেও হঠাৎ মিল মালিকরা প্রতিবস্তা চালের দাম ৩’শ থেকে ৪’শ টাকা বৃদ্ধি করলো কেন-আমদানী মুল্য বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে চালের দাম। তিনি জানান, মিলে যে পরিমান ধান রয়েছে-তা স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। একটি মিল চালাতে যে টুকু ধানের প্রয়োজন, সেটুকু ধানই রয়েছে মিল গুলোতে।
পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্বেও হঠাৎ বাজারে চালের দাম বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক উল্লেখ দিনাজপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাওছার আলী জানান, চালের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে আগামী রোববার দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি জরুরী সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মিলগুলোতে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। তিনি জানান, মিল মালিকরা অন্য কোথাও ধান মজুদ করে রেখেছে কি-না, তাও দেখা হবে।
দিনাজপুরের হিলি স্থল সুত্রে জানা গেছে, সরকার চালের আমদানী শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারন করায় হিলি স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে প্রচুর পরিমানে চাল বাংলাদেশে আসছে।
হিলি স্থল বন্দরের বেসরকারি অপারেটর পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপক অসিত কুমার সান্যাল জানান, হিলি স্থল বন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ভারত থেকে ১০০টি করে চাল বোঝাই ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাতে এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন চাল ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে।
হিলি স্থল বন্দরের কাস্টমস সুপারিনটেনডেন্ট মো. ফখর উদ্দীন জানান, এই বন্দরের মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি করা চালের গতি স্বাভাবিক রয়েছে। বরং ঈদের পর থেকে বেশি চাল আমদানি হচ্ছে। বন্দরে চাল বোঝাই ট্রাক আসার সাথে সাথে খালাস কার্যক্রমও সম্পন্ন করা হচ্ছে। যাতে ব্যবসায়িরা দ্রুত চাল খালাস করে তাদের গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারেন।
এরপরও দিনাজপুরে চালের বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে চালের দাম। দিনাজপুরে সবচেয়ে বড় চালের বাজার বাহাদুর বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ৮ টাকা।
এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হতো ৫২ টাকা দরে। এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকা কেজি দরে। এছাড়াও বিআর-২৮ চাল প্রতিকেজি ৪৮ টাকার স্থলে ৫৫ টাকা, স্বর্ণা ৪২ টাকার স্থলে ৪৭ টাকা, হাইব্রিড মোটা ৩৭ টাকার স্থলে ৪৪ টাকা, বিআর ২৯ চাল প্রতিকেজি ৪৬ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকায়।
সাধারণ মানুষের চাল নিয়ে নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে। কি করবে দিন মজুর সহ মধ্যবিত্তরা। হতাশা আর নিরাশায় এক একটি দিন।
সাধারণ ভোক্তাদের প্রশ্ন দিনাজপুরে যে চাল নিয়ে চালবাজি শুরু হয়েছে এটির রোধ করার উপায় কি ? বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে কে? স্থানীয় জনগণ দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসক সহ সরকারি প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।