(দিনাজপুর২৪.কম) বাগদাদে মার্কিন হামলায় ইরানের জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধের ইঙ্গিত জানিয়ে ইরানের কম প্রদেশের পবিত্র মসজিদের চূড়ায় ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা যুদ্ধের লাল ঝাণ্ডা উড়িয়েছে তেহরান।

সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কম প্রদেশের পবিত্র জামকারান মসজিদের সর্বোচ্চ গম্বুজে লাল পতাকা ওড়াল ইরান। আর ওই ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

সে ঘটনার আগেই অবশ্য ইরাকের বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ও সালাহউদ্দিন প্রদেশে মার্কিন সেনাদের বালাদ বিমান ঘাঁটিতে রকেট হামলার ঘটনা ঘটে।

বাগদাদের মার্কিন স্থাপনায় কারা হামলা চালিয়েছে তা এখনও কেউ নিশ্চিত করেনি। তবে ওই হামলায় একযোগে ৫টি রকেট ছোড়া হয়। এতে এখন পর্যন্ত ৫ জন আহত বলে জানা গেছে।

ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ইরানের জামকারান মসজিদে রক্তলাল পতাকা ওড়ানো হয়েছে, যেখানে লেখা রয়েছে ‘যারা হোসেনের রক্তের বদলা নিতে চায়’।

পতাকাটিকে সোলেমানি হত্যার দায়ে আমেরিকার ওপর ইরানের বদলা নেওয়ার অঙ্গীকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্ভাব্য যুদ্ধের হুঁশিয়ারি হিসেবেও দেখা হচ্ছে এ পতাকাকে। শিয়া সংস্কৃতিতে লাল পতাকা অন্যায় রক্তপাতের বদলা নেওয়ার প্রতীক।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তেহরান যদি আমেরিকার নাগরিক কিংবা মার্কিন সম্পদের উপর হামলা চালায় তাহলে তার জবাবে ইরানের ৫২টি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ৫২টি সাইটকে ‘টার্গেট করছে’ এবং ‘খুব দ্রুত এবং খুব কঠোরভাবে’ হামলা চালানো হবে।

একটি ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান তার হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় এমন মন্তব্য করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ওদিকে বিপ্লবী গার্ডস কমান্ডার জেনারেল গুলামআলী আবু হামজাহ বলেছেন, ইসরাইলের তেলআবিবসহ ৩৫টি লক্ষ্যবস্তু আমাদের আওতায় আছে। কাজেই কাসেম সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে যেখানে আমেরিকানরা আমাদের আওতায় থাকবে, সেখানেই তাদের শাস্তি দেয়া হবে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন হামলায় নিহত হন ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এলিট কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে সোলাইমানিকে হত্যা করা হয় বলে নিশ্চিত করেছে পেন্টাগন। গত মাসে ইরাকের মার্কিন দূতাবাসে ইরানের মদদে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার প্রতিশোধ নিতেই তাকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া বহু বছর ধরেই সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টার্গেটে ছিলেন। কেননা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের প্রভাব বলয় তৈরির মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই জেনারেল সোলাইমানি।

ওদিকে এই হত্যার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে বিশ্ব শক্তির মেরুকর‌ণ ঘটছে। একদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব-ইসরায়েল। এই জোটের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও। ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে হামলার নিন্দা জানিয়ে আরব আমিরাত তাদের অবস্থান জানান দিয়েছে।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইরান ও রাশিয়ার বন্ধুত্ব চলছে গত প্রায় ১০ বছর ধরে। এছাড়া চীনের সঙ্গেও রয়েছে ইরানের সখ্যতা।

গত মাসের শেষদিকে ওমান সাগর ও ভারত মহাসাগরে ইরান-রাশিয়া-চীনের নৌবাহিনী চারদিনের যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েল-সৌদি জোটের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনই এই সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আর বাকযুদ্ধ যখন চরমে, তখন ভারত মহাসাগর এবং ওমান সাগরে ব্যাপক আকারে এই যৌথ সামরিক নৌ মহড়া চালালো ইরান, চীন এবং রাশিয়া।

১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথম এ ধরনের নৌ মহড়া চালাচ্ছে তিন দেশ।

ওই যৌথ মহড়া সম্পর্কে ইরানের বক্তব্য ছিলো, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমরা বলতে চাই, শত্রুদের মোকাবিলায় তেহরান, মস্কো ও বেইজিং একজোট হয়ে কাজ করবে। আর সেই বার্তা দিতেই এ মহড়ার আয়োজন।’

ওদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রে জাপানি জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ ও টহল বিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে টোকিও। দেশটির তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্দেশে সেখানকার তথ্য সংগ্রহ করতে একটি হেলিকপ্টার সজ্জিত ডেস্ট্রয়ার ও দুটি পি-৩ সি টহল বিমান মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে জাপানের মন্ত্রিপরিষদ। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী মাস থেকে টহল বিমানগুলো যাতে তৎপরতা শুরু করতে পারে সেই লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। আর ফেব্রুয়ারি থেকে ডেস্ট্রয়ার মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই নিজেদের জাহাজের সুরক্ষায় পারস্য উপসাগরে আরো দুটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে ব্রিটেন। ইরানি জলসীমা বরাবর হরমুজ প্রণালিতে এই যুদ্ধজাহাজগুলো মোতায়েন করছে দেশটি।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস ব্রিটিশ নৌবাহিনীর দুটি ডেস্ট্রয়ারকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলসীমা হরমুজে ফের পাহারার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিবিসি জানিয়েছে।

এক বিবৃতিতে ওয়ালেস বলেন, আমাদের নৌযান ও নাগরিকদের সুরক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেবে।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তিনি এরই মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারের সঙ্গে কথা বলেছেন। সব পক্ষকে সংযত হওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের পর থেকে হরমুজে ফের ট্যাঙ্কারের ওপর হামলা হতে পারে, এমন আশঙ্কা বাড়ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সবগুলো ঘটনাই আসলে একটি মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব লক্ষণ। ফলে এবার যদি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই যায় তাহলে তা হয়তো হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও শুরু। -ডেস্ক