বি. এম. জুলফিকার রায়হান (দিনাজপুর২৪.কম) তালার খলিলনগর ইউনিয়নের গুনোখালী খালের মাঝে দফায় দফায় মাটির বাঁধ এবং নেট-পাটার বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এই খালটি ৩টি গ্রামের পানি নিস্কাশনের একমাত্র মাধ্যম। অথচ বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী ঘের ব্যবসায়ীরা খাল আটকিয়ে মাছ চাষ করায় ৩ গ্রামের সহা¯্রাধিক মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে। তাছাড়া বর্ষার পানি, পাশ্ববর্তী উঁচু গ্রামগুলো থেকে নেমে আসা বর্ষার পানি এবং সালতা নদীর জোয়ারের পানিতে ভেঁসে যাচ্ছে ছোট ছোট ঘের ও পুকুর। কৃষি ক্ষেত তলিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। জলাবদ্ধ পানির হাটু সমান পঁচা কাঁদায় চলাচল করে ভুক্তভোগী এলাকার মানুষরা চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বছরের পর বছর হাজার হাজার মানুষ এই দূর্ভোগে নিমজ্জিত হয়ে আসছে। বিষয়টির প্রতিকার পেতে ৩ গ্রামের হতভাগ্য মানুষরা বারবার ঘের মালিকদের অনুরোধ করলেও তাতে লাভতো পাননি; এমনকি- প্রশাসনের নিকট ধর্না দিয়েও কোনও প্রতিকার পাননি।
সরজমিন পরিদর্শনকালে উপজেলার দাশকাঠি গ্রামের কলেজ ছাত্রী নাজমা খাতুন জানান, এলাকার পানি নিস্কাশনের একমাত্র মাধ্যম গুনোখালী খাল দখল করে ঘের করায় বর্ষার পানি নিস্কাশন বন্ধ হয়ে যায়। এতে দাশকাঠি, মাছিয়াড়া উত্তরপাড়া এবং প্রসাদপুর গ্রাম জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পানি নিস্কাশনের জন্য গৃহ পালিত পশুদের নিয়ে যেমন বিড়ম্বনা তৈরি হয় তেমনি রান্না, খাওয়া ও থাকার জায়গা নিয়ে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পাশ্ববর্তী প্রসাদপুর গ্রামে অবস্থিত টোল দোকানের ক্ষুদ্র মুদি ব্যবসায়ী মো. নুর ইসলাম গাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সম্প্রতি বর্ষার পানিতে তার বাড়ি ঘর প্লাবিত হয়। যে কারনে টোল দোকানে তাকে রান্না, খাওয়া ও থাকতে হয়েছে। এছাড়া, দোকানঘরে থাকার পরিবেশ না হওয়ায় স্ত্রী ও সন্তানদের শশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক নি¤œচাপের ৩দিনের বর্ষার পানি বাড়ি-ঘর, রাস্তা এবং ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় এলাকার মানুষদের পোহাতে হয়েছে সীমাহীন দূর্ভোগ। এছাড়া বর্ষার পানিতে ঐতিহ্যবাহী দাশকাটি এমদাদুল হক কওমিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা বন্ধ হয়ে যায়। মূলতঃ গুনোখালী খাল মাটির বেড়ি এবং নেট-পাটার বাঁধ দিয়ে মাছচাষ করায় জনগনের এই দূর্ভোগ বলে জানান- ভুক্তভোগী মো. নুর ইসলাম।
উত্তর মাছিয়াড়া গ্রামের ভুক্তভোগী শেফালী রানী সরদার ও রেখা রানী মন্ডল বাড়ির উঠোনে পঁচা কাঁদার হাটু পানিতে চলাচল করাকালে জানান, গুনোখালী খালের মাঝে মাটির এবং নেট-পাটার বাঁধ দিয়ে মাছচাষ করায় পানি নিস্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৫/১৬ দিনেও জলাবদ্ধতার পানি নিস্কাশন হয়নি। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এমন ভোগান্তিতে তাদের পড়তে হয় বলে এই দুই নারী জানান। তারা বলেন, জলাবদ্ধতার পঁচা কাঁদায় চলাফেরা করায় গ্রামের সকলে চর্মরোগে বিশেষ করে চুলকানি এবং ঘাঁ-পাচড়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া খাবার পানি, স্যানিটেশন এবং গো-খাদ্য’র তীব্র সংকট চলছে। বিষাক্ত সাপ প্রতিনিয়ত ঘরের মধ্যে আসায় বাড়ির সকলে আতংকের মধ্যে দিন পার করছে। অথচ ৮/১০ ব্যক্তি সামান্য লাভ করতে পানি নিস্কাশনের একমাত্র খালে বাঁধ দিয়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার সম্পদ ক্ষয়-ক্ষতি করছে এবং মানুষের দূর্ভোগের শিকার করছে। ওই খালের বাঁধ অপসারন করা হলে ১/২ দিনের মধ্যে ৩ গ্রামের পানি নেমে যাবে এবং মানুষের জীবন যাপন স্বাভাবিক অবস্থায় আসবে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষরা।
স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা দিপায়ন মন্ডল এবং সমাজ সেবক ময়নুদ্দীন গাজী জানান, আখড়াখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে গুনোখালী খাল উত্তর মাছিয়াড়া, দাশকাটি এবং প্রসাদপুরের মধ্য দিয়ে ঢাবুখালী খালের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। এখান থেকে বাটকেলতলা (বাটুলতলা) গেট হয়ে বাটুলতলা খাল মহান্দি হয়ে কাঠবুনিয়ার মধ্য দিয়ে সালতা নদীর সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। মূলত বাটুলতলা বা বাটকেলতলা খালের মাধ্যমে গুনোখালী খাল দিয়ে উত্তর মাছিয়াড়া, প্রসাদপুর ও দাশকাটি গ্রামের বর্ষার পানি সালতা নদীতে নিস্কাশিত হয়। এছাড়া উঁচু গ্রামগুলোর কিছু পানি-ও এই এলাকা দিয়ে সালতা নদীতে যায়। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে প্রভাবশালী মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী অরবিন্দ মন্ডল, জুলমত আলী বিশ্বাস, বিমল মন্ডল, শীবপদ মন্ডল ও রফিকুল বিশ্বাস উক্ত গুনোখালী খালের একাধিক স্থানে নেট-পাটা দিয়ে পানি বন্ধ করে মাছচাষ করছে। এছাড়া খালের মাঝের একাধিক স্থানে যথাক্রমে মৃন্ময় মন্ডল, আজিজুল খাঁ, মফেজ উদ্দীন খাঁ, আব্বাজ খাঁ ও খোকন গাজী গং উঁচু করে মাটির বড় বাঁধ দিয়ে মাছচাষ করছে। এই সকল প্রভাবশালী মাছচাষীরা দীর্ঘ বছর ধরে খালে অবৈধ ভাবে বাঁধ দিয়ে মাছচাষ করছে। ফলে পানি নিস্কাশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৩ গ্রামের প্রায় ৪ হাজার মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তাদের মাছচাষের কারনে এলাকার ২ বা ৩ ফসলী কৃষি জমি এখন ১ ফসলী জমিতে পরিনত হয়েছে। তাছাড়া প্রতিবছর বর্ষার পানি এবং পরিকল্পিতভাবে গ্রামে উঠিয়ে দেয়া জোয়ারের পানিতে এলাকা প্লাবিত হওয়া মানুষরা অবর্ননীয় দুঃখ, কষ্ট এবং ক্ষয়-ক্ষতির সন্মুখিন হচ্ছে। বর্ষা শেষে শুকনো মৌসুম পর্যন্ত এলাকার মানুষদের এমন ভোগান্তিতে থাকতে হয় বলে গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
দিপায়ন মন্ডল ও ময়নুদ্দীন গাজী বলেন, বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী উক্ত মৎস্য ঘের ব্যবসায়ীরা এলাকা প্লাবিত করে দেওয়ায় তাদের কাছে যেয়ে গ্রামের মানুষ খাল থেকে বাঁধ অপসারনের দাবী করেন, কিন্তু তাতে তারা কর্ণপাত করেনি। যে কারনে এলাকার বিশিষ্ট সমাজ সমাজ সেবক আফতাব সরদার এবং আহম্মদ সরদারের নেতৃত্বে ভুক্তভোগীরা তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট বিগত সময়ে আবেদন জানান। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে কখনও কোনও ইউএনও ব্যবস্থা গ্রহন করেননি। ফলে চলতি বছরও নানান ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও ভুক্তভোগী হয়ে এই এলাকার মানুষ- সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এবং তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন।
এব্যপারে জানতে চাইলে তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফরিদ হোসেন বলেন, ঘটনার বিষয়ে অবশ্যয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।