(দিনাজপুর২৪.কম) পদ্মা সেতুু প্রকল্প নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ওঠানো দুর্নীতির অভিযোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। কানাডার একটি আদালত এই মামলাটিকে ‘অনুমানভিত্তিক’ বলে খারিজ করে দেয়ার পর আজ শনিবার তিনি ‘দ্য ডেইলি স্টার’ সম্পাদক মাহফুজ আনাম বরাবর একটি চিঠি লিখেছেন। চিঠিটি এবিনিউজের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-
 তারিখঃ ১৮.০৩.২০১৭ খ্রিঃ
জনাব মাহফুজ আনাম
সম্পাদক
ডেইলী স্টার
ফার্মগেইট, ঢাকা।
শ্রদ্ধেয় সম্পাদক মহোদয়,
আসসালামু আলাইকুম।
আজ আপনার পিতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবুল মনসুর আহমদের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন একজন সফল রাজনীতিক, আইনজ্ঞ, সাহিত্যিক ও বড় মাপের সাংবাদিক। তিনি ছিলেন এদেশের সাধারন মানুষের মুক্তিচেতনায় উদ্বুদ্ধ একজন সত্যিকার সৎ মানুষ। বাংলাদেশের রাজনীতিক ইতিহাসে একজন স্মরনীয় ব্যক্তিত্ব। এ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি।
আপনি আবুল মনসুর আহমদের সন্তান। আপনি একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক। দেশের একজন প্রখ্যাত ও প্রতিথযশা সম্পাদক। আপনার লেখা ও বক্তব্য পাঠক, বিশেষ করে, শিক্ষিত পাঠক মন দিয়ে পড়ে, প্রভাবিত হয়। আপনি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে সম্যক পরিচিত। আপনার কথাবার্তা, আচরণ মানুষ অনুকরণ করে, মানুষ গর্বভরে আপনার নাম উচ্চারণ করে। ‘বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় ভুল স্বীকারের কালচার’- আপনি শুরু করেছেন। এ কালচার বাস্তবায়ন বিপদসংকুল হলেও মানুষ আপনার কাছ থেকে সাহসিকতা প্রত্যাশা করে।
পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মিথ্যা অভিযোগ এবং আমার হেনস্থা হওয়ার কথা আপনি নিশ্চয় ভুলে যাননি। আমি কি পরিমাণ হেনস্থা হয়েছি, আমি কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি, আমার পরিবার, নিকট আত্মীয়সহ আমার ব্যাংক হিসাব গ্লোবালি সার্চ করে আমাকে কিভাবে হয়রানি করা হয়েছে, আমি কিভাবে বদনামের অংশিদার হয়েছি- তা আপনি ভাল জানেন। সে সময়ে বিশ্বব্যাংকের রেফারেল লিষ্ট নিয়ে কি তুলকালাম, লিস্ট করে আমাকে গ্রেফতার  করার চেষ্টা, বিশ্বব্যাংকের আইনজ্ঞ ওকাম্পোর সাথে আপনাদের বৈঠক- সব কিছু মিলে এক অন্ধকার পরিবেশের আর্বিভাব ঘটেছিল। প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও আপনি কথা শুনেননি, শোনার আগ্রহও প্রকাশ করেননি। আপনার বদ্ধমূল ধারণা ছিল বা হয়েছে- আমি অবৈধ কাজের সাথে জড়িত। যাহোক, আমি সেদিন আপনাকে লেখার মাধ্যমে যা বলেছিলাম, যে সত্য প্রকাশ করেছিলাম, পত্রিকাকে যা জানিয়েছিলাম- তা আজ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আমি পদ্মা সেতুর কোন অবৈধ কাজের সাথে জড়িত ছিলাম না। কানাডার আদালতের রায়ে অবশেষে সে সত্য প্রকাশিত হয়েছে। যাহোক, আজ এটা প্রমাণিত সত্য যে, পদ্মা সেতু ও আমি- দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলাম।
পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে যখন টানাপোড়েন, আপনার পত্রিকা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং মিথ্যা অভিযোগে অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে যখন রিপোর্ট প্রকাশ করে যাচ্ছিল- আমাকে অভিযুক্ত করে, তখন আমি প্রতিবাদ হিসেবে, সত্য ঘটনা প্রকাশে কয়েকবার আপনাকে লিখেছিলাম। শুধু পদ্মা সেতু নয়, আমার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানী সাকো-কে অনেক বড় ধরনের ব্যবসাও হারাতে হয়- আপনার পত্রিকার একজন পথভ্রষ্ট, ন্যায়ভ্রষ্ট সাংবাদিকের লেখার কারণে। আপনার পত্রিকার রিপোর্টের কারণে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগে Isolux Corsan-এর অফিস ঘেরাও করে সার্চ করা হয় এবং বিশ্বব্যাংক Isolux Corsan-কে সাকো’র সাথে চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য করে। এভাবে আমার হক-হালাল রুজির উপর হাত দেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক নিম্নস্তরের কাজ করেছে।
পদ্মা সেতুতে আমাকে পরিকল্পিতভাবে সম্পৃক্ত করার জন্য দেশ ও দেশের স্বার্থবিরোধী এবং উন্নয়ন অগ্রযাত্রার বিরোধীতাকারী একটি মহল সচেতনভাবে কাজ করেছেন। তাদের কাজকে সাপোর্ট করে আপনারা গনমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। এই কারণে দেশ ও দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে, দেশের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে।
মিথ্যা অভিযোগ এবং তা দুদকের তদন্তে মিথ্যা প্রমানিত হওয়ার পরও সে মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট করা, মন্ত্রীর অফিস সংস্কার/গাড়ী ক্রয় নিয়ে অনর্থক রিপোর্ট করা, সড়ক দূর্ঘটনা নিয়ে আমাকে দায়ী করে তুলকালাম কা- ঘটানো, কালকিনিতে বাড়ী নির্মাণ, আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ ও সাকো’র ব্যবসা বিষয়ে জাল স্বাক্ষর দিয়ে একটি মহলের অপপ্রচার নিয়ে পত্রিকার তুখোড় লেখনি- বিএনপির শ্বেতপত্র এর মিথ্যা অভিযোগগুলো যা দুদকের তদন্তে মিথ্যা প্রমানিত- সেসব বিষয়ে পুনঃপৌনকিকভাবে পত্রিকায় রিপোর্ট করে আমাকে বিতর্কিত করা হয়েছে। পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে ৩৭ মিলিয়ন চুক্তির ৩৫ মিলিয়ন ঘুষ প্রদান কতটুকু যৌক্তিক? এভাবে মিডিয়া আমাকে নাজেহাল করেছে। প্রতিবাদের পরও আমি আপনার, আপনাদের কাছ থেকে কোন প্রতিকার পাইনি।
পদ্মা সেতুর বিষয়ে আজ সত্য ও মিথ্যা প্রকাশিত। উদ্ভাসিত। সত্য স্বীকার করা এবং মিথ্যা সম্পর্কে অনুতপ্ত হওয়া বা দোষ স্বীকার করার মধ্যে কোন আত্মগ্লানি নেই। আছে শক্তি অর্জনের ক্ষমতা। কানাডার আদালতের রায় প্রকাশের পর পত্রিকায় দেখেছি- দেশের কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আমাকে ইতিবাচক কথা বলে ধন্যবাদ দিয়েছেন, আমার সততার প্রশংসা করেছেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতে অংশ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ব্যক্তিবর্গ আমার প্রতি ইতিবাচক ও সহানুভূতিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য আমাকে সম্মানিত করেছে, গৌরবান্বিত করেছে। ভেবেছিলাম, আমার প্রত্যাশা ছিল- আপনি সম্পাদক হিসেবে, বিশ্বব্যাংকের সুরে সুর মিলিয়ে আমার যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি করেছেন, আমাকে হেনস্থায় ফেলতে সহায়তা করেছেন- সে কথা স্মরণ করে- এ রায় সম্পর্কে ইতিবাচক ও সত্য কথা বলে আমাকে সাত্ত্বনা দেবেন। আমার প্রতি সহানুভূতি জানাবেন।
বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পর সে সময়ে আপনি আমার সম্পর্কে আপনার পত্রিকা লিখেছেন, আমার বিরুদ্ধে অসত্য লেখা লিখে আমার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, আমাকে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন- যা ছিল অন্যায়, যা আজ প্রমানিত। আমি নির্দোষ। আমি নিরাপরাধ। এখন সত্য উদ্ভাসিত ও প্রকাশিত হয়েছে। এখন চুপ না থেকে কিছু বলুন। আপনার কাছ থেকে সততা ও সত্যের প্রকাশ দেখতে চাই। আপনার কর্তৃক শুরু করা- ‘বাংলাদেশে সাংবাদিক ভুল স্বীকারের কালচার’-এর প্রতিফলন দেখতে চাই। যদি দেশের জনগণের এবং দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আপনার ভূমিকা থাকার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন, তাহলে পদ্মা সেতু নিয়ে যে সব অসত্য সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, সেইসব সংবাদের প্রতিবাদ হিসেবে সত্য বিষয়গুলো আগামী দিনে প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
আপনার দীর্ঘায়ু ও সুন্দর জীবন কামনা করি। -ডেস্ক
গভীর শ্রদ্ধান্তে,
একান্তভাবে আপনার,
(সৈয়দ আবুল হোসেন)
সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী