ঝরে না পড়ুক কোনো আশার ফুল - ছবি : সংগৃহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) ক্রিকেটকে বলা হতো ভদ্রলোকের খেলা। কিন্তু স্লেজিং, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিংসহ নানা কেলেঙ্কারির কারণে ক্রিকেট সেই জায়গায় নেই। ঘটন-অঘটনে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলও (আইসিসি)। কিছু জুয়াড়ি এবং ক্রিকেটে রাজনৈতিক হোতাদের প্রভাবে অসতর্কতা ও লোভে পড়ে ঝরে পড়ছে অনেক তারকা-নক্ষত্র।

যার সর্বশেষ শিকার বাংলাদেশ ক্রিকেটের যুগ পরিবর্তনকারীদের অন্যতম সাকিব আল হাসান। ‘অপরাধ’ এবং ‘ফাঁদ’ দুটোই যখন একজন ক্রিকেটার বুঝে উঠতে না পারেন তখনই ঘটে বিপত্তি। এই বিপত্তিতে সাকিব ছাড়াও অতীতে অনেক তারকা ক্রিকেটাররা পা রেখেছেন। ফলে শেষ হয়ে গেছে দুর্দান্ত ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারও।

‘স্পট ফিক্সিং’ তথা ম্যাচ পাতানো তালিকায় প্রথম নাম পাকিস্তানের সেলিম মালিক। ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়ার্ন আর মার্ক ওয়াহকে খারাপ খেলার জন্য টাকা দিতে চাওয়ার অভিযোগে ২০০০ সালে তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়। সেই নিষেধাজ্ঞা অবশ্য আট বছর পর প্রত্যাহার করা হয়ে ছিলো।

সেলিম মালিকসহ পাকিস্তানের মোট ৬ জন ক্রিকেটার স্পট ফিক্সিংয়ের কারণে নিষিদ্ধ হয়েছেন। বাকি পাঁচ ক্রিকেটার হলেন- আতা-উর-রেহমান, মোহাম্মদ আমির, মোহাম্মদ আসিফ, সালমান বাট আর দানিশ কেনেরিয়া।

জুয়াড়ির কাছ থেকে টাকা নেয়ায় আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছিলেন আতাউর। ছয়বছর পর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। এছাড়া স্পট ফিক্সিংয়ের দায়ে মোহাম্মদ আমির পাঁচ বছরের জন্য আর ম্যাচ পাতানোয় মোহাম্মদ আসিফ সাত বছর, সালমান বাট ১০ বছর এবং দানিশ কানেরিয়া আজীবন নিষিদ্ধ হন।

আইসিসিসির মহাব্যবস্থাপক এবং দুর্নীতি বিরোধী ইউনিট (আকসু) এর তত্ত্বাবধায়ক অ্যালেক্স মার্শাল বলে ছিলেন, জুয়াড়িদের অধিকাংশই ভারতীয়।

তবে এই থাবা থেকে বেশি পিছিয়ে নেই ভারতও। শুরুটা হয়েছিল সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দীন, অজয় শর্মা, মনোজ প্রভাকর ও অজয় জাদেজাকে দিয়ে। আজহারের সাথে সাউথ আফ্রিকার অধিনায়ক হানসি ক্রনিয়ের টেলিফোন কথোপকথনের প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০০ সালে। আজহার ও অজয় শর্মাকে আজীবন আর প্রভাকর ও জাদেজাকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। আজহার দুই বছর আর জাদেজা তিন বছর পর রেহাই পেয়ে যান। আর সর্বশেষ আইপিএল-এ ম্যাচ পাতানোয় ২০১৩ সালে আজীবন নিষিদ্ধ হন পেসার শ্রীশান্ত।

দক্ষিণ আফ্রিকার তিনজন ক্রিকেটারও নিষিদ্ধ হয়েছিলেন এই অপরাধে। ভারতীয় অধিনায়ক আজহারউদ্দীনের সেই টেলিফোন কথোপকথনে প্রোটিয়া অধিনায়ক হানসি ক্রনিয়েও নিষিদ্ধ হন। ক্রনিয়ে প্রথমে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। পরে অভিযোগ স্বীকার করে আজীবন নিষেধাজ্ঞাও মেনে নেন তিনি। তার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে হার্শেল গিবস ও হেনরি উইলিয়ামস ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ হন। নিষিদ্ধ হওয়ার দুই বছরের মধ্যেই বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান ক্রনিয়ে।

কেনিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড আর শ্রীলঙ্কার একজন করে ক্রিকেটার নিষিদ্ধ হয়েছেন। জুয়াড়িদের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার অভিযোগে কেনিয়ার মরিস ওদুম্বে পাঁচ বছরের জন্য, জুয়াড়িদের তথ্য দেয়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের মার্লন স্যামুয়েলস দুই বছরের জন্য আর তথ্য গোপন করায় নিউজিল্যান্ডের লু ভিনসেন্ট আজীবন এবং শ্রীলঙ্কার কুশল লোকারাচ্চি ১৮ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হন।

বাংলাদেশের আশরাফুল-সাকিব
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আশারফুল হয়ে আবির্ভাব হয়েছিল মোহাম্মদ আশরাফুল। বাঘা বাঘা ক্রিকেট পরাশক্তির বিপক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে প্রথম জয়ের পথ দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু মাঝপথেই শুকিয়ে গেছে সেই ফুলের সুবাস। ১৮ জুন ২০১৩ সালে থেকে সেই ক্রিকেটারের জীবনে সূচনা হয় কালো অধ্যায়ের। ওই বছর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এ ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের হয়ে খেলার সময় ম্যাচ পাতানোয় জড়িয়ে পড়েন। তার বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ আনা হয়। বিসিবির দুর্নীতি বিরোধী নীতিমালার ৬.২ ও ৬.৪ ধারা অনুযায়ী চারটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেয় বিসিবির ট্রাইব্যুনাল। আট বছরের জন্য নিষিদ্ধ এবং একইসাথে তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

১৮ জুন তারিখটি আশরাফুলের জীবনে দুই রূপেই ধরা দিয়েছিলো। এই তারিখে বহিষ্কৃত হলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে। আবার ২০০৫ সালের এই ১৮ জুনেই কার্ডিফে দৃষ্টিনন্দন এক সেঞ্চুরিতে তার ব্যাটে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। আর ১৩ আগস্ট ২০১৩ সাল থেকে নিষেধাজ্ঞার গণনা শুরু হয় টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান আশরাফুল।

পরবর্তীতে দোষ স্বীকার এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে আপীলের পরিপ্রেক্ষিতে আশরাফুলের আট বছরের নিষেধাজ্ঞা তিন বছর কমিয়ে পাঁচ বছরে আনা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলো; কিন্তু জাতীয় দলে খেলায় ফেরা হলো না আশরাফুলের।

আশরাফুলের পর বাংলাদেশ ক্রিকেটে পরবর্তী সময়ে নক্ষত্র হয়ে ওঠেন সাকিব আল হাসান। যিনি অনিয়মিত জয়কে নিয়মিত করে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বিশ্বের বুকে মেলে ধরেছেন। তিনিও জড়িয়ে পড়লেন এই ক্রিকেট ধ্বংস ক্রীটে।

তবে সাকিবের অপরাধ ছিল অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। সাকিব ফিক্সিং করেননি; কিন্তু জুয়াড়ির প্রস্তাব পেয়ে তা আইসসিসির দুর্নীতি বিরোধী ইউনিটকে (এসিইউ) জানাননি। এতে বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থা আইসিসি তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনে।

আইসিসি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, তিনবার জুয়াড়ির প্রস্তাব পেয়েও আইসিসির দুর্নীতি বিরোধী ইউনিটকে জানাননি সাকিব।

জুয়াড়িদের কাছ থেকে আসা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ছিলেন সাকিব; কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) বিষয়টি না জানানোয় শাস্তি পেয়েছেন তিনি। নিষিদ্ধ হলেন দুইবছর, তবে দোষ স্বীকার করায় সাকিবের দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা এক বছর কমিয়েছে আইসিসি।

আইসিসির দুর্নীতি বিরোধী ধারা অনুযায়ী, জুয়াড়ির কাছ থেকে অনৈতিক কোনো প্রস্তাব পেলে যত দ্রুত সম্ভব আইসিসি বা সংশ্লিষ্ট বোর্ডকে জানাতে হয়। এ ব্যাপারে প্রতিটি সিরিজ ও টুর্নামেন্টের আগে ক্রিকেটারদের ক্লাস নেয়া হয়। এরপরও কেউ জুয়াড়িদের প্রস্তাবের কথা না জানালে গুরুতর অপরাধ হিসেবে সেটা গণ্য হবে। শাস্তিও তাই গুরুতর। আইসিসির এই ধারা ভঙ্গের শাস্তি হতে পারে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা। সাকিবের মতো সিনিয়র ক্রিকেটারের কাছে আইসিসি এমন আচরণ প্রত্যাশা করেনি। তার চেয়ে বড় কথা ২০১০ সালে সাকিব জুয়াড়িদের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ছিলেন। কিন্তু এবার সেটা না করায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন।

টি-টোয়েন্টি আসর গুলোতে জুয়াড়িদের প্রাদুর্ভাব বেশি থাকে। তাই একজন ক্রিকেটার স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে নৈতিক শৃঙ্খলও বড় একটি বিষয়। আশরাফুল-সাকিবরা এই বার্তা দিয়ে গেছেন- তাদের মতো ভুল যেন পরবর্তী প্রজন্ম না করে এবং হালের ক্রিকেটাররাও যেন না জড়ায় এমন কর্মে। সূত্র : নয়া দিগন্ত