এস.এন.আকাশ, সম্পাদক (দিনাজপুর২৪.কম)  বাংলাদেশে প্রধানত দু’টি রাজনৈতিক জোট সক্রিয় রয়েছে এবং ক্ষমতার পালাবদল করেছে। এই দু’টি জোট ঘিরেই এ দেশে ভোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ আর জল্পনাকল্পনা। জোটের রাজনীতিতে শরিকদের সর্বোচ্চ মাত্রায় সুবিধা দিয়ে ক্ষমতাসীন মহাজোট বা ১৪ দলীয় জোটপ্রধান আওয়ামী লীগ বেশ সুবিধায় আছে। অন্য জোট বিএনপির নেতৃত্বাধীন, ১৯৯৯ সাল থেকে প্রথমে চারদলীয় জোট হিসেবে এবং পরে ২০১২ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে ১৮ ও ২০ দলীয় জোট হিসেবে সক্রিয়। এ জোটের দ্বিতীয় প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর অবদান বেশি; প্রাপ্তি ও প্রত্যাশায় অতৃপ্তি আছে বলে অনেকের অভিমত।
আরো দু’টি রাজনৈতিক জোট, একটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটেরই ছায়া জোট হিসেবে বিবেচিত, যা গত বছর জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ঘোষণাসর্বস্ব মোর্চা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আরো একটি জোট আত্মপ্রকাশ করেছে সাম্প্রতিককালে ডা: বি. চৌধুরীর নেতৃত্বে। এ জোট সরকারবিরোধী অবস্থান থেকে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিকে সমর্থন দিলেও বিএনপির জোটের বাইরে থেকেই রাজনীতি করছে।
বাংলাদেশে জোটবদ্ধ রাজনীতির সাংগঠনিক কাঠামো বিশ্লেষকদের কাছে স্পষ্ট নয়। কেবল সভাপতি, সমন্বয়কারী ও মুখপাত্র ব্যতীত একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর কমিটি বা সাংগঠনিক অবকাঠামো দেখা যায় না। শুধু নির্বাচনকে ঘিরে কোনো সাময়িক জোট গঠিত হলে ভিন্ন কথা। কিন্তু সক্রিয় বৃহৎ দু’টি জোটের বয়স দীর্ঘ সময়, দেড় যুগ ও এক যুগ অতিক্রম করেছে।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, সব জোটের তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামোবিহীন জোট এ সময়ে দ্রুত জোটভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হতে পারে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রণয়নে বিলম্ব, সমষ্টিগত নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো পরিষ্কার করতে না পারা, নির্বাচনী আসন বণ্টন ও প্রার্থী ভাগাভাগি চূড়ান্ত করতে কালক্ষেপণ প্রভৃতি সমস্যা নিরসন না করে শেষ সময়ের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত যেকোনো জোটের জন্যই বিপদ ডেকে আনতে পারে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ তার মহাজোটের শরিকদের সম্মিলিতভাবে ৫৮টি আসনে নির্বাচন করার সুযোগ দেয় এবং ২০১৪ সালে পরবর্তী নির্বাচনে ৭২টি আসন জাপাসহ শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয়। দু’টি মেয়াদেই নেতাসর্বস্ব দলের বেশ ক’জন নেতাকে মন্ত্রী করা হয় এবং তাদের মতাদর্শীদের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে অবারিত সুযোগ দেয়া হয়। মন্ত্রিত্ব পাওয়া এবং সরকারি ক্ষমতা চর্চায় প্রভাব বিস্তারকারী সেসব বাম নেতা এবং তাদের অন্য প্রার্থীরা ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামানত হারিয়েছেন। চলতি শতকের শুরুর দিকে রাজধানীতে আরো রাজনীতি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় প্রেস ক্লাব ও পল্টন অঞ্চলে সেসব নেতার দশ-বিশজনের মিছিল দেখে পথচারীরা বিদ্রƒপ করত। তথাপি তাদের ‘মূল্যায়ন’ করেছেন শেখ হাসিনা। অপর দিকে, বিএনপি জোটে শুরু থেকেই জামায়াত নিজেদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলেই মনে করেন দলটির তরুণ সমর্থকেরা। ক্ষমতার রাজনীতিতে জামায়াতের ‘অল্পে তুষ্টি’ নীতির কারণেও সেটা হতে পারে।
ক্ষমতার রাজনীতিতে ক্ষমতাই প্রধান উপাদান। ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি আবর্তিত হয়। ক্ষমতার রাজনীতিতে আসলে ‘স্বার্থপর’ হতে হয়। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক নিয়েই গঠিত হয় রাজনীতি। বিএনপি জোটে প্রধান শরিক হিসেবে জামায়াত ২০০১ সালে ৩০টি আর ২০০৮ সালে ৩৫টি আসন নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতার জন্য বরাদ্দ পায়। তুলনামূলক রাজনীতিতে মহাজোটে শরিক দলগুলোর সম্মিলিত ক্ষমতার বিপরীতে জামায়াতের রাজনৈতিক ক্ষমতা কতটুকু? রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে কেবল ভোটারের সংখ্যাই বোঝায় না। সমর্থন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দলীয় পরিচিতি ও বিদেশনীতি, গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা, নির্বাচনে অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য, অনুগত কর্মীবাহিনী প্রভৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুণাগুণ বিবেচনায় বিএনপি জোটের জামায়াতের সক্ষমতার তুলনায় মহাজোটে শরিকদের সম্মিলিত সক্ষমতাও অপেক্ষাকৃত দুর্বল। ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল প্রভৃতি দলের নিজস্ব ভোটব্যাংক বলে কিছু নেই। বিএনপি জোটেও এমন দলের সংখ্যা কম নয়। বাম দলগুলোর ভারত ও রাশিয়া নীতি, বাংলাদেশের উচ্চাশিক্ষার ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এবং গণমাধ্যমে প্রভাব, কারণ তাদের সক্ষমতার একটি ভিন্ন দিক স্পষ্ট। এখন সরকারে বামপন্থীদের প্রভাব অনেক বেশি এবং আওয়ামী লীগের কাছে তারা গুরুত্বও পেয়েছেন উদারভাবে। এর বিপরীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে শরিকদের ক্ষমতা চর্চা ও আইন প্রণয়নে ভ‚মিকা ছিল দুর্বল প্রকৃতির।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জোট সদস্যদের স্ট্যাটাসের আলোকে গুরুত্ব বিবেচনা করাই প্রত্যাশিত। মহাজোট সরকারের প্রথম মেয়াদে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের ভূমিকা প্রসঙ্গত আলোচ্য। দলটি আন্দোলনের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়েছিল, মূলত বিএনপির ব্যর্থতায় সরকারের তৃপ্তি বেড়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বা মাঠে ময়দানে বিএনপির অনুপস্থিতির কারণে দেশব্যাপী বিএনপি সমর্থকেরা হতাশ হয়ে পড়ে। জামায়াত চাইলে ‘বিকল্প’ জোট, শুধু ইসলামপন্থীদের জোট অথবা সরকারের অনুকম্পায় বা অন্য পদ্ধতিতে নতুন দলও গঠন করা অসম্ভব ছিল না। জামায়াত যা হারিয়েছে, তার একটি বড় কারণ জোটে থাকার ব্যাপারে দৃঢ়তা। শত নির্যাতনের মুখে জোট ছাড়েনি। জামায়াতের ক্ষতির পরিমাণ অপূরণীয়। টানাপড়েন যেমন ক্ষমতাসীন মহাজোটে আছে, তদ্রƒপ ২০ দলের জোটেও আছে। বিএনপির একটি ক্ষুদ্রাংশ মনে করে, জামায়াতের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত। আর জামায়াতের তরুণেরা মনে করে, ‘জামায়াতের পক্ষে ১৮ বছর ধরে জোটের নামে বোঝা হয়ে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। জামায়াত নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জোট শুধু ভোটের সময় হলেই ভালো।’
এখন সব হারানোর পর জামায়াতের হারানোর তেমন কিছু নেই। তাদের প্রশিক্ষিত জনশক্তি আর ত্যাগের পাশাপাশি বিরাট ভোটব্যাংক থাকায় বিএনপির সাথে জোটে থাকার প্রয়োজনীয়তা এক দিক দিয়ে জামায়াতের চেয়ে বিএনপিরই বেশি।
পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে এবার শুধু নির্বাচনী আসন নয়, রাজনৈতিক অপরাপর উপকরণ তথা সব ধরনের গণমাধ্যম, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও শিক্ষক নিয়োগ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, বিচার বিভাগে প্রভাব, আইন প্রণয়নে ভ‚মিকা, শিক্ষাব্যবস্থায় অবদান, ব্যাংক অনুমোদন ও পরিচালনা, মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন দফতর, অধিদফতর সব কিছুতেই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত। জামায়াত সেই দরকষাকষির সামর্থ্য বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা স্বাভাবিক। চাওয়া পাওয়ার হিসাবে জোটের অপরাপর দলগুলো মাত্র একটি বা দু’টি আসননির্ভর এবং তা-ও বিএনপি আর জামায়াতের ভোটের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাদের চাওয়া পাওয়ার হিসাব, দরকষাকষি এবং জামায়াতের দরকষাকষি সমপর্যায়ের নয়। ‘অধিকাংশ সুখ একা’ ভোগের প্রত্যাশা সফল হওয়ার দিন শেষ, সেটা আওয়ামী লীগ আগেই বুঝেছে, বিএনপি বুঝতে দেরি করা ঠিক নয়।
দেখা যাচ্ছে, জামায়াত বিএনপির পরীক্ষিত বন্ধু। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ মার্কধারী হিসেবে সর্বোচ্চ ফলাফলও প্রত্যাশা করছে জামায়াত, যা দৃশ্যমান হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচনে। দরকষাকষিতে যেকোনো পার্টিরই পছন্দ-অপছন্দ সমন¦য় করতে হয়। দরকষাকষির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, প্রস্তাবিত পার্টির কাছে বেশি সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা। রাজনৈতিক দরকষাকষি একটি গাণিতিক ও উচ্চমাত্রার হিসাববিজ্ঞানও বটে। যেখানে মডেলও মেথডলজি প্রয়োগ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট উভয় পার্টিকে নমনীয়তা সর্বোচ্চ মাত্রায় দেখাতে হয়। -ডেস্ক