(দিনাজপুর২৪.কম) শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর খিলগাঁও বাগিচা এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের লাশ উদ্ধারের সময় তার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। তার মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। জিআরপি (রেলওয়ে পুলিশ) থানা পুলিশ ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। নিহত সুমন জাহিদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন। তিনি বেসরকারি ব্যাংক দ্য ফারমার্স ব্যাংকে চাকরি করতেন। এর আগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। শাজাহানপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘সুমন জাহিদ নামে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিয়েছিলেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। সুমন জাহিদ ট্রেনে কাটা পড়ার ধারণা করা হচ্ছে বলে জানান আব্দুল মাবুদ।জিআরপি, কমলাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসিন আহমেদ জানান, নিহত সুমন জাহিদ পথচারী ছিলেন। গতকাল সকাল ১০টার দিকে তিনি ট্রেনে কাটা পড়েছেন। আশপাশের মানুষও পুলিশের কাছে এ কথাই বলেছেন। খবর পেয়ে আমরা বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে তার লাশ উদ্ধার করেছি। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হচ্ছে বলে গতকাল দুপুরে জানিয়েছেন তিনি।এদিকে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের ছেলে তৌহিদ রেজা নূর জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটেছে। শাজাহানপুর থানা পুলিশ কমলাপুর
রেলস্টেশন পুলিশকে জানায় যে, রেললাইনের পাশে একটি লাশ দেখা গেছে। পরে কমলাপুর রেলওয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। সুমন জাহিদের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। তার শরীরের বাকি অংশ অক্ষত ছিল বলে জানান তিনি। তবে তৌহিদ রেজা নুর পুলিশের ওই দাবিকে অস্বীকার করে বলেছেন, সুমন জাহিদ ট্রেনে কাটা পড়ার বিষয়টি সঠিক নয়। তিনি বলেন, আমরা মনে করছি, সুমন জাহিদের মৃত্যু কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা হতে পারে না। মানবতাবিরোধী অপরাধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের অন্যতম হোতা চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সুমন জাহিদ। অপরদিকে সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের প্রকাশক, ব্লগার, লেখক শাজাহান বাচ্চুকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। এই হত্যাকা- নিয়ে সুমন জাহিদও সোচ্চার ছিলেন। শাজাহান বাচ্চুকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তমনা মানুষদের বিরুদ্ধে হত্যার যে ধারা শুরু হয়, এই ঘটনাও তারই ধারাবাহিকতা।তিনি আরও বলেছেন, আমরা সবাই অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। মানসিকভাবে আমরা অনেক শক্ত। আমরা মনে করি না, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তাছাড়া তিনি মোটরসাইকেল চালাতেন। তিনি অনেক সাবধানী ছিলেন। দুর্ঘটনা হলে তার লাশ এভাবে পাওয়া যেত না। আমরা কোনোভাবেই তার মৃত্যুর এই ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে মেনে নিতে পারছি না।সুমন জাহিদের শ্যালক কাজী মোহাম্মদ বখতিয়ার উদ্দিন জানান, দুর্ঘটনায় সুমন জাহিদের মৃত্যু হয়েছে, এটা আমরা বিশ্বাস করি না। তিনি ৩১২ উত্তর শাজাহানপুরে থাকতেন। তার বাসা খিলগাঁও বাগিচার এলাকার পাশেই। প্রতিদিন সকালেই তিনি বাসা থেকে বের হতেন। কর্মদিবসে অফিস করার জন্য, অন্যান্য দিন বাজার করতেও বের হতেন সকালে। তিনি আত্মহত্যা করার মতো মানুষ নন। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি তার মাকে হারানোর পর যে কষ্ট তিনি করেছেন, তাতে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন না।’তিনি আরও বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি চৌধুরী মঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তিনি। আমরা সবাই ধারণা করছি, দুর্বৃত্তরা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী সুমন জাহিদ ক্রমাগত হুমকি পাওয়ায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে একটি পিস্তল কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর খিলগাঁও বাগিচা এলাকা থেকে সুমন জাহিদের লাশ উদ্ধারের পর তার স্বজনরা সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার পর থেকে ক্রমাগতভাবে তাকে হুমকি দেয়া হতো। সবশেষ গত একমাস আগে ফোনে ও বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে শাজাহানপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। শাজাহানপুর থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) কুমার জানান, সুমন জাহিদ গত বছর নিজের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছিলেন। জিডি নম্বর ৯১৪, তাং ২১/৭/১৭। ওই জিডি করার পর প্রত্যেক মাসে শাজাহানপুর থানার একটি টহল টিম সুমন জাহিদের ৩১২ নম্বরের বাসায় যেত। সর্বশেষ গত ২৮ মে তার বাসা পরিদর্শন করে আসে পুলিশ। এছাড়া লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আরেকটি জিডি (নং-৫৯৬) করা হয়েছে। পুলিশ পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে বলে জানান তিনি। এদিকে ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। লাশের পিঠে, মাথায়, মুখের সামনে, গালে ও নাকে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তবে মনে হচ্ছে শরীর থেকে মাথা আলাদা হয়েছে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে। সুমনকে অজ্ঞান করে রেললাইনের ওপর রেখে গেছে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল মাহমুদ বলেন, হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ভিসেরা ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন একসঙ্গে করে তার পর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তখন নিশ্চিত হওয়া যাবে কীভাবে তিনি মারা গেছেন। -ডেস্ক