(দিনাজপুর২৪.কম) দফায় দফায় ছাড় দেয়ার পরও ব্যাংকগুলো সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার ঋণ প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার ১৫ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ রোববার আরো ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করার ঘোষণা আসতে পারে।

করেনাভাইরাসের কারণে একের পর এক রফতানি আদেশ বন্ধ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ব্যবসায়ীরা যখন দিশেহারা, প্রায় মাসব্যাপী সাধারণ ছুটি, তখন সম্ভাব্য ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়ীদের জন্য একগুচ্ছ ছাড় দেয় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার থেকে ৭৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এর সাথে দেড় শতাংশ সিআরআর কমানোর মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি অর্থ ব্যাংকের হাতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু সঙ্কট মোকাবেলা যেসব প্র্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে সেই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা এমনই নাজুক হয়ে পড়েছে যে এসব প্রতিষ্ঠান প্রণোদনার অর্থের জোগান দিতে পারছে না।

করোনায় সব ধরনের লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ায় দেশের কার্যত ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন মহাবিপদে পড়ে গেছে। ব্যাংকগুলোও চরম অর্থসঙ্কটে পড়েছে। ব্যাংকগুলোতে কেউ টাকা জমা দিচ্ছে না। শুধু উত্তোলনই করছে। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে এখন বিকল্প সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকছে না। ইতোমধ্যে ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে ৫০ হাজার কোটি টাকা গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৫ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নিজস্ব উৎস থেকে ছাড় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নানা কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিগত কয়েক বছরে ব্যাংক থেকে যে হারে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ওই হারে আদায় হয়নি। বরং ঋণ নিয়ে ঋণ ফেরত না দেয়ার চর্চা একশ্রেণীর বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ শুরু করেছে। আর এসব ব্যবসায়ী গ্রুপের সহায়তা দিতে বিভিন্ন সময় নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় নানাভাবে রাঘববোয়ালদের ছাড় দেয়া হয়েছে নীতিসহায়তা দিয়ে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। এর ফলে সাধারণের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় ইতোমধ্যে নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংকের পুনর্গঠন করা হয়েছে। রাষ্ট্র খাতের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা দিয়ে ওই ব্যাংককে স্যালাইন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে নতুন নামে যাত্রা শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। ইতোমধ্যে পিপলস লিজিং নামক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার নামক একজন ব্যাংকার, যিনি কি না এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়ান্স নামক আরেকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি ছিলেন। আস্থার সঙ্কটের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা এখন প্রায় নাজুক হয়ে পড়েছে।

করোনাভাইরাসের কারণে সবধরনের আর্থিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে ইতোমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। তারা আপৎকালীন সঙ্কট মেটাতে গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার নগদ অর্থের জোগান দেয়ার অনুরোধ করেছে।

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, নানা কারণে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি অনেকটাই নাজুক ছিল। যেকোনো বিপদ এলে তার মোকাবেলায় যতটুকু সক্ষমতা থাকার দরকার ছিল ঠিক ততটা আমাদের প্রতিষ্ঠানের নেই। এর বড় প্রমাণ হলো ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ব্যাংকগুলো নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্ধেক সাপোর্ট দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সঙ্কট বেড়ে গেছে। কারণ, ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহক অর্থ উত্তোলন করছেই বেশি হারে। যদিও দেশব্যাপী সাধারণ ছুটির মধ্যে সীমিত পরিসরে ব্যাংক লেনদেন হচ্ছে। বেশির ভাগ ব্যাংকের শাখায়ই বন্ধ রাখা হচ্ছে। ব্যাংকভেদে ১০০ শাখার মধ্যে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫টি খোলা রাখা হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর অক্ষমতার কথা চিন্তা করেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিজস্ব উৎস থেকে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের দিকেই বেশি জোর দিচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এর সাথে নতুন করে ২৫ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে। এর ১৫ হাজার কোটি টাকা গত বৃহস্পতিবারই ঘোষণা করা হয়েছে। আজ রোববার বাকি ১০ হাজার কোটি টাকার আরো একটি এ ধরনের তহবিল ঘোষণা হতে পারে। সূত্র : নয়াদিগন্ত