(দিনাজপুর২৪.কম) ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে এরশাদের নির্বাচনি অসুস্থতা শুরু হয়েছে। এবারের নির্বাচন সামনে রেখেও তার সেই অসুস্থতা পেয়ে বসেছে। তবে গত নির্বাচনের অসুস্থতা সরকার ঘোষণা দিলেও এবারের অসুস্থতার কথা তিনি নিজেই জানান দিলেন। আর এই অসুস্থতার জানান দিয়ে নির্বাচনি মাঠে যে বোমা ফাটালেন তা রীতিমতো বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।গত ৩ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির নতুন মহাসচিব, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেছিলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ভালো আছেন। তবে দু-একদিনের মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি দেশের বাইরে যেতে পারেন। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, এরশাদ সাহেব এবার সত্যিই অসুস্থ। অথচ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেই গতকাল অভিযোগ করলেন, অসুস্থ হওয়ার পরও তাকে চিকিৎসা করতে এবং বাইরে যেতে দেয়া হচ্ছে না। কার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তা স্পষ্ট না করেই আলোচিত এ রাজনীতিবিদ বলেন, আমাকে দমিয়ে রাখা যাবে না।একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন নিয়ে দর-কষাকষির মধ্যেই অসুস্থ হয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) যান জাপার চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। পাঁচ দিন আগে তিনি বাসায় ফেরেন। জাপা সূত্র জানায়, গত সোমবার রাতে আবার সিএমএইচে চলে যান এরশাদ। নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অসুস্থতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার মধ্যেই পার্টির মনোনয়ন প্রক্রিয়া চলছিল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না তাকে। তার অসুস্থতার বিষয়ে জাতীয় পার্টির এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য দেয়া হচ্ছিল সাংবাদিকদের। এর মধ্যেই গতকাল দুপুরে হঠাৎ করেই বনানীতে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে এসে গাড়ি থেকে না নেমে নেতাকর্মীদের সামনে কয়েক মিনিট কথা বলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। সেখানেই তার বিস্ফোরক বক্তব্য আসে। এরশাদ বলেন, ‘আজ বলতে এসেছি, আমাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না, এগিয়ে যাব। আমার বয়স হয়েছে, চিকিৎসা করতে দেবে না, বাইরে যেতে দেবে না। মৃত্যুকে ভয় করি না।’ নেতাকর্মীদের অভয় দিয়ে এরশাদ বলেন, তোমাদের কোনো ভয় নেই। জাপা তোমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। জাপা চিরদিন নির্বাচন করেছে, এবারো করবে। ৮৮ বছর বয়সি এরশাদ বলেন, বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব। ২৭ বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি, পার্টি ছাড়ি নাই। সব নির্ভর করে তোমাদের ওপর। কেউ পার্টি ছেড়ে যেও না, আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও। পার্টি অফিসের সামনে এই ঝটিকা সফর শেষে বিদায় নেয়ার সময় এরশাদ তার কর্মীদের বলেন, আমার ব্লাড শর্টেজ আছে, একটু বাসায় যাচ্ছি খেতে। এ সময় কার্যালয়ের সামনে কর্মীরা স্লোগান ধরেন ‘এরশাদের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’। ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’। ‘আওয়ামী লীগের দালালরা হুঁশিয়ার সাবধান’।এ বিষয়ে গুঞ্জনের মধ্যেই জাতীয় পার্টির জোটসঙ্গী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত মাসের শেষে সাংবাদিকদের বলেন, এরশাদের অসুস্থতা ‘রাজনৈতিক’ নয়, তিনি সত্যিই অসুস্থ। তাকে দু-একদিনের মধ্যে সিঙ্গাপুরে নেয়া হতে পারে। কিন্তু জাতীয় পার্টির সদ্য অপসারিত মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার তখন সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, এরশাদের অসুস্থতা এমন কিছু নয়। তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে এরশাদ নাটকীয় অসুস্থতা নিয়ে সিএমএইচে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে ভর্তি থাকা অবস্থাতেই তিনি এমপি নির্বাচিত হন এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্ব পান।
এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে অসুস্থ এরশাদের সিএমএইচে ভর্তির খবর এলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যে জাতীয় পার্টির মনোনয়নপত্র বিতরণের শেষে বেশ কয়েকজন নেতা মোটা টাকায় মনোনয়ন বিক্রির অভিযোগ তোলেন এরশাদ ও হাওলাদারের বিরুদ্ধে। হাওলাদার সে সময় তা অস্বীকার করেন। ঋণ খেলাপের অভিযোগে পটুয়াখালী-১ আসনে হাওলাদারের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেলে গত সোমবার অনেকটা আকস্মিকভাবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব পদে পরিবর্তনের ঘোষণা আসে। এরশাদের সন্তানতুল্য এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে মহাসচিব করা হয় পার্টিতে সরকারঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মসিউর রহমান রাঙ্গাকে। তিনি বর্তমান সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নতুন মহাসচিব রাঙ্গা বলেন, রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যাওয়ার পর শারীরিক অবস্থা নিয়ে এরশাদ ভয়ে থাকেন। এ কারণে তাকে হাসপাতালে যেতে হয়। ঘুমের ডিস্টার্ব হলেও তিনি সিএমএইচে যান। বাসায় একা থাকেন বলে তার একলা লাগে, ভয় করে। তাছাড়া ইনফেকশনের ভয়ও আছে। নতুন মহাসচিব দাবি করেন, এরশাদ এখন হান্ড্রেড পারসেন্ট ফিট থাকলেও চিকিৎসার জন্য তার দেশের বাইরে যাওয়া জরুরি। কিন্তু পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব শেষ না করে তিনি দেশের বাইরে যেতে চান না। মহাজোটের আসন ভাগাভাগির বিষয়টি চূড়ান্ত হলে ১০ ডিসেম্বরের পর হয়ত এরশাদ বিদেশে যেতে পারেন। গতকাল বনানীর কার্যালয়ের সামনে এসে নতুন মহাসচিবকে নিয়েও কথা বলেন এরশাদ। তিনি বলেন, পুরনো মহাসচিবকে ভালোবাসতাম। নতুন মহাসচিবকে তোমরা ভালোবেসো। সে নতুন, তাকে সাহায্য করো।-ডেস্ক