-সংগ্রহীত ছবি

(দিনাজপুর২৪.কম) চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বেতন না পাওয়ায় কেমন কাটছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক কুরআন শিক্ষা, শিশু ও গণশিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা এবং দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট প্রায় লক্ষাধিক জনবলের জীবন। ক্ষুধার যত্নণাকাতর ওইসব জনবলের করুণ কান্নার রোল সংশ্লিষ্ট এলাকার বাতাসকে কীভারে ভারি করছে শুনুন তাদের জবানিতে।

ছোট ছোট সন্তান ও মা-বাবাকে নিয়ে বাসাভাড়াকরে থাকি। পিতামাতা বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে নিয়মিতই তাদের ওষুধ লাগে। গত তিন মাস যাবত ওষুধ জোগানতো দূরের কথা, দুবেলা ভাতই খাওয়াতে পারছি না ঠিকভাবে। বাসায় গিয়ে খাদ্য এবং ওষুধের অভাবে বৃদ্ধ মা-বাবার চেহারার দিকে তাকালে মনের অজান্তেই চোখে অশ্রু চলে আসে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে এখন সারা দিনই বাসায় থাকা হয়। যে কারণে কিছুক্ষণ পরপরই ছোট বাচ্চারা খাবার চায়, বিভিন্ন চাহিদা দেয়। আমি কিছুই করতে পারি না। করোনা সমস্যা শুরু হওয়ার পূর্বে বাইরে থাকতাম, যে কারণে এ সমস্যাটা এতটা বুঝতাম না। যখন বাচ্চারা চিৎকার করে খাবারের জন্য তখন মনটা বিষিয়ে ওঠে। ইচ্ছে হয় আত্মহত্যা করি। অনেক কষ্টে বেঁচে আছি। এভাবেই অশ্রু ভেজা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন দুর্গম ও পাহাড়ি অঞ্চল রাঙ্গামাটি দারুল আরকাম মাদরাসার শিক্ষক বেলাল হােসেন ফয়েজী।

এভাবেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম ও দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষকরা। তাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের পূর্বে বিভিন্ন দোকান থেকে বাকি বা কারও কাছ থেকে হাওলাত করে জীবন পরিচালনা করলেও বর্তমান সময়ে লকডাউনের কারণে চলমান চাকাটি একদম থেমে গেছে।

জানা গেছে, সারাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা বঞ্চিত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের শিক্ষিত করে তুলতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দারুল আরকাম মাদরাসা, মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সাথে সাথে পাড়া ও মহল্লায় বয়স্ক শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট জনবল চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলসহ প্রায় ৪ মাস বেতনহীন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের মেয়াদ। মেয়াদ শেষ হওয়ার চার মাসেও পুনরায় পাস হয়নি প্রকল্পটি। প্রকল্প পাস না হলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের কর্মস্থল ত্যাগ করেনি। কর্মরত এসব শিক্ষকদের প্রত্যাশা যে, শেষ হওয়া (৬ষ্ঠ পর্যায়) প্রকল্পটি ৭ম পর্যায়ে অনুমোদন হবে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন দেশের প্রাথমিক শিক্ষা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যে দারুল আরকাম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ইফার নিজস্ব সিলেবাস দ্বারা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কার্যক্রম শুরু হলেও ক্রমান্বয়ে ২০২০ সালে এসে তা পঞ্চম শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়।

সূত্রে জানা যায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভিতরগত কিছু সমস্যার কারণে প্রকল্পটি তৈরি করে জমা দিতে দেরি হয়েছে। যে কারণে পাস হতে একটু সময় লাগতেছে। শিক্ষকরা বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও ইফার কাছে দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ ও ২০১৫ সালের সরকার প্রদত্ত পে-স্কেল প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার দামিহা ইউনিয়নের মাগুরি গ্রামের দারুল আরকামের শিক্ষক আবুল কালাম আমার সংবাদকে বলেন, গত চার মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। তাই খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। বিশেষ করে আগে যেভাবেই গেছে করোনা পরিস্থিতি আমাদেরকে একদম শেষ করে দিয়েছে। কোথাও যাওয়া যাচ্ছে না।

কারও কাছে হাতও পাততে পারছি না। বিশেষকরে যে প্রকল্পে চাকরি করি তারাও যদি আমাদের খোঁজ খবর না নেয় তাহলে আমরা কোথায় যাব? আমরা আশা রাখব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষভাবে আমাদের এ প্রকল্পটি পাস করে ডাল, ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কওমি শিক্ষক বলেন, “২০১৮ সালের ৫ মার্চ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় নিউজ হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ১ হাজার ১০ জন কওমি শিক্ষককে সরকারি চাকরি দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু আমাদের চাকরিটা আসলে সর্বসাকুল্যে একটা সম্মানী ভাতা প্রদানে সীমাবদ্ধ।”

হতাশা চিত্তে তিনি আরও জানান, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে এলাকার সবাই সরকার কর্তৃক ত্রাণ পাচ্ছে। কিন্তু আমরা সরকারি চাকরি করি এই বলে কেউ ত্রাণ দিতেও নারাজ। এদিকে লজ্জায় আমরা কারও কাছে কিছু চাইতেও পারি না।

দারুল আরকাম শিক্ষক সমিতির সদস্য সচিব মাও. আনাস মাহমুদ জানান, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের এই করুণ দশা আমরা আশা করিনা। আশাকরি বঙ্গবন্ধু কন্যা বিষয়টি একান্তভাবে দেখবেন। মউশিক প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন ও দারুল আরকাম শিক্ষকদের স্কেলভুক্ত বেতন প্রদান করবেন।”

প্রকল্পের অনুমোদন ও বেতন-ভাতার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইফার এক পরিচালক বলেন, ‘মাদরাসাগুলো মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের অধীন হওয়ায় প্রায় ৪ মাস ধরে প্রকল্প পুনঃঅনুমোদন নিয়ে জটিলতা রয়েছে। প্রকল্পটি একনেক’এ উত্থাপন হলে আশাকরি খুব দ্রুত পাস হবে। এবং শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট জনবল বেতন ভাতা পেয়ে যাবে।

মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের সহজ কুরআন শিক্ষার এক শিক্ষক বলেন, গত চার মাস যাবত বেতন ভাতা পাচ্ছি না। যে কারণে খুবই সমস্যায় আছি। বিশেষকরে বর্তমান সময়ের ব্যাপারে আর কি বলব। এটাত সবারই জানা। যারা মোটামুটি ভালো চলে তাদের অবস্থাই খারাপ তাহলে আমাদের অবস্থাকি বুঝে নিন। আমি শুধু এইটুকুই বলব। যদি বর্তমান পরিস্থিতিতে বেতন দেয়া না হয় তাহলে অনেক শিক্ষকের পরিবার না খেয়ে মারা যাবে।

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ আমার সংবাদকে জানান, প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা আছে। আগামী একনেকের বৈঠকে পাস হবে বলে আশা রাখি। যেহেতু এটি একটি প্রকল্প। সুতরাং সেটি যদি পাস না হয়, আমরা যদি টাকা না পাই তাহলে কোথা থেক শিক্ষকদের সম্মানী দেব।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ওয়েব সাইট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে আলেমদের জন্য দীনী দাওয়াতভিত্তিক কর্মসংস্থান এবং সাক্ষরতা হার আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর একনেক কর্তৃক ১ হাজার ৫শত ৯৩ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ রেখে ২০১৫ হতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদে ‘মসজিদভিত্তিক শিশু গণশিক্ষা কার্যক্রম’ শীর্ষক ৬ষ্ঠ পর্যায় প্রকল্পটি সর্বশেষ অনুমোদিত হয়।

প্রকল্পটির মাধ্যমে সারাদেশব্যাপী ৩২ হাজার প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে ৪৪ লক্ষ ১০ হাজার শিশু শিক্ষার্থীকে অক্ষর জ্ঞানদানসহ নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়।

৭৬৮টি বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে সারাদেশে ৯৬ হাজার বয়স্ক (পুরুষ, মহিলা এবং জেলখানার কয়েদী) নিরক্ষরকে সাক্ষরতা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান এবং ৪১ হাজার সহজ কুরআন শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে ৫১ লাখ ১০ হাজার স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীদেরকে স্বাক্ষর জ্ঞানদানসহ শুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন শরিফ শিক্ষা ও বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা শিক্ষা প্রদান করা হয়। ৩টি স্তরে সর্বমোট ৯৬ লাখ ১৬ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৮০ হাজার আলেমের দীনী দাওয়াতভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছায় তাদের সম্মানী ২ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৪ হাজার ৫শত টাকা করা হয়ে ছিল।

এছাড়াও ১ হাজার ১০টি দারুল আরকাম এবতেদায়ী মাদরাসা রয়েছে। যেখানে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষক কাজ করে। এছাড়াও প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট জসবলসহ প্রায় লক্ষাধিক চাকরিজীবী বেতনহীন।

ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা, মর্মবাণী ও চেতনার প্রচার ও প্রসার এবং আরবি ভাষা শিক্ষার অর্পূব সুযোগ তৈরি হয়েছে দারুল আরকাম এবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম।

যারা এর পিছনে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন তারাই আজ অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এ সমস্যা সমাধানে কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করবেন। সূত্র : আ. সংবাদ