(দিনাজপুর২৪.কম) দেশে চাকরির বাজার সোনার হরিণ। মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী বেকার বসে থাকায় দিশাহারা। ফলে যখন চাকরির সন্ধান পাচ্ছেন তখনই বুঝে-না বুঝে দরখাস্ত করছেন।

এই সুযোগে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার নামে রাজধানীতে চলছে ভয়ঙ্কর প্রতারণা। একটি সংঘবদ্ধ চক্র চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তার পাশে, দেয়ালে, বাসে লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞপ্তির পোস্টার সেঁটে অথবা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতারকচক্র আকৃষ্ট করছে বেকার তরুণ-তরুণীদের।

প্রতারকচক্রের প্রধান টার্গেট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরির কথা বলে তাদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এরপর নানা কৌশলে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন রুটের বাসের জানালায় ও জনাকীর্ণ স্থানগুলোর রাস্তার পাশে বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে চাকরির বিজ্ঞপ্তি শোভা পাচ্ছে। সরকার অনুমোদিত বৃহৎ গ্রুপ অব কোম্পানিজ, ফ্যাশন হাউস, গার্মেন্ট, বায়িং হাউস, বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট কোম্পানিসহ নানা প্রতিষ্ঠানের নামে এসব বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে মার্চেন্ডাইজার, সুপারভাইজার, অডিটর, কোম্পানির ম্যানেজার, সহকারী ম্যানেজার, অফিস সহকারী— এ রকম নানা পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থী আহ্বান করা হয়। বেতন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। সেই সঙ্গে লোভনীয় নানা সুযোগ-সুবিধার কথাও উল্লেখ করা হয়।

চাকরি পেতে কোনো অভিজ্ঞতা ও জামানত লাগবে না— এ রকম শর্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বড় করে লেখা থাকে। আগ্রহী প্রার্থীদের ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্রসহ যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়।

রাজধানীতে বাসে এমনি এক বিজ্ঞাপন দেখে সেখানে উল্লিখিত নম্বরে চাকরিপ্রার্থী সেজে ফোন করলে এ প্রতিবেদককে ফার্মগেটের মালেক টাওয়ারের নবম তলায় যেতে বলা হয়। কথা হয় ‘মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি’র অফিস ইনচার্জ আব্দুল হামিদ সরকারের সঙ্গে।

তিনি জানান, প্রথমে আপনাকে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হবে। উত্তীর্ণ হলেই চাকরি। বেতন ১৫ হাজার টাকা। অফিসে সময় দিতে হবে সপ্তাহে ৫ দিন। এর আগে ৫০০ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। জীবন বিমা করার জন্য আড়ই হাজার টাকা লাগবে। প্রথম মাসের বেতন থেকে অর্ধেক টাকা কেটে রাখা হবে।

রাজধানীর মতিঝিলের ১১/বি. টয়েনবি সার্কুলার রোডের ঠিকানার আফতাব টাওয়ারে চলে এমন প্রতারণা। ভবনের তৃতীয় তলায় বাংলাদেশ স্টিচ ফ্যাশনের (বিএসএফ) সাইনবোর্ড ঝোলানো থাকলেও একই ঠিকানা ব্যবহার করে বিভিন্ন বায়িং হাউসের নাম ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে কেনকা ফ্যাশন, কেয়ার ফ্যাশন, লিংক ফ্যাশন, টোওি ফ্যাশন এবং টংকি ফ্যাশন। একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সারা দেশের উপজেলা ইউনিয়নপর্যায়ে মাঠকর্মী, সুপারভাইজার ও শাখা ব্যবস্থাপক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানের নাম না থাকলেও ঠিকানা হচ্ছে শ্যামলী রিং রোড, ঢাকা-১২০৭। পরে ওই নম্বর যোগাযোগ করলে ২০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট আবেদন করতে বলা হয়।

আবেদনের তিন মাস পরও কোনো সাড়া না পেয়ে কয়েকজন যোগাযোগ করে দেখেন, এই ঠিকানায় কোনো অফিস নেই। আবার অনেক সময় পোস্ট অফিসের পোস্টবক্স পত্রিকার পোস্টবক্স নম্বর ব্যবহার করেও চক্রান্ত হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা বড় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ‘নিয়োগপত্র’ নিয়ে চাকরিতে যোগদান করতে গিয়ে শাহনাজ আক্তার নামে এক তরুণী বুঝতে পারেন তাকে সরবরাহ করা নিয়োগপত্রটি ভুয়া।

অথচ শাহনাজ পত্রিকা চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে সে অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষা অংশ নিয়ে তাতে উত্তীর্ণ হয়েই পরে একটি চক্র টাকা দিয়ে নিয়োগপত্রটি ডাকযোগে পেয়েছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিডিবি এ ধরনের কোনো বিজ্ঞপ্তিই দেয়নি।

জানা গেছে, কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে এই চক্র প্রথমে তা সংগ্রহ করে। এরপর দেশের প্রতারক অঞ্চলে এ নিয়োগপত্র দেখিয়ে বেকারদের চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।

এভাবে ৫০-৬০ জন চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহ করে পরে রাজধানীর কোনো ফ্ল্যাটে রুম ভাড়া নিয়ে সেই চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হয়।

এমনকি তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে পুলিশ ভেরিফিকেশন সবকিছুই করা হয় প্রতারণার মাধ্যমে। চক্রের এক সদস্যকেই বানানো হয় নিয়োগকর্তা। পরীক্ষা শেষে ঘুষ না দিলে চাকরি হবে না— একথা বলে প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে নানাভাবে মেয়েদের প্রতারিত করা হচ্ছে। কৌশলে ফাঁদে ফেলে কাউকে আপত্তিকর কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে— এমন অভিযোগও রয়েছে।

প্রতারণার শিকার এক তরুণী জানান, একটি এনজিওতে ভালো পদে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে তিনি রংপুর থেকে আবেদন করেন। পরে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হয়, ঢাকায় এসে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এ জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা ডাকযোগে পাঠানোর কথা বলা হয়।

মিরপুরে বসবাস করেন রত্না (ছদ্ম নাম)। তার বাবা ঋণের টাকায় কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। হঠাৎ ব্যবসা ক্ষতি হওয়ায় ঋণে পড়ে যান। পরে রত্না চাকরির খোঁজে প্রায় ১শ দরখাস্ত করেন।

এর মধ্যেই রত্নার মেইলে একটি চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণে তারিখ আসে। লিখিত পরীক্ষা দেন। লেখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হয়। ইন্টারভিউয়ের জন্য দেশের নাম করা একটি হোটেলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ইন্টারভিউয়ের নামে রত্নার সঙ্গে প্রতারণা করেন প্রতারকচক্র।

চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়ে ঢাকা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুহুল আমিন বাবু  বলেন, এসব প্রতারক চক্র আইটিতে দক্ষ।

বিডি জব চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করছে। ইতমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। সম্মলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ চক্রকে নির্মূল করা সম্ভব নয়। -ডেস্ক