আরিফুল ইসলাম, রাজশাহী (দিনাজপুর২৪.কম)  রাজশাহীতে বেড়াতে আসা ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে জোর করে বিয়ে দিয়ে তার কাছ থেকে থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদা আদায়ের জন্য ওই শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনও চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিবিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হলে আটকে রেখে নির্যাতনের পর গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে নির্যাতনের শিকার জাহাঙ্গীর আলমকে উদ্ধার করা হয়। জাহাঙ্গীরের বাড়ি নওগাঁর পোরশা উপজেলায়। তিনি সম্প্রতি ঢাকার আহ্সানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে বিএসসি (সম্মান) কোর্স শেষ করেছেন।

জাহাঙ্গীর আলম ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত শনিবার রাজশাহীতে তিনি বেড়াতে আসেন। ওইদিন বিকেলে রাজশাহী কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সুমনা আক্তার বৃষ্টির সঙ্গে নগরের পদ্মাপাড়ে ঘুরতে যান। ওই ছাত্রীর সঙ্গে সাড়ে তিন বছরের প্রেমের সম্পর্ক বলে জাহাঙ্গীর দাবি করেছেন। একপর্যায়ে ওই ছাত্রীর আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় তাকে ছেড়ে চলে যান জাহাঙ্গীর। পরে সন্ধ্যায় ওই ছাত্রীর বন্ধু ও রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রলীগকর্মী কাফী ও তার সহযোগীরা নগরের একটি ছাত্রাবাস থেকে তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হবিবুর রহমান হলের মাঠে ধরে নিয়ে আসে।

এরপর কাফী, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আয়াতুল্লাহ বেহেশতি, সাংগঠনিক সম্পাদক কাউসার আহমেদ ওরফে কৌশিক, সহ-সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, ছাত্রলীগকর্মী এরশাদুর রহমান ওরফে রিফাত, তরিকুল ও রানা জোর করে বৃষ্টির সঙ্গে জাহাঙ্গীরকে বিয়ে দিতে চান। এতে রাজি না হওয়ায় সময় জাহাঙ্গীরকে অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। পরে রাতে জোর করে ওই মাঠে কাজী ডেকে তাদের বিয়ে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। পরে মেয়েটিকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হলে কৌশলে হলে আটকে রাখে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

ছাত্রলীগ ও হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে জাহাঙ্গীর হল থেকে চলে যেতে চাইলে তাকে হুমকি-ধামকি দিয়ে হলের ১৪১ নম্বর কক্ষে আটকে রাখা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পিন কোড নম্বর নিয়ে অ্যাকাউন্টে থাকা ১০ হাজার টাকা তুলে নেয় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। এছাড়া পরিচিতজনদের কাছ থেকে আরও ১০ হাজার টাকা ব্যবস্থা করতে জাহাঙ্গীরকে বাধ্য করা হয়। পরে জাহাঙ্গীরের কাছে আরও ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে ছাত্রলীগের ওই নেতা-কর্মীরা। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভুক্তভোগীকে একই হলের অন্য কক্ষে নিয়ে রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কর্মী কাফি ও অন্য নেতাকর্মীরা তার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালায়।

এদিকে জাহাঙ্গীরের পরিচিত বন্ধুরা বারবার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, দায়িত্বরত পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের অবহিত করলেও বিকেল পর্যন্ত তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জানতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কয়েকজন সাংবাদিক ওই হলে গিয়ে জাহাঙ্গীরকে খোঁজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তালাবদ্ধ একটি কক্ষের ভেতর থেকে শব্দ পেয়ে জাহাঙ্গীরের সন্ধান পান সাংবাদিকরা। এসময় ওই হলের ছাত্রলীগকর্মী তরিকুল তালা খুলে জাহাঙ্গীরকে ছেড়ে দেয়।

কিছুক্ষণ পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়লার বডির সদস্যরা পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনায় জড়িতরা এ সময় হলে অবস্থান করলেও কাউকে আটক করেনি পুলিশ।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতা আয়াতুল্লাহ বেহেশতি বলেন, ‘রাজশাহী কলেজের এক ছাত্রীর সঙ্গে ওই ছেলে (জাহাঙ্গীরের) দীর্ঘদিন ধরে প্রেম করে। তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কও করেছে কিন্তু বিয়ে করতে বলায় সে রাজী হচ্ছে না। ওই ছাত্রীর ও তার বন্ধুদের অনুরোধে কয়েকজন তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছে। রাত হওয়ায় সে আমাদের সঙ্গে হলে ছিল। রোববার সে আমাদের কাছ থেকে চলে গেছে। আমরা আর কিছু জানি না।’

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘ওই ছেলেকে উদ্ধার করে প্রক্টরিয়াল বডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর ছাত্রলীগের যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ প্রশাসনকে আমরা বলেছি জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর সোলাইমান চৌধুরী বলেন, ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে। তার কাছে থেকে লিখিত অভিযোগ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ –(ডেস্ক)