সম্পাদক, এস, এন, আকাশ (দিনাজপুর২৪.কম) ২০০৬ সালে প্রণীত হওয়ার পর ২০০৯ ও ২০১৩ সালে দুইবার সংশোধিত হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা আইসিটি আইন। ২০১৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে এ আইনে সংযোজন করা হয় ৫৭ ধারা। সর্বশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৭ ধারার অপরাধের শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় কমপক্ষে সাত বছর ও সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড। পাশাপাশি অর্থদণ্ডের ব্যবস্থাও করা হয়। অর্থদণ্ডের মাত্রা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা। তা ছাড়া আইসিটি আইনের এই ধারাটি জামিনের অযোগ্য। শুরুতেই আশঙ্কা করা হয়েছিল, এই ধারাটির অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক মতাবলম্বী, এমনকি নাগরিকসাধারণ ও সাংবাদিক হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তা ছাড়া এটি স্বাধীন মতপ্রকাশে ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণে, শুরু থেকেই এই ৫৭ ধারা প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে।

গত বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এ দু’জনই বলেছেন, নতুন আরেকটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আর সেখানে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ আইসিটি আইনের বিতর্কিত এই ৫৭ ধারা আর থাকছে না। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে- এই ৫৭ ধারার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৭-এ। তবে এতে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে কেউ এমন সমালোচনা করতে না পারে যে- আইসিটি আইনের ৫৭ ধারাটি এই আইন থেকে সরিয়ে নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে গত বুধবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এখন এটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাঠানো হবে। এর সাথে থাকছে আইসিটি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৪৭ ও ৬৬ নম্বর ধারা বাতিলের প্রস্তাব। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর তা শীতকালীন অধিবেশনই সংসদে তোলা হবে।

এ থেকে এটুকু স্পষ্ট- বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা-মহলের মানুষের জোরালো প্রতিবাদের মুখে পড়া আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা চলে যাচ্ছে, অর্থাৎ বাতিল হতে যাচ্ছে। কিন্তু এই ধারা বিষয়বস্তু ভিন্ন চেহারা নিয়ে থেকে যাচ্ছে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারায়। ফলে এটি বললে ভুল হবে না: চলে যাচ্ছে ৫৭ ধারা, আবার থেকেও যাচ্ছে ৫৭ ধারা।

তথ্যমন্ত্রীর দেয়া তথ্য মতে- প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চূড়ান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে, এই আইন কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে আইসিটি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারা বিলুপ্ত হবে। আসলে আইসিটি আইনে ২০১৩ সালের সর্বশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত ৫৭ ধারাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় বিভিন্ন মহলে। আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন, অথবা যার মাধ্যমে মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহলে এ কাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন সাত বছর কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ এক কোটি টাকার অর্থদণ্ড দেয়ার বিধান আছে।

আবার এই আইনের ধারা-২-এর ৫ উপধারায় ইলেকট্রনিক বিন্যাসের ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে- ‘ইলেকট্রনিক বিন্যাস অর্থ কোনো তথ্যের ক্ষেত্রে কোনো মিডিয়া, ম্যাগনেটিক, অপটিক্যাল, কম্পিউটারে স্মৃতি, মাইক্রোফিল্ম, কম্পিউটারে প্রস্তুতকৃত মাইক্রোচিপ বা অনুরূপ কোনো বস্তু বা কৌশলের মাধ্যমে কোনো তথ্য সংরক্ষণ বা প্রস্তুত, গ্রহণ বা প্রেরণ।’

আসলে আইসিটি আইনের এই ৫৭ ধারাটির বিষয়বস্তু কৌশলে এদিক-ওদিক করে প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইনের বিভিন্ন ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনের খসড়ায় ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার ইচ্ছায় ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহলে ওই ব্যক্তির সেই কাজ হবে অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। একই অপরাধ দ্বিতীয় বা তার বেশিবার করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। এই ধারার অপরাধ আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য হবে।

আবার প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় ২৮ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মানহানিসংক্রান্ত দণ্ডবিধির (১৮৬০) সেকশন ৪৯৯-এ বর্ণিত অপরাধ সংঘটন করেন, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। আর ওই অপরাধ দ্বিতীয় বা তার বেশিবার করলে অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। এই ধারার অপরাধ অ-আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আদালতের সম্মতিসাপেক্ষে আপসযোগ্য হবে।

প্রস্তাবিত এই আইনের ৩০ নম্বর ধারায় বলা আছে- যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে পারে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বা ঘটানোর উপক্রম হয়, তাহলে ওই ব্যক্তির সেই কাজ হবে একটি অপরাধ। এ জন্য তিনি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর একই অপরাধ যদি দ্বিতীয় বা তার বেশিবার করেন, তাহলে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ধারার অপরাধ অ-আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য হবে।

এ কথা অনস্বীকার্য, বাংলাদেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল অব্যাহতভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির নানা অভিযোগ করে আসছে। বর্তমান সরকার চাইছে বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান সুসংহত করতে। ফলে বিতর্কিত নানা ইস্যু আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যেমন বর্তমান সরকার স্বাধীনতার ঘোষক সংশ্লিষ্ট বিষয়টি আদালতে নিয়ে এই মর্মে আদালতের রায় আদায় করতে সক্ষম হয়েছে যে- জিয়াউর রহমান নয়, বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষক। বাংলাদেশের ইতিহাসগত নানা বিতর্ক ঠেকানোর একটি প্রয়াসও পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি ধারায়। জানা গেছে, এই আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা তাতে মদদ দেন, তাহলে ওই ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে।

প্রস্তাবিত এ আইনের আরেকটি ধারায় উল্লেখ আছে- কোনো ব্যক্তি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বিধিবদ্ধ সংস্থার গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে সেই কাজ হবে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের বাইরে এই আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধ করেন, যা দেশে করলে দণ্ডযোগ্য হতো, তাহলে সেটি দেশের ভেতরে করা হয়েছে বলে বিবেচনা করা হবে।

যদি কোনো ব্যক্তি ব্যাংক, বীমা বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে অবৈধভাবে বা আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া ই-ট্রানজেকশন করেন, তাহলে এই ব্যক্তির এই কাজ অবৈধ হবে। এ ছাড়া সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়ে সময়ে জারি করা কোনো ই-ট্রানজেকশনকে অবৈধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও যদি কোনো ব্যক্তি ই-ট্রানজেকশন করেন, তাহলে তা অপরাধ হবে। এ জন্য এই ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ অপরাধ দ্বিতীয়বার বা তার বেশি করলে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এ ধরনের আরো নতুন নতুন কয়েকটি অপরাধের প্রস্তাবসংবলিত ধারা রয়েছে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায়। সরকার চাইলেই এগুলো অপব্যবহারের মাধ্যমে বিরোধী মত-পথের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনদের অভিমত। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক গণমাধ্যমে অভিমত প্রকাশ করে বলেছেন, যে আইন অনুভূতিতে আঘাত দেয়াকে অপরাধ বলে, অবশ্যই সব সময় সে আইনের অপব্যবহার হবে। কোন কথা কার অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে তা ব্যক্তিনির্ভর। তাই সব সময় এই আইনের অপপ্রয়োগ হতে বাধ্য। এ ধরনের অপরাধ যদি আইনে রাখতেই হয়, তাহলে থানায় না গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গিয়ে অভিযোগ করার বিধান রাখতে হবে। প্রাথমিকভাবে ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হলে তিনি অভিযোগটি থানায় পাঠাবেন তদন্ত করে দেখার জন্য।

যে কেউ আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা ও প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উল্লিখিত বিভিন্ন ধারা বিবেচনায় আনলে দেখতে পাবেন, আসলে এটি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রকৃতপক্ষে বিতর্কিত ৫৭ ধারাটিই ক্যামোপ্লেজ করার চেষ্ট করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারায়। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় এবং প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপরাধের প্রকৃতি এমন যে- ইলেকট্রনিক মাধ্যমে, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে কর্মরত যেকোনো ব্যক্তি, আরো খুলে বললে যেকোনো সাংবাদিক যেকোনো অসতর্ক মুহূর্তে অনিচ্ছাকৃতভাবে এই অপরাধ সংঘটন করার অপরাধে অপরাধী বনে যেতে পারেন। এখানে তিনি এ কাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে না অনিচ্ছাকৃতভাবে করেছেন, তার মাপকাঠিই বা কী হবে তা আমাদের জনা নেই। আর এ ধরনের যেসব গুরুদণ্ড আইনটির বিভিন্ন ধারায় সংযোজিত হতে যাচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পুরো জীবন অন্ধকারে তলিয়ে দিতে পারে। এ আইনের মাধ্যমে অনেকেই লঘুপাপে গুরুদণ্ডের শিকার হতে পারেন এমন সম্ভাবনা প্রবল। তাই এ আইনটি চূূড়ান্ত করার আগে আরো ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি যখন প্রণীত হওয়ার চূড়ান্তপর্যায়ে এবং এটি ৫৭ ধারার মতোই বিরোধী মত-পথের মানুষকে দমন-পীড়নের সরকারি হাতিয়ার হতে পারে বলে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে জনগণের বাক-স্বাধীনতা থাকবে। জনগণের বাক-স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যেসব চেক অ্যান্ড ব্যালান্স দরকার, সেগুলো প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইন ছাড়াও সম্প্রচার আইনে থাকবে।

উল্লেখ্য, সম্প্রচার আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার এ পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে, তা নিয়েও ইতোমধ্যেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নানা শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় সম্প্রচার আইন এমনভাবে আসছে, যা বিরোধী মত-পথের লোকদের দমন-পীড়নের জন্য সরকারের জন্য হবে আরেকটি মোক্ষম হাতিয়ার। সে এক ভিন্ন ইস্যু, যেখানে প্রবেশের অবকাশ এ লেখায় একদম নেই।

হয়তো অনেকের স্মরণে আছে, ৫৭ ধারা আইসিটি আইনে সংযোজিত হওয়ার পর তা মানুষের বাক-স্বাধীনতা হরণ করবে, বিরোধীরা হয়রানির শিকার হবে, এর সবচেয়ে সহজ শিকার হবেন সাংবাদিকেরা- এমনটিই বলা হয়েছিল বিবেকবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু সরকারি দলের নেতারা মুখ মুছে সে অভিযোগ অস্বীকার করে তখন বলেছিলেন, ৫৭ ধারা মানুষের নিরাপত্তা দেবে, নিরাপত্তা হরণ করবে না, হয়রানির হাতিয়ার হবে না। কিন্তু ২০১৩ সালে এক সংশোধনীর মাধ্যমে আইসিটি আইনে ৫৭ ধারা সংযোজনের পরের সময় বাস্তবতা এবং একই সাথে চলমান বাস্তবতা তাদের এই আশ্বাসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। এর প্রতিফলন দেখতে পাই সহযোগী একটি প্রথম শ্রেণীর দৈনিকে গত ২ আগস্টে প্রকাশিত শীর্ষ সংবাদের বিষয়বস্তুতে।

‘ছয় মাসে আইসিটি আইনে দ্বিগুণ মামলা’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলা হয়- ছয় মাসের ব্যবধানে আইসিটি আইনে মামলার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এসব মামলার বেশির ভাগই ৫৭ ধারার। একই সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়েছে একই ধারায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আইসিটি আইনে মামলা হয়েছে ৪২টি। জুনে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯টি। এই ছয় মাসে মামলা হয়েছে ৩৯১টি। এসব মামলার আসামি ৭৮৫ জন। গ্রেফতার হয়েছেন ৩১৩ জন। এ ছাড়াও থেকে থেকে আমরা গণমাধ্যমে ৫৭ ধারার নানা বিরূপ প্রভাবের খবর দেখতে পাই। ছাগল মারার মামলাও হয় ৫৭ ধারায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের নামে ভুয়া আইডি দিয়ে কে বা কারা ফেসবুকে বিতর্কিত স্ট্যাটাস দিয়ে তাকে ৫৭ ধারার মামলায় জড়িয়ে হয়রানির শিকারে পরিণত করেছে বলে খবরে প্রকাশ।

আসলে ৫৭ ধারা বতিল হলেও নতুন করে ডিজিটাল আইন যেভাবে আসছে বলে জানা গেছে- তাতে করে নিশ্চিত বলা যায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে ৫৭ ধারাকে ভিন্ন আদলে আনা হচ্ছে। অতএব সাংবাদিকসহ ও বিরোধী মত-পথের মানুষের হয়রানির অবসান ঘটবে বলে মনে হয় না। ৫৭ ধারা বাতিল ও প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বললে ভুল হবে না- বিষয়টি যেন নতুন বোতলে পুরনো মদ পরিবেশনেরই শামিল। -ডেস্ক