(দিনাজপুর২৪.কম) আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগের নিষ্পেষিত তৃণমূল নেতাকর্মীরা। ফলে ক্ষমতাসীন দলটির তৃণমূল রাজনীতি ক্রমশই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। স্থানীয় এমপি ও হাইব্রিড নেতাদের স্বজনপ্রীতি আর উদাসীনতার কারণে যেসব নেতাকর্মী কোণঠাসা ছিলেন তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। অনেক সংসদ সদস্য নিজ দলের নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে জামায়াত নেতাকর্মীদের পেছনে ছায়ার মতো কাজ করছেন। বিএনপি-জামায়াত নেতাদের পুনর্বাসন, দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। আর ক্ষমতায় থেকেও স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে কট্টরপন্থি আ.লীগ কর্মীরা। এসব নেতাকর্মী দলের বাইরে না গেলেও জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নৌকার মনোনয়ন পরিবর্তনের আশায় আবারো সক্রিয় হয়ে উঠছেন। এ সুযোগে নিজ গ্রুপ ভারী করছে আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। ফলে প্রায় সংসদীয় আসনেই আ.লীগ দলীয় এমপির মুখোমুখি হয়ে উঠেছেন নিজ দলের একাধিক প্রার্থী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে দেড় শতাধিক আসনে বিরোধী পক্ষ নয়, নিজ দলের প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে আওয়ামী লীগকে। ফলে চরম দলীয় অস্থিরতার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দলের বিশেষ বর্ধিত সভায় তৃণমূল নেতারাও সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে শঙ্কা প্রকাশ করেন। ওইসব সভায় দলে অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড নেতা, জামায়াত-বিএনপিকে প্রশ্রয় দেয়া সাংসদদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভয়াবহ পরিণতি হবে বলে কেন্দ্রকে হুঁশিয়ার করে মাঠপর্যায়ের নেতারা। ২৩ জুনের বর্ধিত সভায় ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেন, ভোটের মাঠে আমাদের সমস্যা হচ্ছে দলের কোন্দল। তৃণমূলে একই সাথে কর্মসূচি পালনের কোনো পরিবেশ নেই। দলের নেতারা একই মঞ্চে ওঠেন না। কেউ কারো চেহারাও দেখতে চান না। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয়া হয়। আওয়ামী লীগকে হারানোর জন্য আওয়ামী লীগই যথেষ্ট। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাকি বিল্লাহ কেন্দ্রীয় নেতাদের হুঁশিয়ার করে বলেন, নতুন করে অনেকে নৌকায় ওঠার কারণে আমাদের পশ্চাৎদেশ ভিজে যেতে শুরু করেছে। এটা অব্যাহত থাকলে নৌকার সলিল সমাধি হবে। নৌকা তীর খুঁজে পাবে না। জিয়া আর মোস্তাকের প্রেতাত্মারা নৌকার ওপর ভর করেছে। খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুন-অর রশীদ বলেন, দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারা হাইব্রিডদের দাপটে দূরে সরে যাচ্ছে। দুর্দিনে যারা দলের সঙ্গে ছিলেন তাদের মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। সভায় তৃণমূলে কোন্দলে দায়ীদের সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এত উন্নয়ন করেছি, সেগুলো না বলে কার কি দোষ আছে, তা বলবেন, আর যাই হোক তারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না। সূত্র মতে, গত বছর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ঘোষণা আসার পরপরই মাঠপর্যায়ে নিষ্পেষিত কর্মীরা উজ্জীবিত হতে শুরু করেছে। গত জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান এমপির মনোনয়নের বিরোধিতা করেছিলেন দলে তাদের অবস্থা এখনো নাজুক। দলসহ সরকারের সুযোগ-সুবিধার সুফল পেয়েছে নব্য আওয়ামী লীগ বা এমপির পছন্দনীয় লোকজন। তাদের দাপটে ঘরে বসে পড়ে দলের পরীক্ষিত নেতারা। আর প্রতিহিংসার রাজনীতিতে মেতে স্থানীয় সাংসদরা তৃণমূল সংগঠিত করা তো দূরের কথা উল্টো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে উজ্জীবিত করেছেন অনেকে। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের পক্ষে সরকারদলীয় এমপি কর্তৃক ডিও লেটার দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নিয়োগবাণিজ্য, মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকতা করে অনেক সাংসদ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অনেক জেলায় স্থানীয় সাংসদের সাথে দলীয় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরোধ চলেই আসছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশ থাকার পরও এ বিরোধ নিরসন হয়নি। এসব কারণে ক্ষমতার স্বাদ থেকে ছিটকে পড়া ত্যাগী নেতারা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠছেন। এতে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ফুঁসে উঠতে পারে আওয়ামী লীগের তৃণমূল রাজনীতি। ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের সাংসদ ফাহমি গোলন্দাজ বাবেল নিজেই এলাকার দণ্ড মুণ্ডের কর্তা। এলাকার উন্নয়ন কাজের ঠিকাদারি, ভিজিএফ কার্ড বিতরণ, পরিবহণে চাঁদাবাজি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগসহ সবকিছু তার একক নিয়ন্ত্রণে। যা নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে তার বিরোধমূলক সম্পর্ক। দলীয় সাংসদ হয়েও দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা ও এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটিয়েছেন। গফরগাঁও উপজেলা যুবলীগনেতা শেখ ফরহাদ হোসেন জানান, গত নির্বাচনের আগে আমরা ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে ছিলাম। ওই সময় বর্তমান এমপি নমিনেশন পেলে আমরা প্রকাশ্যে তার নির্বাচন (নৌকা) করি। কিন্তু এমপি হওয়ার পরই সাংসদ বাবেল আমাকে পরিবারসহ এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে। সে আমাকে বলেÑ বাবেলের আওয়ামী লীগ না করলে গফরগাঁও থাকার দরকার নাই, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ঢাকায়, সেখানে যা। তিনি বলেন, এরপর পুরো পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছি। আমার চাচা মারা গেলে জানাজায় গিয়েছিলাম, সেখানে সাংসদের নির্দেশে তার ক্যাডাররা হামলা করে। এরপর আর যাইনি। শরীয়তপুর-২ আসনে (নড়িয়া-সখিপুর) বর্তমান সাংসদ কর্নেল (অব.) শওকত আলী বয়সের ভারে ন্যূব্জ। তিনি এলাকার মানুষকে সময় দিতে পারছেন না। তার বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে কুক্ষিগত করে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি একেএম এনামুল হক শামীমকে নিয়ে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। তারা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ এবং নড়িয়া-সখিপুরের উন্নয়নে এনামুল হক শামীমের বিকল্প নেই। সাংসদ এবং তৃণমূলে বিস্তর ফারাক অবস্থা বি.বাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনে। স্থানীয় সাংসদ বছরের বেশিরভাগ সময়ই কাটান দেশের বাইরে। দেশে এলেও স্থানীয় নেতাদের কাছে তিনি সোনার হরিণ। সাংসদের নামে এলাকার একক নিয়ন্ত্রক মুহিউদ্দিন অপু। যিনি বিএনপির শাসনামলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। সেকারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে সাংসদ সুকুমার রঞ্জন ঘোষের সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের বিস্তর দূরত্ব। স্বজনপ্রীতি আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে উজ্জীবিত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি বিরাট অংশ সাবেক ছাত্রনেতা গোলাম সরোয়ার কবিরের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান এমপি বলেন, দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহৎ দল আওয়ামী লীগ। নেতৃত্ব নিয়ে কমবেশি প্রতিযোগিতা থাকবেই। তবে এটাকে বিরোধ বলা যায় না। তারপরও যেসব এলাকায় কোনো ধরনের বিরোধ বা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, সেসব সমাধান করার চেষ্টা চলছে। -ডেস্ক