(দিনাজপুর২৪.কম) জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাজা নিয়ে রাজশাহী ও চট্টগ্রামে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। ওদিকে ফাঁসি কার্যকরের প্রতিবাদে জামায়াত আজ সারাদেশে হরতাল আহ্বান করেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, দুপুরে নগরীর হেতেম খাঁ গোরস্তান এলাকায় সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ১৫ জন
আহত হয়েছে। এ সময় আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে ৪ শিবিরকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাদ জোহর নগরীর হেতেম খাঁ গোরস্থানে মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে মহানগর জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে। জবাবে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়লে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা নগরীর বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে পালিয়ে যায়। এক শিবির নেতা দাবি করেন, গায়েবানা জানাজায় পুলিশ বিনা উসকানিতে রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে অন্তত ১৫ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহত অবস্থায় এক শিবিরকর্মীকে ধরে নিয়ে গিয়ে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ।
এদিকে মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র সহকারী কমিশনার ইফতে খায়ের আলম জানান, দুপুর ২টার দিকে শিবিরকর্মীরা নগরীর হেতেমখাঁ এলাকায় জড়ো হয়ে স্থানীয় গোরস্থানে মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাজা আয়োজনের চেষ্টা করছিল। তবে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় শিবিরকর্মীরা বিভিন্ন সড়ক দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এ সময় নগরীর বর্ণালী মোড় এলাকায় বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পুলিশ। এছাড়া ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৪ শিবিরকর্মীকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
রাজশাহী জামায়াতের আমীরসহ গ্রেপ্তার ৫৯
এদিকে রাজশাহীতে বিশেষ অভিযানে মহানগর জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর অধ্যাপক আবুল হাশেমসহ ৫৯ জনকে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার ইফতে খায়ের আলম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, মতিহার থানা পুলিশ মঙ্গলবার রাতে নগরীর মির্জাপুর এলাকার নিজ বাসা থেকে মহানগর জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির আবুল হাশেমকে গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক নাশকতার মামলা রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি। এছাড়া বিশেষ অভিযানে আটক ৫৮ জনের মধ্যে মধ্যে ৩১ জন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, ০৪ জন মাদক ব্যবসায়ী এবং ২৩ জন অন্যান্য ও মাদকসেবী রয়েছেন। মহানগরীর ০৪টি থানা ও ডিবি পুলিশ বিভিন্ন স্থানে এই অভিযান পরিচালনা করে বলে জানান তিনি।

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে জানান, চট্টগ্রামে জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাজা নিয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় জানাজায় অংশ নেয়া লোকজনকে লক্ষ্য করে কে বা কারা গুলি চালিয়েছে।
ঘটনার জন্য পুলিশ ও ছাত্রলীগকে দায়ী করেছে জামায়াত। সংঘর্ষের সময় ৫/৭টি সিএনজি ভাঙচুর করা হয়েছে। গুলির শব্দে জানাজায় অংশ নিতে আসা শত শত লোকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল বুধবার দুপুরে নগরীর চকবাজার এলাকার চট্টগ্রাম কলেজ সংলগ্ন প্যারেড মাঠে ঘটে এই ঘটনা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুর দুইটায় চকবাজার প্যারেড ময়দানে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা গায়েবানা জানাজায় অংশ নিতে গেলে সেখানে হামলার চেষ্টা করে ছাত্রলীগ। প্রথমে তারা চট্টগ্রাম কলেজের পাশ দিয়ে লাঠিসোটা নিয়ে এগিয়ে গেলে পুলিশ বাধা দেয়।
এ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে শিবির কর্মীরাও প্যারেড মাঠ থেকে দৌড়ে এসে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা চালায়। পরবর্তীতে দুই পক্ষই একে অপরকে ধাওয়া দেয়। জানাজা শেষ হলে শিবির কর্মীরা ‘নারায়ে তকবির’ বলে চট্টগ্রাম কলেজের দিকে দলবেঁধে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে পুনরায়।
এই সময় সেখানে মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় আনন্দ মিছিল করছিলো ছাত্রলীগ। প্রতিহত করার খবর ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় দ্বিতীয় দফায় উত্তেজনা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ চট্টগ্রাম কলেজের পশ্চিম ও পূর্ব ফটক বন্ধ করে দিয়ে মাঝখানে অবস্থান নেয়।
উত্তেজনার জের ধরে দুই পক্ষই দুই প্রান্ত থেকে প্রচুর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা ওই ফটক ভেঙে কলেজ চত্বরে থাকা ৪টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। যেগুলো সেখানকার শিক্ষকদের।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দেবাস ভট্টাচার্য্য বলেন, আধাঘণ্টা ধরে দুই পক্ষের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা ছিলো। এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

নাটোর প্রতিনিধি জানান, মতিউর রহমান নিজামীর জানাজায় যোগ দিতে যাওয়া দলের নেতাকর্মীদের পথে পথে বাধা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সাথিয়া প্রবেশে রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে অন্তত ৩০টি চেকিং পোস্ট বসিয়ে মোটরসাইকেল, কার, মাইক্রোসহ বিভিন্ন পরিবহন এমনকি জনগণের চলার পথেও বাধা প্রদানের ঘটনা ঘটে।
মঙ্গলবার রাতে ফাঁসি কার্যকর করার পর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিশেষ নিরাপত্তায় সকাল পৌনে সাতটার দিকে নিজামীর লাশ তার গ্রামের বাড়ি পাবনার সাথিয়ার মনমথপুরে পৌঁছে। এ সময় কড়া নিরাপত্তায় শুধুমাত্র পরিবারের লোকজনের লাশ দেখার সুযোগ দেয়া হয়। পরে তার নামাজের প্রথম জানাজায় ইমামতি করেন তার ছেলে ব্যারিস্টার নাজীব মোমেন। প্রথম জানাজা শেষে ৭টা ২০ মিনিটে গ্রামের কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এদিকে নিজামীর জানাজাকে কেন্দ্র করে রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন পরিবহনযোগে নিজামীর গ্রামে যেতে শুরু করে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে রাত থেকেই সাথিয়ায় প্রবেশের বিভিন্ন রাস্তায় কড়া নজরদারি শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সকালে এমন অন্তত ৩০টি পয়েন্টে চেক পোস্ট বসায় পুলিশ। সাথিয়ার প্রবেশদ্বার আতাইকুলার মাধপুর, পরট, মনমথপুর গ্রামের প্রবেশমুখ, বনগ্রাম, সাথিয়া মোড়, জোনাইল সড়ক, ঈশ্বরদী আটঘড়িয়া সড়ক, শাহজাদপুরের বেড়া সড়ক, চাটমোহর সড়ক ও ভাঙ্গুরার বিভিন্ন সড়ক হয়ে সাথিয়ায় ঢোকার প্রবেশ পথেই ছিল পুলিশের নজরদারি। এ ছাড়া র‌্যাবের কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ দল টহল প্রদান করে। সাদা পোশাকেও পুলিশের কড়া নজরদারি ছিল। এসব স্থানে মোটরসাইকেল, সিএনজি, নছিমন, কার ও মাইক্রোসহ বিভিন্ন পরিবহন থেকে লোকজনকে নামিয়ে দেয়া হয়। তারপরও বিকল্প পথে নিজামীর জানাজায় অংশ নেয় দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী।
সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হয় নিজামীর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা। এ জানাজার ইমামতি করেন পাবনার ভারপ্রাপ্ত আমীর আটঘরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম। এ সময় বক্তব্য দানকালে দলের নেতৃবৃন্দ নেতাকর্মীদের শানআত থাকতে নির্দেশ দেন। বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় নামাজে জানাজা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সব ধরনের অপ্রস্তুত পরিস্থিতি ঠেকাতেই নজরদারী বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে নিজামীর জানাজাকে কেন্দ্র করে ভোর থেকেই লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে মনমথপুর। সাথিয়া মোড় থেকে মনমথপুর পুরো রাস্তা জনস্রোতে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নেতাকর্মীদের গরমের ক্লান্তি মেটাতে রাস্তার দুপাশে পানি, শরবত ও দেশী ফল পরিবেশন করে দলের স্বেচ্ছাসেবকরা। সূত্র: ম. জমিন -ডেস্ক