(দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম)করোনায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরো বছরটাই প্রায় বন্ধ রয়েছে। তবে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরবর্তী ক্লাসে পদোন্নতির আগে টিউশন ফির নামে চাপ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ের মতো পুরো বছরের টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

আবার কোথাও কোথাও পরীক্ষার ফি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অ্যাসাইনমেন্টের নামে অনেক অভিভাবক একরকম জিম্মি হয়ে ফি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একই অবস্থা।

এদিকে অভিভাবকদের চাপাচাপিতে প্রায় তিন সপ্তাহ পর গতকাল শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি নেয়া যাবে না বা নিলেও তা ফেরত দিতে সরকারি নির্দেশনা জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

অভিভাবকরা বলছেন, পুরো দেশ মহামারি করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের ভয়ে দিশাহারা, করোনার কারণে পুরো দেশের মানুষেরই ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কারো বেতন কমে গেছে বা চাকরি চলে গেছে বা ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের স্কুলের খরচ চালাতে পারছে না।

সবাই কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন উল্লেখ করে তারা বলেন, ঠিকভাবে বাড়িভাড়াও দিতে পারছেন না। এখন বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। স্কুল তো পুরো বছরই বন্ধ। তবুও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিছুই মানছে না, একের পর এক ফোনে মেসেজ দিয়ে যাচ্ছে। টাকা না দিলে অনেক কটূ কথাও বলছেন শিক্ষকরা।

অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এখন টিউশন ফি যেনো গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি সংক্রান্ত এখোনো কোনো নির্দেশনা না থাকায় অনেক স্কুলে এরকম জোর করেই টাকা আদায় করা হচ্ছে।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছিলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিউশন ফির সঙ্গে আর কোন কোন খাতে অর্থ আদায় করা যাবে তা উল্লেখ করে একটি নির্দেশনা দেয়া হবে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ক্রীড়া, মিলাদ-মাহফিলসহ অন্যান্য যে কার্যক্রম হয়নি, নির্দেশনায় সেসব ফি বাদ দেয়া হবে। এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবক উভয়পক্ষকে উদার হতে আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর বিয়াম মডেল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক এ প্রতিবেদক বলেন, ‘আমি করোনার আগে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সকল বেতন পরিশোধ করেছি। করোনায় প্রায় আট মাস স্কুল বন্ধ আছে। বিয়াম স্কুল কর্তৃপক্ষ এখন ম্যাসেজ করে জানিয়েছে ব্যাংক অথবা বিকাশের মাধ্যমে টিউশন ফি বা বেতন দেয়ার জন্য। সর্বমোট প্রায় ৫০ হাজারের উপরে বকেয়া টাকা দিতে হবে।

এ অভিভাবক আরও বলেন, স্কুলের এখন আনুসঙ্গিক কোনো বিলের তেমন খরচই নেই। স্কুল বন্ধ থাকার কারণে ছাত্রছাত্রীরা কোনো কিছুই ব্যবহার করছে না। তারপরও অভিভাবকদের কাছ থেকে সকল বিলের টাকা তারা চাচ্ছে। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ রয়েছে। অথচ তারা বিভিন্ন খাতের নাম করে টাকা চাচ্ছে। কিভাবে সব কিছুর টাকা আমরা দেবো।

এক অভিভাবক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রাইভেট জব করি। করোনার শুরুর পর থেকে বেতন কমে গেছে। পুরো ফ্যামিলি নিয়ে অনেক ঝামেলার মধ্যে আছি।’ আরেক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, টিউশনি বইয়ে দেখা গেছে একই খাত ভিন্ন নামে দুইবার টাকা নিচ্ছে বিয়াম।

তিনি বলেন, শুধু মাসিক বেতন দিতে চেয়েছি, কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ পুরো টিউশন ফি দিতে বলছে। এরকম অনেক অভিভাবকই বলছেন, অন্য খাতের টাকা তারা দিতে চাচ্ছে না। অভিভাকদের বক্তব্য ছাত্রছাত্রীরাও বন্ধের মধ্যে ওই খাতের সুবিধাগুলো ভোগ করেনি। ছাত্রছাত্রীরা ঘরে বসে কোনো পড়াশোনা করতে পারেনি। অথচ স্কুল কর্তৃপক্ষ সব টাকা চাচ্ছে। আবার অন লাইনে ক্লাসে ছেলেমেয়েদের কোনো লাভই হয়নি। স্কুল ছাড়া ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা হচ্ছে না। অন লাইনে ছাত্রছাত্রীরা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাই দিয়েছে।

এছাড়াও নাম প্রাকশে অনিচ্ছুক রাজধানীর মোহম্মদপুরের এক বাসিন্দা আমার সংবাদকে জানান, তারা ছেলে সেন্ট যোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। গত কয়েকদিন আগে মোবাইলে মেসেজ দিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে পরীক্ষার ফি বাবদ এক হাজার টাকা এবং বকেয়া ১০ মাসের বেতন ২২ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এ টাকা পরিশোধ না করলে পরবর্তী ক্লাসে (চতুর্থ শ্রেণি) পদোন্নতি দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, যেখানে এইচএসসির মতো বড় পরীক্ষা বাতিল করে অটো পাস দেয়ার ঘোষণা হলো। সেখানে এসব ছোট ক্লাসের শিক্ষার্থীদের কেন পরীক্ষা বাবদ ফি দিতে হবে?  আর করোনায় প্রায় আট মাস স্কুল বন্ধ, তাহলে স্কুলের বকেয়া বতেন কেন দেবো?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) মো. বেলাল হোসাইন দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘টিউশন ফির বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। আমরা একক সিদ্ধান্তে ওইভাবে আসতে পারিনি। যার ফলে নির্দেশনাটা দিতে দেরি হয়ে গেলো।

তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এত বেশি ভিন্নতা। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা থেকে শুরু করে সুডেন্ট সংখ্যা দিয়ে পদে পদে ভিন্নতা। এগুলোর মধ্যে থেকে একটা কমন বিষয় নিয়ে আসা অনেক কঠিন কাজ। তবুও চেষ্টা করে মাঝখান থেকে কিছু বিষয় নিয়ে শুধু টিউশন ফি নেয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

অন্য কোনো খাত যেমন— শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি নেয়া যাবে না বা নিলেও তা ফেরত দিতে হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা। পরিচালক বেলাল হোসাইন বলেন, ‘অভিভাবক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নমনীয় হতে হবে। যেনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

টিউশন ফি ছাড়া অন্য খাতে অর্থ নিতে পারবে না স্কুল-কলেজ

করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন থাকা অভিভাবকদের ছাড় দিয়ে স্কুল-কলেজগুলোকে তাদের শিক্ষার্থীদের শুধুই টিউশন ফি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তবে শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি নেয়া যাবে না বা নিলেও তা ফেরত দিতে বলেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

গত ১৮ নভেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো . গোলাম ফারুক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, কোভিড-১৯ এর কারণে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে।

তবে এরই মধ্যে সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ক্লাসের পাশাপাশি বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করলেও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তা ভালোভাবে করতে পারেনি। একইভাবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এসব অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পেরেছে, কিছু শিক্ষার্থী পারেনি।

যাই হোক, সার্বিক বিবেচনায় আমাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হঠাৎ করে উদ্ভূত এ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

‘তবে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি নিয়ে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অভিভাবকদের মতদ্বৈততা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছু অভিভাবক বলছেন, একদিকে স্কুল বন্ধ ছিলো অন্যদিকে এ করোনার সময়ে তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অতএব তাদের পক্ষে টিউশন ফি দেয়া সম্ভব নয়।

অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। উপরন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও স্কুল রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রতি মাসে তাদের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেই হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এমতাবস্থায় আমাদের যেমন অভিভাবকদের অসুবিধার কথা ভাবতে হবে, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেনো বন্ধ বা অকার্যকর হয়ে না যায় কিংবা বেতন না পেয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবন যেনো সঙ্কটে পতিত না হয় সেটাও খেয়াল রাখতে হবে।  ‘পূর্বাপর বিষয়গুলো বিবেচনা করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো (এমপিওভুক্ত ও এমপিওবিহীন) শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি নেবে।

কিন্তু অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি নিতে পারবে না বা নিয়ে থাকলে তা ফেরত দেবে অথবা তা টিউশন ফির সঙ্গে সমন্বয় করবে। এ ছাড়া অন্য কোনো ফি যদি অব্যয়িত থাকে তা একইভাবে ফেরত দেবে বা টিউশন ফির সঙ্গে সমন্বয় করবে।

তবে যদি কোন অভিভাবক চরম আর্থিক সঙ্কটে থাকেন, তাহলে ওই শিক্ষার্থীর টিউশন ফির বিষয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিবেচনায় নেবেন। এখানে উল্লেখ্য, কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন যেনো কোনো কারণে ব্যাহত না হয় সে বিষয়টি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যত্নশীল হতে হবে।‘বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০২১ সালের শুরুতে যদি কোভিড-১৯ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এমন কোনো ফি যেমন— টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন, উন্নয়ন নেবে না, যা ওই নির্দিষ্ট খাতে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করতে পারবে না। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় আগের ন্যায় সব ধরনের যৌক্তিক ফি নেয়া যাবে। -ডেস্ক রিপোর্ট