গণপরিবহনে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। পুরোনো ছবি

(দিনাজপুর২৪.কম) বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ গণপরিবহন সীমিত আকারে চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামী রবিবার থেকে চলতে শুরু করবে সড়ক, রেল ও নৌ পরিবহন। আনুষ্ঠানিক এ ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে এখন পরিকল্পনা চলছেÑ কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হবে তা নিয়ে। আজ শুক্রবার সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে বৈঠক করে করণীয় নির্ধারণ করতে পারেন বলে সূত্রের খবর।

সড়কপথের ক্ষেত্রে বাস-মিনিবাস, সিএনজি অটোরিকশাসহ অন্যান্য গণপরিবহন কীভাবে চলাচল করবে এ নিয়ে আজ বিকালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে বৈঠকের কথা রয়েছে। আসন ফাঁকা রাখার যুক্তিতে এ বৈঠকে পরিবহন নেতারা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানাতে পারেন। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণপরিবহন মালিকদের প্রতি অনুরোধ করেছেন পরিকল্পনা নিয়ে গাড়ি চালানোর।

তিনি গতকাল বলেছেন, সরকার গণপরিবহন চালুর বিষয়ে ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে বিআরটিএসহ বসে আলাপ-আলোচনা করে একটি পরিকল্পনা তৈরির অনুরোধ করছি। গণপরিবহন পরিচালনায় যাত্রী, পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের সুরক্ষায় সুনির্দিষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে সবাইকে।

পরিবহন মালিকদের নেতা ও সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গাড়ি চালানো যায় এ নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিআরটিএর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বৈঠকের মাধ্যমে তা চূড়ান্ত করা হবে।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান ইউসুব আলী মোল্লা জানান, বৈঠকের মাধ্যমেই সীমিত আকারে গণপরিবহন চালুর নির্দেশিকা দেওয়া হবে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকসহ সবাই থাকবেন সেখানে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে কারিগরি কমিটির সুপারিশকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ গঠিত কমিটির ১৪টি সুপারিশ রয়েছে সড়কপথে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে। এগুলোর মধ্যে আসন ফাঁকা রেখে যাত্রী পরিবহন, মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জীবাণুনাশক স্প্রে করা অন্যতম। তবে এসব নির্দেশনা রক্ষার মানসিকতা নতুবা মানতে বাধ্য করার মতো অবস্থায় নয় পরিবহন খাত। বরং দীর্ঘদিন যান চলাচল বন্ধ থাকায় আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠতে পারেন শ্রমিকরা।

সাধারণত পরিবহন মালিক-শ্রমিক কেউই স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নজর দিতে চান না। করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা পাচ্ছেন না কোনো ভাতা বা অনুদান। নেতাগোছের লোকেরাই অর্থকড়ি পকেটে ভরেছেন। ত্রাণসহ সংগঠনের কল্যাণ তহবিলের টাকাও শ্রমিক নেতাদের পকেটে। গাড়ি পাহারায় থাকা মহাখালী টার্মিনালের শ্রমিকরা দিনপ্রতি ৩০০ টাকা পান; সায়েদাবাদে আরও কম, ২০০ টাকা। তদুপরি নেই তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা। এমনকি কোনো শ্রমিকনেতা তাদের খোঁজ পর্যন্ত নেননি, বলছেন সাধারণ শ্রমিকরা। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবহন শ্রমিকরা বেকার। দুর্বিষহভাবে দিনাতিপাত করছেন। এমতাবস্থায় গণপরিবহন চালু হলে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের প্রবণতা কাজ করতে পারে তাদের মধ্যে।

এ বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক  বলেন, সড়ক পরিবহন বহু মালিকবেষ্টিত খাত। গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা শ্রমিকদের অভ্যাস। দীর্ঘদিন উপার্জন বন্ধ থাকার কারণে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব মানার প্রবণতা থাকবে কম। তবে তাদের ভর্তুকিসহ প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, দেশে নিবন্ধিত ২০ ধরনের গাড়ি আছে ৪৪ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ গাড়ি বাণিজ্যিক।

এদিকে আগামী ৩১ মে রবিবার থেকে ট্রেন চালু হবে বলে জানিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। সরকারি এ গণপরিবহনে কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে, যাত্রী পরিবহন ও টিকিট বিক্রি হবেÑ আগামীকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে তা জানানো হবে।

প্রায় একই কথা বললেন রেলওয়ের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান। তিনি জানান, আসন ফাঁকা রেখে টিকিট বিক্রি হবে। কাউন্টারে ভিড় এড়াতে অনলাইনে টিকিট বিক্রিতে উৎসাহী করা হতে পারে। আপাতত লোকাল ও মেইল ট্রেনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সামাজিক দূরত্বের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির ১৪টি সুপারিশ রয়েছে রেলযাত্রার ক্ষেত্রে। এর ৪ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে, সব এয়ার সিস্টেমের ফিরতি বাতাস বন্ধ রাখুন। তা করতে গেলে বিদ্যমান এসি কোচ পরিচালনা সম্ভব নয়। এর বাইরে সাধারণ কোচের বেলায় যাত্রী পরিবহন, আসন বণ্টন, স্টেশনে তাপমাত্রা নিরীক্ষা ও পরিচ্ছন্নতাসহ বেঁধে দেওয়া নিয়ম মানা কঠিন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ট্রেনে যাত্রী পরিবহন সহজ হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাধারণত রাজধানী থেকে দিনে ৩৬টি আন্তঃনগর ট্রেন ছাড়ে। গুরুত্ব বিবেচনায় আপাতত ৮-১০টি চালু করা হতে পারে।

অন্যদিকে নৌপথের বেলায়ও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ গঠিত কারিগরি কমিটির ১৪টি নির্দেশনা রয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় থার্মোমিটার, স্যানিটাইজার, সীমিত আকারে টিকিট বিক্রি, প্রতিবার লঞ্চ ছাড়ার আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে লঞ্চে যাত্রী পরিবহন করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আজ বিআইডব্লিউটিএ কার্যালয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ৩১ মে থেকে নৌপথ সচল হবে। কীভাবে লঞ্চ চলবে, এ নিয়ে গত মার্চে একটি বৈঠক হয়েছিল। এর পর সরকারি ছুটির (লকডাউন) ঘোষণা আসে। দুই মাস বন্ধ থাকার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে যাত্রী পরিবহন করা হবে, পর্যালোচনার মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার পর চলবে লঞ্চ-স্টিমার তথা নৌপথ।

সার্বিক বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দিনের পর দিন যানবাহন বন্ধ রাখা কঠিন। সীমিত আকারে গণপরিবহন চালু কতটা বাস্তবসম্মত তাও দেখার বিষয়। কারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে যাত্রী পরিবহন করতে পারলে অবশ্যই ভালো হবে। তবে তা সম্ভব কিনা সেটিই দেখার বিষয়। -সূত্র : আ. সময়