(দিনাজপুর২৪.কম) মামলার খড়গের নিচে থাকা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে- তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দলের নেতা-কর্মীরা। বিচারে শীর্ষ এ দুই নেতাকে ‘সাজা’ দেওয়া হলে দল কীভাবে চলবে তা নিয়েও হাজারো প্রশ্ন বিএনপির ঘরে-বাইরে। এরই মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই রায় আসতে পারে। এ দুই মামলায় খালেদা জিয়া প্রধান আসামি। একটিতে রয়েছেন তার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। বিএনপি প্রধানের বিরুদ্ধে গ্যাটকো ও নাইকো দুর্নীতি মামলাও চলছে। এরই মধ্যে নাইকো দুর্নীতি মামলায় তাকে দুই মাসের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চাঞ্চল্যকর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাও চলছে দ্রুতগতিতে। ওই মামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমানের নাম রয়েছে।

জানা যায়, শুধু জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধেই ৭৫টি মামলা রয়েছে। অবশ্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা গেছেন। এর মধ্যে আগের পাঁচটি ছাড়াও খালেদা জিয়ার ঘাড়ের ওপর এ পর্যন্ত ১৮ মামলার খড়গ ঝুলছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও রয়েছে অন্তত অর্ধশত মামলা। এ ছাড়াও বিশ হাজারেরও বেশি মামলায় পাঁচ লক্ষাধিক বিএনপি নেতা-কর্মী আসামি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৮৩টি মামলার আসামি হয়ে কারাগারে। অবশ্য সব মামলায় সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন তিনি। আজ-কালের মধ্যে তার মুক্তির সম্ভাবনাও রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের সব নেতার বিরুদ্ধেই কম-বেশি মামলা বিচারিক প্রক্রিয়ায়।বিএনপির আইন পেশায় সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, ন্যায়বিচার পেলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া কোনো মামলা উচ্চ আদালতে টিকবে না। তারা বলছেন, সব মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ-সংশয় রয়েছে। সরকার বিচার বিভাগকে পুরোপুরি দলীয়করণ করে ফেলেছে। বিচারপতিরা স্বাধীনভাবে রায় ঘোষণা করতে পারছেন না। এ কারণে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে মামলাগুলোতে ‘সাজা’ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ সুযোগে সরকার ‘অসৎ’ উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টাও করতে পারে। কিন্তু খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানো হলে বিএনপি তো ভাঙবেই না, আরও শক্তিশালী হবে। কারণ অতীতে যারা সংস্কারপন্থায় অংশ নিয়েছিলেন, আজ তারা বুঝতে পারছেন। মূল স্রোত থেকে বেরিয়ে এখন তারা অনুতপ্ত।এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছে, এগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে। এটা নিয়ে বিএনপি রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেই পারে। সরকারও তার রাজনীতি করতে পারে। এ নিয়ে একজন আইনজীবী হিসেবে আমি কোনো কল্পনাপ্রসূত বক্তব্য দিতে পারি না।’অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নাইকো দুর্নীতির একই অভিযোগে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের মামলা চলছে। একইভাবে তারেক রহমানের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এ মামলায় তারেক রহমানকে জড়াতে পারেনি। কিন্তু বর্তমান সরকার সম্পূরক অভিযোগপত্রে তার নাম জড়িয়েছে। এ মামলার মূল আসামি মুফতি হান্নানও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করেননি। প্রশ্নবিদ্ধ এসব মামলায় সরকার খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে সাজা দেওয়ার চিন্তাভাবনা করলে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে।’বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মতে, ‘ন্যায়বিচার পেলে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে কোনো মামলাই টিকবে না। কিন্তু আমরা ন্যায়বিচার পাব কিনা তা নিয়ে সংশয়ে আছি। কারণ বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। তাদের পক্ষে এখন ন্যায়বিচার করা কঠিন কাজ। জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিচার প্রক্রিয়া স্বাভাবিক গতিতে শেষ হতে বেশি দিন লাগবে না। এ দুই মামলায় চেয়ারপারসনকে সাজা দিলেও দল ভাঙতে পারবে না। কারণ বিএনপি একটি বটবৃক্ষ। এটা ভাঙার শক্তি এ সরকারের নেই।’জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২৩ জুলাই দিন ধার্য করেছেন আদালত। ১৯ জুন রাজধানীর বকশীবাজার এলাকার কারা অধিদফতর মাঠে অবস্থিত ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার এ দিন ধার্য করেন। এ মামলায় হাজিরা দিতে গতকাল আদালতে উপস্থিত হন বেগম খালেদা জিয়া।

জিয়া অরফানেজ মামলা : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক হারুনুর রশিদ। মামলায় অভিযোগ করা হয়, এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে একটি বিদেশি ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন আসামিরা। মামলার অপর আসামিরা হলেন- তারেক রহমান, সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান। এ মামলায় ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

জিয়া চ্যারিটেবল মামলা : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের নামে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক হারুনুর রশিদ। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়। এর কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট  দেখাতে পারেনি। এ ছাড়া জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা ‘অবৈধ’ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়।

নাইকো দুর্নীতি মামলা : কানাডার কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিসাধন ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও থানায় নাইকো দুর্নীতি মামলা করে দুদক। ২০০৮ সালের ৫ মে এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়। এ মামলায় আগামী দুই মাসের মধ্যে বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়াকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদার করা রিট আবেদন ও মামলা বাতিল-সংক্রান্ত রুল খারিজ করে ১৯ জুন বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ও বিচারপতি জাফর আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতে এ মামলার কার্যক্রম চলার ওপর হাইকোর্টের  দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।এ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘একই বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলা হাইকোর্ট বাতিল করায় আমরা আশা করেছিলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মামলাও বাতিল করা হবে।  সেভাবেই শুনানি ও যুক্তিতর্কে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু হাইকোর্টের এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। আশা করি আপিল বিভাগে আমরা ন্যায়বিচার পাব।’

গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা : গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা বাতিলেও খালেদা জিয়ার রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রুল জারি ও মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেছিলেন হাইকোর্ট। ১৯ এপ্রিল মামলাগুলোর রুল শুনানি পেছাতে খালেদার আইনজীবীদের চারটি সময়ের আবেদন খারিজ করার পর গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় রুল শুনানি শুরু হয়। এ শুনানি ১৭ জুন শেষ হওয়ায় রায় যে কোনো দিন দেওয়া হবে জানিয়ে অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন হাইকোর্ট। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলার রুল শুনানি চলছে হাইকোর্টে। ৯ এপ্রিল এ মামলার কার্যক্রমের ওপর হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশ আরও ছয় মাসের জন্য বৃদ্ধি করেন আদালত।

তারেকের যত মামলা : বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘাড়ের ওপর এ পর্যন্ত অর্ধশত মামলার খড়গ ঝুলছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা করা হয়েছে। তারেকের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুটি মামলা ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন। এখন এ মামলাগুলোর সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের ঋণ খেলাপের দায়েও একটি মামলা হয়।

গ্রেনেড হামলা মামলা : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে  গ্রেনেড হামলার দুটি মামলা করে পুলিশ। একটি হত্যা ও আরেকটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলা। বর্তমান সরকারের আমলে এ দুটি মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমানকে আসামি করা হয়। ২০১১ সালের ৩ জুলাই সিআইডির দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমান ছাড়াও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জামায়াত নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান  মোহাম্মাদ মুজাহিদ, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউকসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়। এ নিয়ে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫২।এ প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘জিয়া পরিবারকে রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই সরকার ষড়যন্ত্র করছে। এরই অংশ হিসেবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলাগুলোর সাজা দেওয়ার পাঁয়তারা করছে সরকার। কিন্তু এসব করেও সরকারের শেষ রক্ষা হবে না। গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জয় হবেই ইনশা আল্লাহ।’ -(ডেস্ক)