(দিনাজপুর২৪.কম) প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সাধারণ ছুটি দিয়ে সরকার ঘরে থাকার নির্দেশ দিলেও অনেকেই তা কর্ণপাত করছে না। সামাজিক দূরত্ব মানছে না। বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছে। জেল-জরিমানা করেও নির্দেশনা মানতে বাধ্য করা যাচ্ছে না।

রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার অলিগলি, মোড় ও চায়ের দোকানে অনেককে অহেতুক আড্ডা দিতে দেখা গেছে। ঘরের বাহির না হতে এবং একত্রে আড্ডা দিতে বা ঘোরাফেরা না করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বারবার আহ্বান জানালেও অনেকে কর্ণপাত করছে না। শুধু ঢাকা নয়, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে রাজধানীতে বেশিরভাগ মানুষই তা মানছে না। জটলা পাকিয়ে চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়াসহ কাঁচাবাজার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানে মানুষের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে। আবার ঠুনকো অজুহাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে রাস্তায় বের হচ্ছেন কেউ কেউ। জরুরি কাজে নিয়োজিত পরিবহনের বাইরে ব্যক্তিগত কিছু গাড়িও রাস্তায় দেখা গেছে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ রোববার রাজধানীর কিছু কিছু স্থানে কঠোর অবস্থান নেয়। রাস্তায় বের হলেই কোথায় যাবে, কেন যাবে- এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেককে। জরিমানাও গুনতে হয়েছে অনেককে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্নের মুখে পড়ে অনেকেই বলছে, তারা গুরুত্বপূর্ণ কাজে বের হয়েছে। মূলত ঝামেলা এড়াতেই তারা এ ধরনের মিথ্যাচার করছে। কড়াকড়ি আরোপ এবং অনুরোধের পরও পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানগুলোতে যুবক-বৃদ্ধ এমনকি স্কুলছাত্রদের আড্ডা দিতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে করোনা নিয়ে সচেতনতার কিছুই নেই। শুধু চায়ের দোকানে নয়, রাস্তার মোড়, অলি-গলি, বাড়ির ছাদ ও সিঁড়িতে জটলা পাকিয়ে আড্ডা দিতে দেখা যায় লোকজনকে। সেনা ও পুলিশের গাড়ি দেখলে লোকজন দ্রুত সটকে পড়ে। দোকানিরাও তালা দিয়ে সটকে পড়ে। পরে আবার দোকান খোলে।

২৬ মার্চ থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে অঘোষিত লকডাউন চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও অন্যসব সংস্থা মানুষকে ঘরে থাকার বারবার আহ্বান জানাচ্ছে। জরুরি কাজ, পেশাগত দায়িত্ব পালন, খাদ্যসামগ্রী এবং ওষুধ কেনার প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশের টহল টিম নিয়মিত অলিগলিতে টহল দিচ্ছে এবং মাইকিং করছে।

রোববার রাজধানীর মিরপুর, আগারগাঁও, তালতলা, শেওড়াপাড়াসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অলিগলিতে মানুষজনকে অযথা জটলা করতে দেখা গেছে। অধিকাংশ চায়ের দোকানে একটি শাটার খোলা রেখে বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে দোকানিরা বাইরে একজনকে পাহারায় রাখে। পুলিশের গাড়ি চোখে পড়তেই বাইরের ব্যক্তি শাটার বন্ধ করে দেন।

আগারগাঁও এলাকায় আমজাদ হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কারও কানে যাচ্ছে না। টোলারবাগে করোনায় মানুষ মারা গেলেও সেখানে মানুষজনের কোনো ভয়-ডর নেই। শেওড়াপাড়ায় একটি বন্ধ দোকানের সামনের সিঁড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছিল চার কিশোর। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই প্রয়োজনে বেরিয়েছিলাম বলে তারা হেঁটে চলে যায়। তালতলা এলাকার চিত্রও প্রায় একই রকম।

রাজধানীর রায়েরবাজার কাঁচাবাজারে দেখা গেছে, বাজারজুড়ে মানুষের ভিড়। মাছের দোকান কিংবা সবজির দোকান সবখানেই ক্রেতাসমাগম। নিরাপদ দূরত্বের তোয়াক্কা করছে না অনেকেই। ধানমণ্ডি, জিগাতলা, মোহাম্মদপুর, সিটি কলেজ, নিউমার্কেট, আজিমপুর এলাকার অলিগলিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের আড্ডা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে মহল্লার চায়ের স্টলগুলোতে তরুণ ও কিশোরদের আড্ডা দিতে দেখা গেছে।

এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মানুষের অজুহাতের শেষ নেই। যাদের সন্দেহ হচ্ছে তাদের জিজ্ঞাসা করছি। তারা বলছে, মেডিকেলে যাচ্ছি। আমার মা-ভাই অসুস্থ, প্রতিবেশী অসুস্থ। কিংবা বাজার করতে যাচ্ছি অথবা আমি ওষুধ কিনতে যাচ্ছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সন্দেহ জাগে, তারা মিথ্যা কথা বলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, এমন পরিস্থিতিতে অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা বন্ধ না করা গেলে এর ফল খুবই খারাপ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নিহাল করিম বলেন, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। নতুবা এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। ছেলেরা যাতে বিনা কারণে বাইরে ঘোরাফেরা করতে না পারে সেজন্য অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া জরুরি।

বরিশালের চিত্রও একই রকম : বরিশাল ব্যুরো জানায়, করোনা সংক্রমণ রোধে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে রোববার সকাল থেকে নগরীর চৌমাথা, নথুল্লাবাদ, কাশীপুর, সদর রোড ও ত্রিশ গোডাউন এলাকায় জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অধিক মানুষের সমাগম না করার পাশাপাশি গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় বিভিন্ন অপরাধে কয়েকজনকে ছয় হাজার ৮৫০ টাকা জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াউর রহমান ও মো. সাইফুল ইসলাম।

সামাজিক দূরত্ব না মেনে ভাড়ায় মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনের দায়ে মনির হোসেন ও মো. রিয়াজকে ৩৫০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। এ সময় কয়েকটি পরিবহনকে সতর্ক করা হয়। নগরীর সদর রোডের মোহনা ডিপার্টমেন্ট স্টোর শাটার অর্ধ খোলা রেখে একসঙ্গে ১৫-২০ জনের কাছে পণ্য বিক্রির অপরাধে মোহনা ডিপার্টমেন্ট স্টোরকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। নগরীর বাংলাবাজার, আমতলা মোড়, সাগরদী, রুপাতলি হাউজিং এবং রুপাতলি বাস স্ট্যান্ড এলাকায় তিন মোটরসাইকেল চালককে ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

সোনারগাঁয়ে সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না : রিপোর্টে (সোনারগাঁ) বলা হয়, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সেনাবাহিনী-পুলিশের যৌথ প্রচারের পরও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অধিকাংশ মানুষ সামাজিক দূরত্ব মানছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পরও হাট-বাজার ও বাস স্ট্যান্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে। নির্দেশনা উপেক্ষা করে মানুষজন ঘরের বাইরে ঘোরাফেরা করছে ও আড্ডা দিচ্ছে।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলামের নেতৃত্বে নিয়মিত উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। আইন অমান্য করায় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও প্রবাসীকে জরিমানা করা হয়েছে। শনিবার রাতে কাঁচপুর, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা, বৈদ্যের বাজার ও সাদিপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও প্রবাসীকে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।- ডেস্ক