(দিনাজপুর২৪.কম) ক্যাসিনো ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠন বাংলাদেশ যুবলীগ। জাতীয় কংগ্রেসের তারিখ ঘোষণা হলেও নেই উত্তাপ। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর ঢাকা দুই মহানগরসহ কেন্দ্রীয় কমিটির অর্ধশত নেতা লাপাত্তা। সম্মেলন হলেই আসবেন নেতৃত্বে, এমন দাবি করলেও মাঠে নেই। গ্রেপ্তার এড়াতে এবং অবৈধ পন্থায় অর্জিত সম্পদ রক্ষায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

লাপাত্তা নেতাদের অধিকাংশই সংগঠনটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরীর অনুসারী। ওইসব নেতার মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা নেয়ার অভিযোগ ওঠার পর ওমর ফারুক চৌধুরীও গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে প্রকাশ্যে না এলেও অভিযুক্তদের অনেকেই গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। আর বিতর্ক না থাকলেও পদপ্রত্যাশীরাও নিরুত্তাপ লবিয়িং করছেন। প্রার্থিতা নিয়ে মুখ খুলছেন না।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় যুব সংগঠন বাংলাদেশ যুবলীগ। আগামী ২৩ নভেম্বর সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল বা কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কাউন্সিলের মাত্র দেড় মাস বাকি থাকলেও নেই উত্তাপ। এ যেন বড়ই বেমানান সংগঠনটির ইতিহাসে। যুবলীগের সম্মেলন মানেই উৎসব। গোটা দেশ মেতে উঠে উৎসবে। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন আর সজ্জিত গেটে ছেয়ে যায় গোটা এলাকা। কিন্তু এখন এর বালাই নেই। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মুখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যুবলীগ। ঢাকার দুই মহানগর ও কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতারা ক্যাসিনো ব্যবসাসহ অবৈধ পন্থায় বিত্তশালী হওয়ার অভিযোগে মাঠ ছেড়েছেন।

যুবলীগ সূত্র মতে, প্রকাশ্যে উত্তাপ না থাকলেও যুবলীগে নিরুত্তাপ লবিয়িং চলছে। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্তদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। ধানমন্ডিস্থ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের অফিস-বাসায় আনাগোনা বেড়েছে। গত সপ্তাহ থেকে যুবলীগের গুলিস্তান কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয় সম্মেলন সফল করতে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে সংগঠনটির হাইকমান্ড। সম্মেলন সফল করতে বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। গত শুক্রবার গুলিস্তান কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের নিয়ে নীতিনির্ধারক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জানতে চাইলে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ বলেন, যুবলীগ অত্যন্ত সংগঠিত। যথাসময়ে সম্মেলনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

নেতা নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। কারা দায়িত্বে আসবেন, সে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি।

যুবলীগে নেই ওমর ফারুক চৌধুরীর জৌলুস, লাপাত্তা অনুসারী রাঘব-বোয়ালরা গত এক দশক ধরে যুবলীগের রাজনীতির ত্রাণকর্তা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী। তার একক নির্দেশনায় চলে আসছে সংগঠনটি। তিনি চাইলেই মিলেছে পদ, অসন্তুষ্ট হলে হারিয়েছে পদ। আর দুটো কাজের বিনিময়েই নিয়েছেন মোটা অঙ্কের অর্থ। দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-অস্ত্রবাজি-ক্যাডারবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত যুবলীগ নেতাদের গডফাদার হিসেবে উঠে এসেছে ওমর ফারুক চৌধুরীর নাম। তার ছত্রছায়ায় সংগঠনটির ডজন খানেক নেতার নেতৃত্বে গোটা রাজধানীর অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ হয়। এসব নেতা আর ওমর ফারুক চৌধুরীর মেলবন্ধনের মধ্যস্থতা করতেন পিয়ন থেকে যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক হওয়া কাজী আনিসুর রহমান।

সূত্র মতে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার দুই বছরের মধ্যেই রাজধানীতে একক আধিপত্য বিস্তার করে যুবলীগ। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ে যুবদলের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো প্রথমেই আয়ত্তে নেয় যুবলীগ। এরপর সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে যুবলীগের আয়ত্ত। যুবলীগের রাজনীতি মানে রাতারাতি বিত্তশালী বনে যাওয়া। গোটা এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন যুব সংগঠনটির নেতারা। ফুটপাত থেকে শুরু করে অফিস, রেস্তোরাঁ, নতুন ভবন নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ করেন তারা।

বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মহানগরের দুই কমিটির শীর্ষ নেতারা। ওইসব নেতার ছত্রছায়ায় একাধিক মার্কেট ও বাড়ি দখল করার ঘটনাও ঘটেছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্যাসিনোর আদলে গড়ে তোলা হয়েছে জুয়ার ক্লাব। রাত হলেই এসব ক্লাবগুলোতে জুয়ারিদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। ক্লাব পরিচালনায় আনা হয়ে থাকে বিভিন্ন দেশ থেকে অভিজ্ঞ জুয়ারিসহ সুন্দরী নারী। সুন্দরী নারীরা ক্লাবগুলোতে আগত জুয়ারিদের আলাদা আনন্দের খোরাক জোগায়।শুধু ক্লাব নয়, বাসা-বাড়িতেও নিয়মিত জুয়ার আসর বসানো হয়। রাত হলেই ওই নেতাদের ছত্রছাত্রায় মাদক ব্যবসাসহ ক্লাবের নামে চলে জুয়ার আসর।

এসব অপকর্মের মাধ্যমে প্রতিদিন অন্তত দেড়শ কোটি টাকা অবৈধ আয় হয়, যার বিরাট অংশ পান নিয়ন্ত্রক নেতারা। ইতোমধ্যে এসব অপকর্মের মাধ্যমে অবৈধ অর্থের মালিক বনে যাওয়া একাধিক নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে যুবলীগ নেতা জি কে শামীম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমান, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

গা ঢাকা দিয়েছেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহি, দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান আনিস, যুবলীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক তসলিম উদ্দীন, মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কায়সার আহমেদ, সহ-সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মইনুল হাসান নিখিল, সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কমিশনার একেএম মমিনুল হক সাঈদ, সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী সরোয়ার হোসেন বাবু, মোরসালিন, সহ-সভাপতি আনোয়ারুল ইকবাল সান্টুসহ শতাধিক নেতা।

যুবলীগ নেতা পরিচয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে গত ৭ বছরে এরা ছিলেন প্রভাবশালী নেতা। কেন্দ্রীয় সম্মেলন এলেও তারা নিষ্ক্রিয়, তাদের দেখা মেলা দুস্কর। সম্মেলন হলেই তারা আসবেন শীর্ষ পদে, গত কয়েক বছর ধরে এমন আলোচনা থাকলেও এখন কোথাও নেই। অভিযোগ ওঠার পর থেকে গুলিস্তানের দলীয় কার্যালয় এবং তাদের নিজ কার্যালয়গুলোতেও দেখা যায়নি।

অন্যদিকে, দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-অস্ত্রবাজি-ক্যাডারবাজিসহ নানা অপকর্মের মূলহোতা হিসেবে যুবলীগ চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর তিনিও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তিনি সংগঠনের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না। নিজ বাসাতেই অবস্থান করছেন, সংগঠনের নেতাদের সঙ্গেও দেখা দিচ্ছেন না। গত শুক্রবার তাকে ছাড়াই সংগঠনের সর্বোচ্চ ফোরামের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ওই সভায় বহিষ্কার করা হয় তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত কাজী আনিসুর রহমানকে। তার অবৈধ অর্থের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধান চলছে। ওমর ফারুক চৌধুরী নিষ্ক্রিয়তা এবং রাঘব-বোয়ালদের গা ঢাকার পর কর্মী ও সমর্থকরা বোল পাল্টে ফেলছেন। সম্মেলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়লেও অনুসারীরা কেউ কার্যালয়ে আসছেন না। যার কারণে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও যুবলীগের অন্য নেতারা সক্রিয় হতে শুরু করেছেন।

বাদ পড়তে পারেন ফারুক, হারুনসহ ডজন খানেক নেতা
এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যুবলীগের দায়িত্ব থেকে বাদ পড়তে পারেন বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদসহ ডজন খানেক নেতা। এসব নেতাদের বিরুদ্ধে অবৈধ পন্থায় বিত্তশালী হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রয়েছে দখল ও হত্যাসহ অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ। অভিযোগ ওঠা এসব নেতার প্রায় সবাই চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরীর অনুসারী। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্বে থাকা সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদও এবার বাদ পড়ছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগের বিষয়ে যুবলীগ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

আলোচনায় যারা
নানা অপকর্মে জড়িত রাঘব-বোয়ালখ্যাত আলোচনায় আসা যুবলীগের নেতাদের দানব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুবলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন, মেধাবী ও ত্যাগী নেতাদের দায়িত্বে আনতে চান প্রধানমন্ত্রী। সম্মেলন ঘিরে যুবলীগের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রকাশ্যে না এলেও তাদের ঘিরে গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

চেয়ারম্যান হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন- যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে ও সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ ফজলুল হক মনির বড় ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ। যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুর রহমান মারুফ। তিনি যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমান আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের আপন ছোট ভাই। শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ছোট ছেলে শেখ ফজলে নাঈমও আলোচনায় রয়েছেন।

আরও আলোচনায় রয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরী লিটন, প্রেসিডিয়াম সদস্য শহীদ সেরনিয়াবাত, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, আতাউর রহমান, অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান শহীদ। আর সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন বর্তমান কমিটির দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক।

যুবলীগের নেতা নির্বাচনের বিষয়ে সব সময় সিদ্ধান্ত নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিটি কংগ্রেসে নেতা নির্বাচন হয়েছে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তে। এবার যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় থাকা শেখ পরিবারের যে কোনো একজন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে যুবলীগের প্রথম সারির নেতাদের যে কেউ আসতে পারেন বলে সূত্র দাবি করেছে।

সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৪ জুলাই যুবলীগের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যান ও হারুনুর রশীদ সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে শেখ ফজলুল হক মনি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। -ডেস্ক