(দিনাজপুর২৪.কম) ব্যর্থ হয়েছে ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘অভ্যুত্থান’ চেষ্টা। তার সমর্থকরা ক্যাপিটল হিলে সিনেটরদের জিম্মি করার পরিকল্পনায় কমান্ডো হামলা চালায়। কিন্তু তাদের অনিয়ন্ত্রিত তাণ্ডবে ভেস্তে গেছে সব। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তরে সম্মতি দিতে বাধ্য হয়েছেন ট্রাম্প। বরাবরের মতো পরাজয় মেনে নেননি তিনি। তবে তার উন্মত্ত সমর্থকদের তাণ্ডবলীলার কারণে পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসনে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জো বাইডেনের ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটে বিজয় চূড়ান্ত করেছে কংগ্রেস। সুর পাল্টে এ ঘোষণা দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স।

ফলে আগামী ২০শে জানুয়ারি বাইডেনের শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা রইলো না। এখন শুধু অপেক্ষার পালা। ওদিকে ট্রাম্পের বিদ্বেষী রাজনীতির বলি হয়েছেন চারজন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে কমপক্ষে ৫২ জনকে। চারটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর নিউ ইয়র্কের গভর্নর অ্যানড্রু কুমো এ ঘটনাকে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের ব্যর্থ অভ্যুত্থান বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে অযোগ্য, নিষ্ঠুর ও বিভক্তি সৃষ্টিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। তারা একে গণতন্ত্রের ওপর হামলা বলে আখ্যায়িত করেছেন। হামলায় উস্কানি দেয়ার অভিযোগে ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার অভিশংসিত করার প্রস্তাব করেছেন বেশকিছু আইনপ্রণেতা। এর মধ্যে রয়েছেন কয়েকজন ডেমোক্রেট ও একজন রিপাবলিকান। ট্রাম্পকে পদত্যাগ অথবা তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভারমন্ট রাজ্যের রিপাবলিকান গভর্নর ফিল স্কট। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্রেট ইলহান ওমর ট্রাম্পকে অভিশংসনের আর্টিকেলের খসড়া প্রস্তুত করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ফক্সনিউজ, সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বুধবার রচিত হয় সবচেয়ে নোংরা অধ্যায়। ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে ক্যাপিটল হিলে। বুধবার ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জো বাইডেনকে কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত অনুমোদনের দিন। এদিন ক্যাপিটল ভবনে কংগ্রেসের অধিবেশন বসে। সেখানে ভরাট সভা। চুলচেরা বিতর্কে মগ্ন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। চলতে থাকে আলোচনা, বিতর্ক, প্রশ্নোত্তর। এরইমধ্যে বাইরে হট্টগোল। কেউ অবশ্য তখনো কল্পনাই করতে পারেননি কী ঘটতে চলেছে। ডনাল্ড ট্রাম্পের কয়েক হাজার উগ্র সমর্থক তখন হাজির ক্যাপিটল ভবনের সামনে। তাদের কারো কারো হাতে অস্ত্র। নিরাপত্তারক্ষীরা চেষ্টা করছেন তাদের আটকাতে। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ। একসময় তারা হামলে পড়েন গণতন্ত্রের তীর্থ স্থানে। রচিত হয় মার্কিন ইতিহাসে এক লজ্জাজনক অধ্যায়ের। কয়েক ঘণ্টা ক্যাপিটল ভবন দখলে রেখে রীতিমতো তাণ্ডব চালায় ট্রাম্প সমর্থকরা। তারা প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির অফিসে ঢুকে সেখানে ভাঙচুর করে। তার চেয়ারে বসে আপত্তিকর ভঙ্গিতে টেবিলের ওপর পা তুলে দেয়। তছনছ করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকে সেসব কাগজপত্র। এমন অবস্থায় আইনপ্রণেতাদের সরিয়ে নেয়া হয় সুড়ঙ্গ দিয়ে। এরপর ভবনকে দখলমুক্ত করতে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এফবিআই জানিয়েছে, তারা দু’টি সম্ভাব্য বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করেছে। ক্যাপিটলে হামলার আগে হোয়াইট হাউসের কাছে কয়েক হাজার সমর্থকের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন ট্রাম্প। মিছিল নিয়ে তাদের ক্যাপিটলের দিকে যেতে বলেন তিনি। পরে অবশ্য এক ভিডিও বার্তায় তিনি সমর্থকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনে ১২ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়। সাময়িক সময়ের জন্য ডনাল্ড ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে দেয় ফেসবুক ও টুইটার। জো বাইডেন জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে ঘটনাটিকে একটি বিদ্রোহ হিসেবে উল্লেখ করেন। একবাক্যে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্ব নেতারা। তারা এই ঘটনাকে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর অধিবেশন আবার শুরু হয়। সেই অধিবেশনে জো বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। একই সঙ্গে মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়েছে ডেমোক্রেটরা। জর্জিয়ায় হাই প্রোফাইল নির্বাচনে দু’টি আসনেই জয় পেয়েছেন তারা। পাঁচশ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্রেট প্রার্থী জন অসফ ও রাফায়েল ওয়ারনব। এখন সিনেটে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকানদের আসন সমান। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিসের টাইব্রেকিং ভোটে ডেমোক্রেট পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারবে।

বুধবার ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের টেলিভিশনের নিয়মিত সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে ফুটিয়ে তোলে ওই হামলা। বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে ২০০ বছরের ইতিহাসে গণতন্ত্রের ওপর এমন হামলা এর আগে কখনো ঘটেনি। হামলার সময় কংগ্রেসের ভেতরে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। সিনেটরদের প্রাণভয়ে এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে তারা হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন সুড়ঙ্গের দিকে। এর কয়েক ঘণ্টা পরে স্থানীয় সময় বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আবার অধিবেশন শুরু হয়। তাতে সভাপতিত্ব করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। তিনি কর্মসূচি শুরু করেন- ‘আসুন আমরা আমাদের কাজ শুরু করি’ বলার মধ্য দিয়ে। এ সময় সিনেটররা তাকে করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করেন। তিনি আরো বলেন, যারা ক্যাপিটল হিলে অনাচার করেছেন, তারা বিজয়ী হননি। এই অধিবেশনেই জো বাইডেনের বিজয় চূড়ান্ত করা হয়। ফলে আগামী ২০শে জানুয়ারি তার শপথ নেয়ার পথে আর কোনো বাধাই থাকবে না এখন। কিন্তু ট্রাম্পের উস্কানিতে এই সহিংসতার জন্য হোয়াইট হাউসে তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাট পটিঙ্গার, হোয়াইট হাউসের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সারাহ ম্যাথিউ, ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাবেক প্রেস সেক্রেটারি স্টিফেন গ্রিশামসহ অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। ট্রাম্পের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন রিপাবলিকানরাই। তার মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদ কনফারেন্স চেয়ারওম্যান লিজ চেনি টুইটারে লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে দাঙ্গা সৃষ্টি করেছেন এতে কোনো সন্দেহই নেই। তিনি দাঙ্গায় উস্কানি দিয়েছেন। তিনি দাঙ্গাকারীদের সামনে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাঙ্গার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছেন। আরকানসাসের রিপাবলিকান দলের সিনেটর টম কটন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে পরাজয় মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন জনগণকে বিভ্রান্ত করা বন্ধ করুন। বন্ধ করুন সহিংসতা।
বুধবার ওয়াশিংটন পোস্ট ও মিয়ামি হেরাল্ড পত্রিকার সম্পাদকীয় পরিষদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিতে ট্রাম্পের মন্ত্রিপরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ামি হেরাল্ডের সঙ্গে তারাও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীর অধীনে ট্রাম্পকে সরিয়ে দেয়ার এই আহ্বান জানিয়েছে। ক্যাপিটল হিল ভবনে ভয়াবহ দাঙ্গার পর এ আহ্বান জানানো হয়। বুধবার রাতে ওয়াশিংটন পোস্টের মতামত কলামে ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ‘আগামী ১৪ দিন ক্ষমতায় থাকার অযোগ্য (যুক্তরাষ্ট্রের) প্রেসিডেন্ট। তিনি ক্ষমতায় থাকলে প্রেসিডেন্টের যে বিশাল ক্ষমতা আছে তা জনশৃঙ্খলা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই ওই সম্পাদকীয় পরিষদ ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং ট্রাম্পের বাকি মন্ত্রিপরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অবিলম্বে বৈঠকে বসে ২৫তম সংশোধনী সক্রিয় করতে। ২৫তম সংশোধনীর অধীনে প্রেসিডেন্ট যদি অসুস্থতা অথবা বিকলাঙ্গতার কারণে দায়িত্ব পালনে সক্ষম না হন তাহলে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। এই সংশোধনীর অধীনে একবার যদি প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দেয়া হয় তাহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মন্ত্রিপরিষদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব পালনে সক্ষম কিনা।

পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত এমন একটি সূত্র বলেছেন, ট্রাম্পের মন্ত্রিপরিষদের কিছু সদস্য ও তার মিত্রদের মধ্যে ২৫তম সংশোধনী সক্রিয় করা নিয়ে আলোচনা চলছিল। এর অধীনে মন্ত্রিপরিষদ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ট্রাম্পকে তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম ঘোষণা করতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদ আছে আর দু’সপ্তাহেরও কম। এত কম সময় বাকি থাকতে এমন উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন দ্বিতীয় একটি সূত্র। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিনেটে রিপাবলিকান নেতা মিশ ম্যাকনেল। তিনি বুধবারের হামলাকে ব্যর্থ বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছেন, আমরা আইনহীনতা ও ভয়ভীতির কাছে মাথা নত করবো না। আমরা আমাদের অবস্থানে ফিরে এসেছি। সংবিধানের অধীনে আমাদের দেশের জন্য আমরা দায়িত্ব পালন করবো এবং সেটা এখনই করতে চলেছি। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম কংগ্রেসে এদিন তার দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে সুর মিলান নি। তিনি উল্টে গিয়ে কথা বলেছেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। বলেছেন, আমি যেটা বলতে পারি, সেটা হলো যথেষ্ট হয়েছে। জো বাইডেন এবং কমালা হ্যারিন পুরো আইনি প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত। তারা আগামী ২০শে জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন।
এদিন ব্যাটলগ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত অ্যারিজোনায় বাইডেনের বিজয় সার্টিফাইয়ের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের আপত্তি নিয়ে ভোটাভুটি হয় সিনেটে। তাতে ৯৩-৬ ভোটে তাদের আপত্তি খারিজ হয়ে যায়। ফলে অ্যারিজোনায় তাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়। একই ইস্যুতে এর আগে প্রতিনিধি পরিষদে ভোট হয়। সেখানেও ৩০৩-১২১ ভোটে বিজয়ী হয় ডেমোক্রেটরা। পেনসিলভ্যানিয়া রাজ্যের নির্বাচনের সার্টিফিকেশনের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের আপত্তি ভোটে দেয়া হয়। এতেও ৯২-৭ ভোটে পরাজিত হয় রিপাবলিকানরা। -ডেস্ক রিপোর্ট