(দিনাজপুর২৪.কম) কে হচ্ছেন দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি? দ্বিতীয় মেয়াদে মো. আবদুল হামিদই থাকছেন এ পদে; নাকি নতুন কেউ আসছেন— এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। রয়েছে জল্পনা-কল্পনা, কিছু গুঞ্জনও। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকারের শেষ সময়ে এসে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ নিয়ে ক্ষমতাসীনরা কি নতুন কোনো ঝুঁকি নেবে; নাকি বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে রেখেই অবতীর্ণ হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন— এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে নানা মহলে। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী কি একাধিক হবে, নাকি একক প্রার্থীই থাকবেন— সে আলোচনাও রয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার সংসদ সদস্যরা। বর্তমান জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকারী আওয়ামী লীগ। ফলে সে দলের মনোনীত প্রার্থীই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন। স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে মূল ভূমিকা রাখবেন। তবে এখন পর্যন্ত তিনি এ ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেননি বা কিছু বলেননি।

‘তবে রাষ্ট্রপতি পদে দ্বিতীয় মেয়াদে আবদুল হামিদকেই পছন্দ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের’— এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন দলের একাধিক নীতিনির্ধারক। তাদের মতে, বিশ্বস্তের জায়গা থেকে বিকল্প কাউকে ভাবছে না দলটি। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদই দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য এ পদে থাকতে পারেন। বিষয়টি চূড়ান্ত বলেও মত প্রকাশ করেছেন তারা। ফলে স্থানীয় সরকার, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করলেও রাষ্ট্রপতি পদের জন্য এটা করবে না আওয়ামী লীগ।

অবশ্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বিকল্প কিছু নামও আলোচনায় আসছে। বেশি আলোচনা হচ্ছে তিনজনকে নিয়ে। তারা হলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তবে সবকিছু নির্ভর করছে দল ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর।

এমন আলোচনায় মধ্যেই আজ দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা জানান, আগামী ১৮-২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শুধু সংসদ সদস্যরাই ভোট দেবেন; ভোটগ্রহণ হবে সংসদে; তবে নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন সিইসি। ইতোমধ্যেই ইসির চাহিদা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ ভোটার তালিকা সরবরাহ করেছে বলে জানিয়েছেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

এর ফলে আজ থেকেই বাংলাদেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবে ইসি। সংবিধান অনুযায়ী, শুরু হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষণ-গণনা। এইদিন থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। এর আগে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পাঁচ বছরের মেয়াদ এ বছরের ২৩ এপ্রিল শেষ হবে। আর সংবিধান অনুযায়ী, মেয়াদ অবসানে পূর্ববর্তী ৯০ হতে ৬০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে সংবিধানের ১২৩ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে উক্ত পদ শূন্য হইলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী নব্বই হইতে ষাট দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ আইনজ্ঞরা বলছেন, মেয়াদ পূরণের আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বলতে প্রথম ৩০ দিনকে বোঝাবে। নির্বাচন কমিশনও তাই মনে করে। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান থাকায় সংসদের চলতি ১৯তম অধিবেশনের মধ্যেই এ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ অধিবেশনটি চলার সিদ্ধান্ত রয়েছে।

নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, গতবারের মতো এবারও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। সংসদে ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে অন্যকোনো দল থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ক্ষমতাসীন দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তিনিই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। এ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয় প্রকাশ্যে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গোপনে অন্য দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ সংসদ সদস্যদের (এ নির্বাচনের ভোটার) নেই।

সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কারো বয়স ৩৫ বছরের নিচে হলে, সংসদ সদস্য নির্বাচনের যোগ্য না হলে এবং সংবিধানের অধীন অভিশংসন দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হলে তিনি অযোগ্য বিবেচিত হবেন। এছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী আইন অনুসারে সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবক ও সমর্থক না হলে কেউ প্রার্থী হতে পারবেন না।

এদিকে, নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে যে তিনজনের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এগিয়ে রয়েছেন বলে আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানিয়েছে। দলীয় নীতি নির্ধারকরা বলছেন, প্রতিটি নির্বাচনের আগে নির্বাচনকে ঘিরে নানা সংকট দেখা দেয় দেশে। সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয় রাষ্ট্রপতিকে। তাই নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতি নিয়ে বড় কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না আওয়ামী লীগ। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ পরীক্ষিত। অনেক জাতীয় বিষয়ে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। রাজনৈতিক ও জাতীয়ভাবে তার একটি আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। সব মতের নেতাদের কাছে প্রিয় ব্যক্তিও তিনি। গত পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনকালে তার কোনো কালিমা নেই। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দলের সমর্থনের বিষয়টি জানিয়ে এসেছেন দলের দুই শীর্ষ নেতা।

তাছাড়া সংবিধানের ৫০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রপতি পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘একাদিক্রমে হউক বা না হউক- দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোনো ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকিবেন না।’

এছাড়া বর্তমান দশম জাতীয় সংসদে যেহেতু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, সেহেতু আওয়ামী লীগের প্রার্থীই হবেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন দিক থেকে দক্ষতাসম্পন্ন বলে তিনি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পান। পরবর্তীতে তাকেই দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করে জাতীয় সংসদ।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ব্যাপারে দলীয় সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের এই সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্ত্রী শীলা ইসলামের মৃত্যুর পর অনেকটাই নীরবে সময় কাটাচ্ছেন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যেতে তিনি নিজেই হয়তো রাজি হবেন না। বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষে সংবিধান অনুযায়ী, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন আগামী পাঁচ বছরের জন্য। আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন দিক পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে। সেক্ষেত্রে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এ দফায় রাষ্ট্রপতি না হওয়ারই কথা। তবে দলীয়ভাবে বর্তমান স্পিকার শিরিন শারমীন চৌধুরীর ব্যাপারে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. আবদুল হামিদ। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯ মেয়াদে এ পর্যন্ত ১৬ জন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই হিসাবে আবদুল হামিদ এই পদে সপ্তদশ ব্যক্তি। বাংলাদেশের আইনে এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকতে পারবেন। -ডেস্ক