মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী সু চি এবং দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের আটক করে জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী

(দিনাজপুর২৪.কম) মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটির ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দিয়েছে। বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হওয়ার এক দশকের মাথায় এমন কাণ্ড ঘটাল বাহিনীটি। এই অভ্যুত্থানে দেশজুড়েই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এমনিতেই দমন-নিপীড়নমূলক সামরিক শাসনের অধীনে প্রায় ৫০ বছর পার করেছে তারা। ২০১১ সালে গণতান্ত্রিক শাসনমুখী হয় দেশটি। গতকাল সোমবার সকাল সকাল অং সান সু চি ও অন্য রাজনীতিকদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বিভীষিকাময় দিনগুলোর সেই দুঃস্মৃতিই এখন সামনে আসছে। অথচ অনেকে ভেবেছিল সেই সব দিন আর ফিরবে না।

পাঁচ বছর ধরে মিয়ানমার শাসন করছিল সু চি ও তার একদা-নিষিদ্ধ এনএলডি (ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি) দল। তারা ২০১৫ সালে ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয় পেয়েছিল। সোমবার সকালে দলটি দ্বিতীয় মেয়াদে শাসনভার নিতে যাচ্ছিল।

তবে মঞ্চের আড়ালে সামরিক বাহিনীই মিয়ানমার (যা বার্মা নামেও পরিচিত) পরিচালনায় তুলনামূলক শক্তিশালী ভূমিকায় ছিল। সংবিধানই সে সুযোগ করে দিয়েছে- অন্তত সংসদের ২৫ ভাগ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য বরাদ্দ এবং দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মন্ত্রণালয়গুলোও এই বাহিনীর হাতে।

ফলে এ প্রশ্ন উঠে আসছে যে, এখন কেন ক্ষমতা দখল করতে উদ্যত হলো সেনাবাহিনী এবং এর পর কী ঘটবে?

ট্রাম্পের কায়দায় ভোট কারচুপির অভিযোগ এর ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন নয়। বিবিসির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা জোনাথন হেড বলছেন, সোমবারই নির্বাচনের পর পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন বসার কথা ছিল এবং তাতে নির্বাচনের ফল পূর্ণতা পেত- যা এখন আর হবে না।

নভেম্বরের ওই নির্বাচনে এনএলডি ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোট পায়। রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যার অভিযোগ সত্ত্বে¡ও এ দলটি এখনো মিয়ানমারে বিপুলভাবে জনপ্রিয়।

কিন্তু ভোটের পর পরই জালিয়াতির অভিযোগ তোলে সামরিক বাহিনী সমর্থিত বিরোধী দল। এক বছরের জরুরি অবস্থা জারিকে যৌক্তিকতা দেওয়ার জন্য নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতেও এ অভিযোগটি পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘৮ নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটার তালিকায় যে গুরুতর অনিয়ম ছিল, তার সমাধান করতে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে।’

যদিও এ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দেওয়া হয়েছে যৎসামান্যই।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, ‘অং সান সু চি স্পষ্টতই নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছেন। নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগগুলো অনেকটা ট্রাম্পসুলভ, এসব অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না।’

রবার্টসন বলছেন, এ ক্ষমতা দখলের ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। তার ভাষায়, ‘এই ভোটে হার মানেই ক্ষমতা হারানো। আসলে তো তা নয়।’

ক্ষমতা হারানোর ভয় সেনাবাহিনীর?

নভেম্বরের নির্বাচনে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ভোটের খুব সামান্য অংশই পেয়েছে। কিন্তু তার পরও সামরিক বাহিনী এখনো মিয়ানমারে সরকারের ওপর ব্যাপক প্রভাব রাখতে সক্ষম। কারণ, ২০০৮ সালে সামরিক শাসনের সময় যে বিতর্কিত সংবিধানটি তৈরি হয়েছিল, তাতে সামরিক বাহিনীকে পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন দেওয়া হয়।

অন্যদিকে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র এবং সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণও তুলে দেওয়া হয় সামরিক বাহিনীর হাতে। সেই সংবিধান যতদিন বহাল আছে, ততদিন সামরিক বাহিনীর হাতেও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থেকে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, নভেম্বরের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের ফলে এনএলডি কি সেই সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা পেয়ে যেত?

জোনাথন হেড বলছেন, তেমন সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। কারণ সংবিধান বদলাতে হলে পার্লামেন্টের ৭৫ শতাংশ সমর্থন দরকার। আর সামরিক বাহিনীর হাতে যদি ২৫ শতাংশ আসন থাকে- তা হলে তা প্রায় অসম্ভব।

তা হলে কেন অভ্যুত্থান হলো?

সাবেক সাংবাদিক এবং প্রযুক্তিবিদ আয়ে মিন থান্ট আভাস দিচ্ছেন, এর পেছনে হয়তো আরেকটা কারণ থাকতে পারে। সেটি হলো : নির্বাচনের এই ফল সেনাবাহিনীকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। থান্ট বলেছেন, ‘তারা আশা করেনি যে তারা এভাবে হারবে। যেসব লোকের পরিবারের সদস্যরা সামরিক বাহিনীতে আছে, এমনকি তারাও তাদের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।’

তবে এটা বলতেই হবে যে এর চেয়ে অনেক বড় কিছু কারণও আছে।

থান্ট বলেছেন, ‘আপনাকে বুঝতে হবে সামরিক বাহিনী মিয়ানমারে তাদের অবস্থানকে কীভাবে দেখে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া অং সান সু চিকে দেশের মা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। তবে সামরিক বাহিনী নিজেদের মনে করে তারাই এ দেশের পিতা। বিশেষ করে তারা বাইরের লোকদের একটা বিপদ হিসেবে দেখে থাকে।’

এখন কী হবে?

সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো জেরার্ড ম্যাককার্থি বলেছেন, ‘এটা মনে রাখতে হবে যে মিয়ানমারের বর্তমান পদ্ধতি সেনাবাহিনীর জন্য খুবই সুবিধাজনক। তাদের কমান্ড কাঠামোর সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন আছে, তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থসমূহে বেশ বড় পরিমাণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আছে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের হাত থেকে রাজনৈতিক সুরক্ষাও আছে।’

ম্যাককার্থির মতে, ‘তাদের কথামতো এক বছরের জন্য ক্ষমতা দখল করায় তারা চীনা নয় এমন আন্তর্জাতিক অংশীদারদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, সামরিক বাহিনীর বাণিজ্যিক স্বার্থও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং যারা মিস সু চি ও এনএলডিকে আরেক মেয়াদের জন্য ভোট দিয়েছে- সেই লাখ লাখ লোকের দিক থেকে প্রতিরোধের সম্ভাবনা উসকে দেবে।’

ম্যাককার্থি বলছেন, সামরিক বাহিনী হয়তো ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ইউএসডিপির অবস্থা ভালো হবে এমন আশা করছে, তবে এমন পদক্ষেপের ঝুঁঁকিও কম নয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বলছেন, সামরিক বাহিনীর এ পদক্ষেপ মিয়ানমারকে আবার একঘরে রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং জনগণকে ক্রুদ্ধ করে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। তিনি বলছেন, ‘আমার মনে হয় না মিয়ানমারের জনগণ এটা বিনা প্রশ্নে মেনে নেবে। তারা সামরিক শাসনে ফিরে যেতে চায় না। বরং তারা অং সান সু চিকে তা প্রতিরোধের এক হাতিয়ার বলে মনে করে।’

রবার্টসনের মতে, ‘এমন আশা এখনো আছে যে আলোচনার মাধ্যমে ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হতে পারে। কিন্তু যদি দেখা যায় যে বড় আকারের প্রতিবাদ শুরু হয়ে গেছে, তা হলে বুঝতে হবে আমরা বড় এক সংকটে পড়েছি।’ -ডেস্ক