(দিনাজপুর ২৪.কম) কবির একটা পাহাড় কেনার শখ ছিল। সে শখ হয়তো কারোরই পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু বাংলাদেশেই একজন পাহাড় মালিক রয়েছেন। তা-ও আবার যেনতেন পাহাড় নয়, দেশের অন্যতম শীর্ষ চূড়া কেওক্রাডংয়ের মালিক। এই পাহাড়ের আশপাশে ২০ বিঘা জমির মালিক লাল মুন থন। সবার কাছে যিনি পরিচিত লালা বম নামে।

কেওক্রাডং চূড়ার শেষ প্রান্তে সরকারিভাবে ১৯৯৩ সালে যে একটুকু সিঁড়ি করা হয়েছে, তার গোড়াতেই লালা বমের কটেজ। কাঠের দোতলা বাড়ি। নিজেরা থাকেন নিচতলায়, ওপরের ঘরটা ভাড়া দেন পর্যটকদের। সবাই এ কটেজের গালভরা নাম দিয়েছে ‘লালা বমের রেস্টহাউস’। লালা বম, তার স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ ও দুই নাতনি নিয়ে তাদের সংসার। কেওক্রাডংয়ে থাকতে হলে এই কটেজেই আশ্রয় নিতে হয় সবার। কটেজের বারান্দা থেকে যতদূর চোখ যায়, কেবল সবুজে সবুজে অপরূপ পাহাড়ের সারি। শুভ্র মেঘের ভেলা সেসব পাহাড়ের কোলে পরম আদরে আশ্রয় নিয়েছে।

আদিবাসী বম সম্প্রদায়ভুক্ত লালা বমের বাবা এই ভূসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন ডিসি অফিস থেকে এই জমি শত বছরের লিজ পান লালা বমের পরিবার। তখন এই জায়গাটা ব্যবহার হতো গয়ালের খামার হিসেবে। লালা বম জানান, তার বাবার প্রায় দুই থেকে তিন হাজার গয়াল ছিল। এখন অবশ্য সে অবস্থা নেই। অল্প কিছু গয়াল আছে, তা-ও অন্যখানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মাস কয়েক আগে নতুন করে আরও কয়েকটা কটেজ বানিয়েছেন লালা বম। প্রতিটি কটেজে ১২ জনের মতো লোক থাকতে পারে। ঝর্ণা থেকে নেমে আসা দূরের এক ঝিরিতে পাইপ বসিয়ে মেশিন দিয়ে সরাসরি পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেগুলোতে। বাড়ির সামনে রাখা বিশাল গাজী ট্যাংক। এক রাত থাকার জন্য জনপ্রতি ভাড়া ১০০ টাকা। খাবার জন্য খরচ হয় ১৩০ থেকে ১৭০ টাকা।
এ বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে হাজারখানেক পর্যটকের আগমন ঘটেছিল কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়। লালা বম বলেন, মানুষের আনাগোনা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ঈদের সময় হিমশিম খেতে হয়েছে। তবে ভালো লাগে মানুষ এতদূর ছুটে আসছে দেখে।পাহাড়প্রেমীরা বলে থাকেন, বান্দরবানের প্রতিটি জায়গারই দুটি রূপ আছে। একটি সূর্যের আলোতে এবং অন্যটি রাতে। রাত্রি নেমে এলে লাল বমের উঠোন মেঘ এসে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। আর যদি চাঁদ উঁকি মারে তো মনে হবে, চাঁদের আলো গলে গলে পড়ছে পাহাড় বেয়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার ২০০ ফুট ওপরে কাঠের দোতলা ঘরে শুয়ে টিমটিমে প্রদীপের আলোয় মনে হতে পারে, পৃথিবী ছেড়ে কোনো এক অজানা গ্রহে আছি।
পাহাড়ের বিশালতার এই সৌন্দর্যের কাছে সব ক্লান্তি যখন হার মেনেছে, ঠিক তখনই রাতের খাবারের ডাক আসবে। বেঞ্চি ফেলে কাঠের টেবিলে লালা বম এবং তার স্ত্রী অতিথিদের খাবার পরিবেশন করেন। পাহাড়ি মুরগি, খাসি কিংবা ডিম ভাজির সঙ্গে খিচুড়ি_ আগে থেকে জানিয়ে রাখলে সবকিছুই প্রস্তুত রাখেন তারা।

লালা বম জানান, কেওক্রাডং নামটি এসেছে মারমা ভাষা থেকে। মারমা ভাষায় ‘কেও’ মানে পাথর, ‘ক্রা’ মানে পাহাড় এবং ‘ডং’ মানে সবচেয়ে উঁচু। কেওক্রাডং মানে সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়। এই পাহাড় বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় অবস্থিত। ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে লেখা দেশের সর্বোচ্চ চূড়া। এখন এই পাহাড়চূড়া উচ্চতার লিস্টে পাঁচ নম্বরে থাকলেও এর সৌন্দর্য কোনো অংশে কমেনি।
সেনাবাহিনী কর্তৃক পাহাড়ের চূড়ায় যে নামফলকটি স্থাপন করা হয়েছে, তাতে লেখা আছে উচ্চতা তিন হাজার ২৩৫ ফুট বা ৯৮৬ মিটার। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মানুষের হাত ভালোই পড়েছে। চূড়া আর আশপাশের পাহাড়ের গাছগুলো একটু কেটেছেঁটে ফেলা হয়েছে। দু’পাশে আছে দুটি হেলিপ্যাড। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আছে একটি ছাউনি।

পুরো ট্রেকিংয়ে সব সময়ের সঙ্গী হবে পায়ের নিচে থাকা মেঘমালা। এখানকার স্থানীয় মানুষের সরলতা আর আন্তরিকতা প্রত্যেক মানুষকে নতুন উপলব্ধি দিতে বাধ্য। অসম্ভব পরিশ্রম করা পাহাড়ি জনবসতির প্রাণের স্পন্দনও মুগ্ধ করবে পর্যটকদের।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সৌজন্যে রুমা সদর থেকে কেওক্রাডংয়ের নিকটবর্তী বগা লেক পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মিত হয়েছে। রুমা থেকে বগা লেকের পাদদেশ বলে পরিচিত কমলাবাজার পর্যন্ত চান্দের গাড়িতে পর্যটকরা যাওয়া-আসা করতে পারেন। বগা লেক থেকে যাওয়ার পথে চিংড়ি ঝর্ণা পড়বে। এমনি যেমন তেমন, বর্ষাকালে এই ঝর্ণা পূর্ণ যৌবন লাভ করে।
কেওক্রাডংয়ে যাওয়ার আগে প্রথম যে জনবসতি চোখে পড়ে তা হলো দার্জিলিংপাড়া; বম বসতিদের গ্রাম।

পাড়ার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই গ্রামে দার্জিলিংয়ের মতো ঠাণ্ডা পড়ে বলে এর নাম হয়েছে দার্জিলিংপাড়া। কেওক্রাডং থেকে কয়েকশ’ গজ নিচে এই গ্রামের অবস্থান। সব মিলিয়ে শ’খানেক পরিবারের বসবাস।
কেওক্রাডংয়ের সামনে মিনিট দশেকের পথ দেশের সর্বোচ্চ গ্রাম পাসিংপাড়া। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, মেঘের ওপর ভাসছে গ্রামটি।
সব সময় বান্দরবানের পাহাড়ে যাতায়াত করেন এমন অনেকের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছে লালা বমের। এমনকি কেউ প্রথমবারের মতো এই চূড়ায় পা রাখলেও পরম বন্ধু ও আত্মীয়ের মতো বরণ করে নেবে লালা বমের পরিবার।
কেওক্রাডংয়ের চূড়া যেমন পর্যটকের আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন পূরণ করে, সে সঙ্গে মুগ্ধ করে এই পাহাড়ের মালিক লালা বম ও তার পরিবারের আতিথেয়তাও।(ডেস্ক)