(দিনাজপুর২৪.কম) দিনের তখন বাকি মাত্র ৩.৩ ওভার। দাপুটে ব্যাটিংয়ে ১৯২/২ সংগ্রহ নিয়ে লঙ্কানদের জবাব দিচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু কী খেলা কী হয়ে গেল? শেষ বিকালে খেই হারালেন টাইগাররা। মাত্র ৭ বলের ব্যবধানে তিন উইকেট উধাও। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ২১৪/৫ সংগ্রহ নিয়ে গতকাল ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ করে সফরকারী বাংলাদেশ। কলম্বোর পি সারা ওভাল মাঠে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ তখন পিছিয়ে ১২৪ রানে।
পি সারা ওভালে পুরনো আভিজাত্যের ছোঁয়া। গ্যালারি বলতে একচালা টিনের তিনটি ঘর। যেগুলোতে অস্থায়ী চেয়ার বসিয়ে দেয়া হয় দর্শকদের জন্য। উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে প্রেসিডেন্ট আর ভিআইপি বক্স। এগুলোও বহুতল ভবন নয়। বক্স দুটির নিচে সারি সারি কাঠের বেঞ্চ। যেটিকে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড বলেই চালিয়ে দেয়া যায়। যেখান থেকে একটু পরপর উড়ছিলো শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের পতাকা। দৃশ্যটাকে ঐক্য আর সাম্যের প্রতীক বলেই মানলেন অনেকে। কলম্বো টেস্টের দুইদিন মাঠের বাইরের এই দৃশ্য সবার মন কেড়ে নেয়। আর মাঠের ভেতরে মনকাড়া ব্যাটিং করে সকল আলো কেড়ে নিলেন একজন। তিনি দিনেশ চান্ডিমাল। তার ব্যাটিং দ্যুতিতেই কলম্বো টেস্টের প্রথম দিন ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়া শ্রীলঙ্কা তাদের প্রথম ইনিংস ৩৩৮ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারলো।
কাল লাঞ্চের পর ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশও লড়াই করার বার্তা দিয়ে রাখে। তামিম-সৌম্য দারুণ শুরু এনে দেন। চান্ডিমালের মতোই সাবলীল ছিল দুজনের ব্যাট। প্রথম উইকেটে ৯৫ রান জমা করে তারা যখন দূরের পথ দেখাচ্ছেন তখনই ছন্দপতন। রঙ্গনা হেরাথের নিচু হয়ে আসা বল ডিফেন্স করতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনেন তামিম ইকবাল। হেরাথের আবেদনে আম্পায়ার আলিম দার সাড়া না দিলেও রিভিউ নিয়ে তামিমকে ৪৯ রানে হতাশ করেন শ্রীলঙ্কার গল টেস্টের নায়ক। প্রথম স্পেলে উইকেটশূন্য থাকা হেরাথ দ্বিতীয় স্পেলে এসেই সফল। সৌম্য অবশ্য তামিমের পথে হাঁটেননি। শ্রীলঙ্কায় এসে যেন ব্যাটিংয়ের ব্যাকরণ নতুন করে শিখতে শুরু করেছেন। ব্যাটিংয়ে সুবাস ছড়িয়ে টানা তিন ইনিংসে ফিফটি। তবে সান্দাকানের বলে বোল্ড হওয়ার পরে পি সারা ওভালের প্রেসবক্সে আলোচনা, সৌম্য কি হাবিবুল বাশার হয়েই থাকবেন! ১২১ বল খেলে ৬১ রান, বাউন্ডারি ৬টি, সৌম্য ইনিংসটাকে টানতে পারলেন না চান্ডিমালের মতো। সৌম্যের বিদায়ে উইকেটে সাব্বির রহমান। সান্দাকানের বলে চার দিয়ে খাতা খোলেন রানের। এরপর সাব্বির খেললেন নিজের মতো করেই। টেস্ট, ওয়ানডের চেয়ে টি-টুয়েন্টিটা ভালো বুঝেন, পি সারায়ও সাব্বিরের ব্যাটে সেই বার্তা। বলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রান তুলেছেন। তবে টি-টুয়েন্টির মেজাজে কি আর টেস্ট ক্রিকেট হয়। সুরঙ্গ লাকমলের শর্ট ডেলিভারি পুল করতে গিয়ে শর্ট ফাইন লেগে ডি সিলভার হাতে ক্যাচ দেন সাব্বির, তখন তার রান ৪২। সাব্বিরের আগেই অবশ্য সাজঘরে ফিরেছেন ইমরুল কায়েস আর তাইজুল ইসলাম। বাংলাদেশ ইনিংসের ৫৭ তম ওভারে পরপর দুই বলে ইমরুল আর তাইজুলকে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিক সম্ভাবনা জাগান সান্দাকান। সাকিব উইকেটে এসে  হ্যাটট্রিক রুখতে পারলেও কাজ যা করার আগেই করে ফেলেছেন এ লঙ্কান স্পিনার। লঙ্কান এই স্পিনারের কারণেই কাল দুপুরের আনন্দ শেষ বিকেলে এসে ম্লান হয় বাংলাদেশের। সান্দাকানের তিন শিকারে ৩ উইকেটে ১৯২ থেকে মুহূর্তেই ৫ উইকেটে ১৯৮ বাংলাদেশ! সাকিব-মুশফিক অবিচ্ছিন্ন থেকে ২১৪ রানে শেষ করেন দিনের খেলা। প্রথম ইনিংসে তখনো ১২৪ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

প্রস্তুতি ম্যাচেই জ্বলে ওঠার ইঙ্গিত ছিল। মোরাতোয়ায় ১৯০ করেও ছিলেন অপরাজিত। গল টেস্টে তাই বাংলাদেশ বোলারদের দুশ্চিন্তার নাম ছিলেন দিনেশ চান্ডিমাল। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৫৫ রান হয়তো তেমন কিছু নয়, কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে তার অপরাজিত ৫০ রান শ্রীলঙ্কাকে জয়ের পথ দেখায়। তবে কে জানতো চান্ডিমাল কলম্বো টেস্টের জন্যই জমিয়ে রেখেছিলেন সবটুকু। ব্যাটিং যে শুধু রান তোলা নয়, শিল্পও, পি সারা ওভালে তো তারই প্রদর্শনী ছিল চান্ডিমালের। টেস্ট ক্রিকেটের দাবি মেনে উইকেটে কাটালেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। টেস্টের প্রথম দিন ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়া শ্রীলঙ্কাকে দেখালেন আলোর পথ। গুনারত্নেকে নিয়ে জুটি বাঁধার শুরু, আর শেষ করলেন লাকমলকে নিয়ে। ৮ম উইকেটে অধিনায়ক রঙ্গনা হেরাথকে নিয়ে আর নবম উইকেটে লাকমলকে সঙ্গী করে তুলেন ১১০ রান। এর মধ্যে ৮ম উইকেটে হেরাথকে নিয়ে ৫৫ রান তুলে পেছনে ফেলে দেন ২০০৫ সালে পি সারা ওভালে মুরালিধরন-চামিন্ডা ভাসের গড়া ৫৩ রানের রেকর্ড। ৮৬ রানে অপরাজিত থেকে দ্বিতীয় দিন ব্যাটিং শুরু করা চান্ডিমাল কাল ১১তম ওভারেই পেয়ে যান সেঞ্চুরি। মোস্তাফিজের বল স্কয়ার লেগে পাঠিয়ে প্রান্ত বদল করেই তিন অঙ্কে পৌঁছে যান তিনি। ৩৫২ মিনিট উইকেটে থেকে ২৪৪ বল খেলে চান্ডিমাল পান ক্যারিয়ারের ৮ম আর বাংলাদেশের বিপক্ষে তার চতুর্থ সেঞ্চুরি। রিভিউ নিয়ে প্রথম দিন দুইবার বেঁচে যাওয়া চান্ডিমাল কাল সেঞ্চুরির পর আরেকবার জীবন পান রিভিউ নিয়ে। মোস্তাফিজের বল ব্যাটে বাতাস লাগিয়ে মুশফিকের হাতে জমা পড়তেই আম্পায়ার এস রবি আউট ঘোষণা করেন চান্ডিকে। তবে রিভিউ নিয়ে আবারো জীবন পাওয়া চান্ডিমাল অন্তত এই টেস্টে আম্পায়ারদের কাঠগড়ায় তুললেন। চান্ডিমাল আউট হওয়ার পর স্বীকৃত ব্যাটসম্যান বনে যান লাকমল। লঙ্কান এই পেসারের ৪৫ বলে ৩৫ রান স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস নিয়ে যায় ৩৩৮ রানে। প্রথম দিন ৭ উইকেটে ২৩৮ তোলা শ্রীলঙ্কা কাল যোগ করে আরো ১০০ রান। কে জানে এই শতরানই কিনা কলম্বো টেস্টে বাংলাদেশের গলার কাঁটা হয়ে থাকে। -ডেস্ক