-সংগ্রহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) হঠাৎ কালবৈশাখীতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছয়জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। নৌকাডুবিও ঘটেছে বেশ কিছু জায়গায়। বেশ কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি না থাকায় শুকনো খটখটে হয়েছিল। তাপমাত্রাও হঠাৎ করে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দেশের কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি অতিক্রম করে। দেশে সৃষ্টি হয় খরা পরিস্থিতি। এর মধ্যেই গতকাল রোববার সন্ধ্যার দিকে শুরু হয় ভারী বৃষ্টিসহ কালবৈশাখী ঝড়। ঝড় ও বজ্রপাতে রাজধানীতে তিনজন, মৌলভীবাজারে দুই বোন এবং সুনামগঞ্জে একজন নিহত হয়েছেন।

গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ করে আকাশ কালো করে শুরু হয় ঝড় ও বৃষ্টি। ভেঙে পড়ে গাছের ডাল। ভবনের উপর থেকে ইট, চেয়ার ইত্যাদি পড়ে নিহত হওয়ার ঘটনাসহ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতে রাস্তায় জমে যায় পানি। পল্টনের একটি ভবন থেকে এক চা-দোকানির মাথায় ইট পড়লে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। শেরেবাংলা নগরে এক মহিলার উপরে গাছ পড়লে তিনি সাথে সাথেই মারা যান বলে খবর পাওয়া গেছে। শেওড়া পাড়ায় মারা গেছেন অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তি। হাতিরঝিলে ওয়াটার ট্যাক্সি দুর্ঘটনার কবলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।

রাজধানীতে গাছ উপড়ে পড়া গাছের ডাল, বিদ্যুতের খুঁটি, বিলবোর্ডের অবশিষ্টাংশ রাস্তায় পড়ে যানজট লেগে যায়। অনেক স্থানে স্থানীয় মানুষ নিজ উদ্যোগে গাছ কেটে রাস্তা পরিষ্কার করে দিয়েছে। অন্যান্য জায়গায় পুলিশ এসে গাছ সরিয়ে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করে দিয়েছে। রাজধানীতে কোনো কোনো স্থানে চলন্ত প্রাইভেট গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশার উপর গাছের ডাল ভেঙে পড়ে।

ঢাকায় শিলাবৃষ্টির খবর পাওয়া না গেলেও ঢাকার বাইরে বড় বড় শিলাবৃষ্টি পড়ে বাড়িঘর, ফসলের ব্যাপাক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমের মুকুলসহ এ মওসুমের কিছু ফল গাছের।

ঝড়ের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। হঠাৎ বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে আবাসিক এলাকাগুলো। মোমবাতি জ্বালিয়ে কোনোমতে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয়েছে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ২০ থেকে ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

আজ সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়োহাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলা বৃষ্টি হতে পারে।

রোববার সন্ধ্যার সময় ঢাকার আকাশ কালো করে নামে ঝড়, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী ছিল। এতে বিভিন্ন স্থানে গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে। এর মধ্যে সংসদ ভবন এলাকায় গাছ ভেঙে পড়ে এক নারী মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন শেরেবাংলা নগর থানার ওসি জানে আলম।

ওই নারীর নাম মিলি ডি কস্তা (৬০)। তিনি পাশের মনিপুরী পাড়ায় থাকতেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি সান্ধ্যকালীন হাঁটাহাঁটি করছিলেন।

পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হক বলেন, ঝড়ের সময়ই পুরানাপল্টন মোড়ে চায়ের গলিতে উঁচু ভবন থেকে ইট পড়ে নিহত হন মো: হানিফ (৪৫) নামে এক চা-দোকানি।

হানিফকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওসি মাহমুদুল হক বলেন, ‘আশপাশে বহুতল অনেক ভবন রয়েছে। তবে কোন ভবন থেকে ইট পড়েছে, তা বোঝা যায়নি।’

কাকরাইল এলাকায় একটি গাছের ঢাল ভেঙে অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে, এতে অটোরিকশা চালক সামান্য আহত হন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ফায়ারসার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যানুযায়ী, ঝড়ে অন্তত ২৫টি স্থানে গাছ পড়ার ঘটনা ঘটেছে।

ঝড়ে শাহবাগ থানার সাইনবোর্ড উড়ে গেছে। মিন্টো রোডে পুলিশ ভবনের সামনে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়েছে। ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কেও গাছের ডাল ভেঙে সড়কে পড়েছে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের ডিউটি অফিসার আতাউর রহমান জানান, ঢাকার মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের একটি দেয়াল ধসের খবর পেয়ে সেখানে একটি ইউনিট পাঠানো হয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা জানান, পশ্চিমা লঘুচাপের সাথে মওসুমি লঘুচাপের প্রভাবে এই কালবৈশাখী ঝড় হচ্ছে। এই মওসুমে এই ঝড় বৃষ্টি স্বাভাবিক।

সিনিয়র আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, ‘রোববার সন্ধ্যায় রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় ৭০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হানে। ঝড়ের স্থায়িত্ব ছিল ২০ মিনিটের মতো। ঢাকায় ঝড় কমে গেলেও এই ঝড় ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পূর্বদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি কক্সবাজার পর্যন্ত যাবে। মধ্যাঞ্চল থেকে আধ ঘণ্টার মধ্যে এই ঝড়ের প্রভাব কেটে যাবে। মেঘ সরে যাবে। কিন্তু, ঝড়টি দক্ষিণ দিকে যত অগ্রসর হবে, ততই সেসব এলাকায় ঝড়ের প্রভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি হবে। রাত ১২টার মধ্যে ঢাকার আশপাশ এলাকাসহ পুরো মধ্যাঞ্চল ঝড়ের আওতামুক্ত হবে।

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও এর আশপাশ এলাকায় বাংলাদেশের পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মওসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।

পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসাথে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে।

এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা এবং সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ২ নম্বর নৌ-হুঁশিয়ারি সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের অন্য এলাকায় পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়োহাওয়া বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কসঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে।

সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের নদী পরিবেষ্টিত চর হোগলা এলাকায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ভোট গণনা করে নির্বাচনী সামগ্রী নিয়ে ফেরার পথে মেঘনা নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলার উল্টে যায়। গত রাত সাড়ে ৭টায় এ ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বন্দরের কলাগাছিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান। বহনকারী ট্রলারটিতে প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং পুলিশ সদস্য ও নারী আনসারসহ প্রায় ১৯-২০ জনের মতো যাত্রী ছিল। পুলিশ জানায়, এক পুলিশ সদস্যসহ তিনজন নিখোঁজ রয়েছে।

বন্দরের কলাগাছিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নির্বাচনী দায়িত্ব শেষে নদীপথে চর কিশোরগঞ্জের বালুর ঘাট থেকে সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ট্রলারটি। ট্রলারটি মাঝ নদীতে আসার কিছুক্ষণ পরই ঝড়ের কবলে পড়ে উল্টে যায়। ঘটনার খবর পেয়ে নৌ-পুলিশ, থানা পুলিশ, ফায়ারসার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরিদল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযানে কাজ শুরু করেছে। অনেক যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হয়েছেন।

ফতুল্লার পাগলার কোস্টগার্ডের সাব-লে. এম মমতাজুল আসিফ জানান, নির্বাচনী সামগ্রী নিয়ে মেঘনা নদীতে ট্রলার উল্টে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের সদস্যরা ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছে। তবে আর কেউ নিখোঁজ রয়েছে কি না তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ডুবে যাওয়া ট্রলারটিতে কতজন নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা ছিলেন তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে বজ্রপাতসহ শিলাবৃষ্টিতে একজন নিহত ও উঠতি বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টায় উপজেলায় ঝড়ো হাওয়াসহ বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি আঘাত হানে। বজ্রপাতে সদর উপজেলার কাশিপুর গ্রামের কালিকুটা হাওরে এক যুবক নিহত হয়েছেন। তার নাম মো: দেলোয়ার হোসেন (১৮)। দেলোয়ার উপজেলার কাশিপুর গ্রামের জহর মিয়ার ছেলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে দেলোয়ার গরুর জন্য ঘাস কাটতে হাওরের যান। এ সময় হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাৎ বজ্রপাতে সে গুরুতর আহত হয়। স্থানীয়রা খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অপর দিকে, হঠাৎ মেঘলা আকাশ করে ঝড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন হাওরের আংশিক বোরো ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হতে পারে তা তাৎক্ষণিক জানা না গেলেও হাওরে উঠতি ধানের শীষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে এই প্রতিবেদককে জানান কৃষকরা।

কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, চৈত্র মাসের অর্ধেকে হালকা ঝড়ো বাতাস দিয়ে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলায় কালবৈশাখী মওসুমের আগমন বার্তা ঘোষিত হয়েছে।

চৈত্রের এ বৃষ্টি ছিল কৃষকদের কাছে খুবই কাক্সিক্ষত। এ বর্ষণ মাঠে থাকা উঠতি রবি ফসলের জন্য খুবই উপকারী হয়েছে। পাশাপাশি ইরি-বোরো আবাদের জন্যও তা খুবই সহায়ক হবে বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা। পাশাপাশি এ বৃষ্টি সেচের উৎসকেও সমৃদ্ধ করবে বলে মনে করছেন কৃষকরা। এ বৃষ্টি ছিল বহু প্রতীক্ষিত। কাজিপুরে গতকাল দুপুরের পর থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। -ডেস্ক