(দিনাজপুর২৪.কম) নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ফেনীর দায়রা জজ আদালতের রায়ে স্বস্তিতে সরকার, আইনজীবী ও দেশের সর্বস্তরের মানুষ। প্রশংসিত এ রায় হয়েছে ব্যাপক আলোচিত, বিশ্ব দরবারে কুড়াচ্ছে সুনাম। যদিও এ রায়ের পরই নুসরাত হত্যার পূর্বাপর অসংখ্য চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বাদিরা বলছেন, নিম্ন আদালতের এ রায়ে উচ্ছসিত নন তারা। ১৪ কার্যদিবসে নিম্ন আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার কার্যক্রম যেখানে দুই বছর ধরে ঝুলে রয়েছে— উচ্চ আদালতে শুনানি হয়নি আদৌ; সেখানে এমন রায়ে আস্থা রাখতে পারছেন না তারা।

আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বেশির ভাগ ঘটনায় দেখা গেছে, নিম্ন আদালতে রায় দেয়ার পরও উচ্চ আদালতে থমকে দাঁড়াচ্ছে বিচারিক প্রক্রিয়া। যেমনটা ঘটেছে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে রুপা ধর্ষণের পর হত্যা মামলায়ও। ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার রায়ের পর এমনটাই বলছেন রুপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান। নানা জঠিলতা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনীহায় একেকটি মামলা দিনের পর দিন গড়াচ্ছে আদালতে।

তার মধ্যে তনু হত্যা মামলায় তদন্তও থমকে দাঁড়িয়েছে তদন্ত কর্মকর্তার গড়িমসিতে। যে কারণে আদৌ শুরুই হয়নি বিচারিক প্রক্রিয়া। তনুর মা-ও বলছেন, নুসরাত হত্যা মামলার রায় অল্প সময়ে দেয়া প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু তনু হত্যার তদন্ত কেন থমকে রয়েছে এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি সরকারের প্রতি। তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকেও দায়ী করছেন এ জন্য।

এছাড়া খোদ আদালতেই বিভিন্ন সমস্যার কারণে বিচারিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। বাস্তবতার এমন পর্যায়ে যখন উত্তীর্ণ বিচারব্যবস্থা, ঠিক সে সময়ে নুসরাত হত্যায় যুগান্তকারী রায় এসেছে বলছেন অনেকেই। বিশ্বব্যাপী আলোচিত এ ঘটনায় ১৬ আসামির ফাঁসির দণ্ডে ফের সাড়া ফেলেছে।

কিন্তু বছরের পর বছর আড়ালেই রয়ে গেছে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মতোই বহুলালোচিত একাধিক হত্যকাণ্ডের ঘটনা। যেসব ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন দেশের সর্বমহলে ছিলো আলোচিত এবং সেসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সকল সংস্থাও ছিলো তৎপর। এসব ঘটনার একাধিক মামলা আদালতে গড়ালেও আদৌ সুরাহাই হয়নি। অধিকাংশ ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনীহায় আদালতেই উঠেনি।

দীর্ঘদিন থেকেই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ মামলায়ই শেষ পর্যন্ত আসামিরা সাজা পায় না। বরং বিচারপ্রার্থীদেরই জীবনই হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। যারা বিচার পান, তাদেরও পোড়াতে হয় অনেক কাঠখড়। তুচ্ছ থেকে বড় ঘটনা যাই হোক, তাতে যদি কেউ মনে করে তার অধিকার খর্ব হয়েছে, কিংবা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তখনই শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে আদালতকে বেছে নেয় তারা।

একমাত্র আদালতই পারে ব্যক্তি থেকে সামষ্টিক তথা সমাজের প্রতিটি স্তরে সাম্য আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মন্ত্র নিয়েই বিশ্বজোড়া আদালত নামের প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই আদালতেই নানান কারণে অসংখ্য মামলায় দেখা দিয়েছে দীর্ঘসূত্রতা— এমনটাই বলছেন আইনজীবীরা।

হাইকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বলেন, বাংলাদেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা একটা কমন ব্যাপার। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেমন নুসরাত, বা এ জাতীয় যেসব মামলা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সাড়া ফেলা যেসব মামলা রয়েছে, এসবের অনেকটা বাধ্য হয়েই সরকার বা যারা বিচার কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন, তারা খুব কম সময়ের মধ্যে সমাধান করছেন।

যেমন— নুসরাতের মামলাটি ৬২ কার্যদিবসের মধ্যে করা হতো না, যদি এভাবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা না হতো। এক্ষেত্রে যেমন নিম্ন আদালতের আইনজীবীরা বা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করেছে, এভাবে যদি হাইকোর্টও কাজ করে তাহলে ওইসব মামলাও অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান হয়ে যেতো এবং এটা সম্ভব।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে— সব মামলা তো সমানভাবে গুরুত্ব পায় না। যেমন রুপা হত্যার যে মামলার কথা বলা হচ্ছে, এসবে আসলে হাইকোর্টের একটু সময় লাগে। তবে সরকারের এটর্নি জেনারেল অফিসসহ সংশ্লিষ্টরা যদি স্পর্শকাতর ও সামাজিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, সেসব মামলা তারা চাইলে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে আসতে পারেন।

বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার শিকার ঘটনার উদাহরণ খুঁজতে এখন আর দূরে যেতে হয় না মোটেও। খোদ রাজধানীতেই সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, কুমিল্লার তনু, চট্টগ্রামের শিক্ষিকা অঞ্জলী দেবী ও মিতু, নারায়গঞ্জের ত্বকী ও চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর রুপা হত্যাকাণ্ডসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঝুলে আছে কাল ক্ষেপণের ঘেরাটোপে।

নুসরাত হত্যার রায়ের পর দীর্ঘসূত্রতার শিকার মামলার বাদিদের সঙ্গে কথা বললে তালগোল পাকানো অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচার চাইতে গিয়ে যে যন্ত্রণা সইতে হয়, তার চেয়ে কী বিচার না চাওয়াই ভালো? এমন প্রশ্নও ফিরে আসছে বারবা। কিন্তু এবারই প্রথম নারীদের মর্যাদা রক্ষায় ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির তেজোদ্দীপ্ত আত্মত্যাগ তাকে ইতোমধ্যে অমরত্ব দিয়েছে। রাফির এ অমরত্ব চিরকালের অনুপ্রেরণা।

এমনই ঘটনায় গতকাল ফেনীর দায়রা জজ আদালত মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো পিবিআইয়ের সচিত্র তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে ১৬ আসামিকে ফাঁসি রায় দেন। সে রায়ে সরকার পক্ষ থেকে যেমন স্বস্তি প্রকাশ করা হয়েছে, তেমনি গোটা দেশের মানুষও সন্তোষ প্রকাশ করেছে। কিন্তু এ রায়ের মধ্য দিয়ে যন্ত্রণা বেড়েছে সেসব মানুষদের, যাদের কেউ সন্তান, কেউ অভিভাবক কিংবা স্বজন হারিয়ে আদৌ বিচারের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেননি।

তার মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অন্যতম। যে ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু ও শেষের তাগিদ দিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অথচ সেই ঘটনার বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবেদন দাখিলের তারিখই এ পর্যন্ত পেছানো হয়েছে ৬৭ বার। ওই মামলার বর্তমান অবস্থা গন্তব্যহীন। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সাগর সরওয়ার এবং মেহেরুন রুনি সাংবাদিক দম্পতিকে ঢাকায় পশ্চিম রাজাবাজার এলাকার বাসায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

মেহেরুন রুনির ভাই নওশের রোমান গণমাধ্যমকে বলছিলেন, তাদের মাঝে একদিকে রয়েছে শূন্যতা, অন্যদিকে হতাশা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, মেঘ বড় হচ্ছে। সে যখন বুঝবে তার মা-বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু বিচার হয়নি, তখন তার মানসিক অবস্থা কী হবে, তা নিয়েই সবাই শঙ্কি। এই মামলাটির আদৌ কোনো কুলকিনারা হবে কি-না তা নিয়ে সাংবাদিক মহলেও রয়েছে হতাশ।

অনিশ্চিত গন্তব্যে হাঁটছে বহুল আলোচিত ও নৃশংস আরেক হত্যামামলা। যা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যামামলা। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে টিউশনি করাতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাতে তনুদের বাসার অদূরে সেনানিবাসের ভেতরের একটি জঙ্গলে যার মরদেহ পায় স্বজনর।

পরদিন তার বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন বাদি হয়ে অজ্ঞাত ঘাতকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। থানাপুলিশ ও ডিবির পর ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর জামা-কাপড় থেকে নেয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। পরে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ ম্যাচিং করা হলেও রিপোর্ট আসেনি।

মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছেন সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহমেদ। গতকাল নুসরাত হত্যা মামলার রায় শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তনুর মা। কান্নারত তনুর মা  বলেন, ‘সরকারই যদি না চায় তাহলে বিচার হবে কেমনে। তবে আমার মৃত্যুর আগে তনু হত্যার বিচার পাবো এমন আশায় বুক বেঁধে আছি।’ মামলার তদন্তকারী সংস্থা কুমিল্লার সিআইডি যোগাযোগ করে না এবং তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তিনি টাকা খেয়ে নীরব থাকার অভিযোগ করেন। সবশেষে তিনি সরকারের দয়া ভিক্ষা চান এবং সাংবাদিকরাই একমাত্র তাদের পাশে আছে, অন্য কেউ নেই বলেও জানান তিনি।

অনিশ্চিত আরেক হত্যা মামলার তদন্ত। যা ঘটেছিল ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামের জিইসির মোড়ে। ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। ওই ঘটনার পর তার স্বামী বাবুল আক্তার বাদি হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। ওই ঘটনায় অস্ত্র আইনের মামলাটি বিচারাধীন থাকলেও মাহমুদা হত্যা মামলায় এখনো অভিযোগপত্র জমা দেয়নি গোয়েন্দা পুলিশ।

তথ্য মতে, ওই মামলায় কারাগারেও কেউ নেই। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছেন ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরুজ্জামান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, তদন্ত নিজস্ব গতিতে চলছে। এই মুহূর্তে কোনো অগ্রগতি নেই। এর বেশি কিছু বলা যাবে না।

এর আগে একই শহরে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের আরেকটি ঘটনা হারিয়ে গেছে প্রায় চার বছর হলো। যে ঘটনায় হত্যার শিকার হন শিক্ষিকা অঞ্জলী দেবী। ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার তেলিপট্টি এলাকার নিজ বাসার গলির মুখে অঞ্জলি দেবীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ওই ঘটনায় অজ্ঞাত যুবকদের আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন তার স্বামী ডা. রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করেন পাঁচলাইশ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুল মোতালেব। পরে মামলাটি তদন্ত শুরু করে নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

অঞ্জলী দেবীর স্বামী রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পুলিশ আসামিদের খুঁজে পায় না, শুধু বারবার আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আমি তাদের পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, যেভাবে হত্যাকাণ্ডটি হয়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে এটা সামপ্রদায়িক গোষ্ঠীর কাজ? পরিষ্কারভাবে পুলিশকে সেই কথাটি বলেছি, কিন্তু তারা কিছুই করেনি।

চলতি বছরের ৬ মে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে চলন্ত বাসে নার্স শাহিনুর আক্তার ওরফে তানিয়াকে (২৫) ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় বাসচালক নূরুজ্জামানসহ ৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও আদৌ শেষ হয়নি বিচারকাজ। কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. আল মামুনের আদালতে এ মামলার ৩১২ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে আদৌ।

আদৌ কুলকিনারা হয়নি নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যা মামলার। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে অপহরণ ও খুন করা হয়। ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর শাখা চারারগোপ এলাকার খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে আলোচনার রোল পড়ে যায়। অভিযোগের আঙুল উঠে নারায়ণগঞ্জের একটি অভিজাত পরিবারের দিকে। ক্ষমতাশালী হওয়ার কারণে তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

কিছুদিন আগে ত্বকীর মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, যেকোনো কারণেই হোক এই বিচার পিছিয়ে যাচ্ছে। আমরা এটি চাই না। সাত খুনের হত্যার যদি বিচার হতে পারে, তাহলে ত্বকী হত্যার বিচার নয় কেন? ত্বকীকে যারা হত্যা করেছে, সেই পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নারায়ণগঞ্জের অনেকের ছিলো না।

ত্বকী হত্যার প্রতিবাদে মঞ্চ করে আমরা প্রতিবাদ করতে পারছি। অনেকে ভেবেছিল, ত্বকীকে হত্যা করে নারায়ণগঞ্জ স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ তো স্তব্ধ হয়নি। বরং সারা বিশ্ব, বাংলাদেশ প্রতিবাদ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনো বাধাই বাধা নয়, কোনো কৌশলগত কারণে হয়তো তিনি বিচার করছেন না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি এর বিচার করবেন।’

এদিকে চলতি বছরের এপ্রিলে নরসিংদীতে শ্বশুরবাড়ির লোকদের দেয়া আগুনে দগ্ধ হওয়ার প্রায় ৪০ দিন পর না ফেরার দেশে চলে গেছেন গৃহবধূ জান্নাতি আক্তার (১৮)। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে যৌতুকের জন্য ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বশুরবাড়ির লোকদের দেয়া আগুনে দগ্ধ হন গৃহবধূ জান্নাতি। পরিবারের পক্ষে অগ্নিদগ্ধের ঘটনায় আদালতে একটি মামলা করা হলেও আদৌ জান্নাতির পরিবার পায়নি বিচার।

এদিকে ২০১৫ সালের ১১ মার্চ শরীয়তপুরের জাজিরা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী চাঁদনী আক্তার হেনাকে (১৩) অপহণের পর ধর্ষণ শেষে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তিনদিন পর বাড়ির অদূরে শুকনো খাল থেকে চাঁদনীর মরদেহ পাওয়া গেলে ১৩ মার্চ চাঁদনীর বাবা আলী আজগর খান প্রথমে জাজিরা থানায় অজ্ঞাত মামলা এবং পরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলার কয়েকদিন পর ওই এলাকা থেকে সন্দেহভাজন হেনার বান্ধবী পাখি আক্তারসহ ১২ জনকে আটক করা হয়।

২০১৮ সালে একটি দায়সারা অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। এতে এজহারভুক্ত প্রধান আসামী মিলন মাদবর সহ অনেকের নাম বাদ দেয়া হয়। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এ কাজ করা হয়েছে।চার্জশিট দেয়ার কিছুদিন পর ওই মামলার বাদি ও চাঁদনীর বাবা আলী আজগর খান মারা গেলে মামলায় স্থবিরতা নেমে আসে। হত্যাকাণ্ডের এত বছর পরও বিচারকাজে অগ্রগতি হয়নি। এমনি আটককৃত কেউ আর কারাগারে নেই। সবাই জামিনে বেরিয়ে এসেছে।

ফেনীর নুসরাত হত্যার বিচারের রায় শুনে শরীয়তপুরের জাজিরার মানুষের মনে চাঁদনী হত্যার বিচারের বিষয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে। ফেনীর নুসরাত হত্যার রায় বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নারী নির্যাতন দমন চাঁদনী মঞ্চের সদস্য সচিব মো. পলাশ খান বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের রায় একটি ঐতিহাসিক রায়।

এর মধ্যদিয়ে মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার ওপর আরো আস্থা ফিরে এসেছে। আমরা আশা করি, শরীয়তপুরের জাজিরায় ২০১৫ সালে সংগঠিত চাঁদনী আক্তার হেনা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ সুগম হবে। দ্রুত চাঁদনী হত্যার রায়ও আমারা পাবো। সেদিন চাঁদনী হত্যার চায় এত দ্রুত সময়ে দেয়া হলে অপরাধীরা সেখান থেকে শিক্ষা নিতো, তাহলে হয়তো নুসরাতকে প্রাণ হারাতে হতো না।

এ ছাড়া টাঙ্গাইলে চলতি বাসে রুপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে বাসের চালক এবং সহকারীসহ চারজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। এ মামলায় একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এরও আগে অরণখোলা পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক বাদি হয়ে একটি মামলা করেন। এ মামলায় অভিযোগ গঠন, সাক্ষী ও যুক্তিতর্কের জন্য মাত্র ১৪ দিন সময় নেয়া হয়।

কিন্তু গতকাল নুসরাত হত্যা মামলার রায় শোনার পর রুপার বড় ভাই হাফিজুর রহমান বলেন, ১৪ কার্যদিবসে নিম্ন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলেও হাইকোর্টে ঝুলে আছে আদৌ।’ শুনানিই হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন উচ্চ আদালতের কর্মপরিধি নিয়ে। ‘উচ্চ আদালত আসলে কী করে? এছাড়া নিম্ন আদালতের রায়েই এত আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ড. এলিনা খান বলেন, আমিও উদ্বিগ্ন। নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে কথাটি বলাই আছে— ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা শেষ করতে হবে। যেটা বাংলাদেশে কখনোই হয় না, যদি না স্পেশাল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সেখানে স্পেশাল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও দুঃখজনকভাবে উচ্চ আদালতে অসংখ্য মামলা ঝুলে আছে। আমি মনে করি, নারী শিশু নির্যাতনের এমন মামলাগুলো পরিচালনার জন্য একটি স্পেশাল কোর্ট হওয়া উচিত। যে কোর্টগুলোতে এ ধরনের মামলার সকল প্রক্রিয়া খুব দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করা হবে এবং মামলাগুলোর শুনানি দ্রুত শেষ করতে হবে। আমিও বলি, শুধু প্রাথমিক সন্তোষেই সন্তুষ্ট না, হাইকোর্টে মামলাগুলো যেন খুব কম সময়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবে নিষ্পত্তি হয়, সে ব্যবস্থা যাতে গ্রহণ করা হয়। সূত্র : আ.সংবাদ