(দিনাজপুর২৪.কম) দেশের বিভিন্ন কারাগারে কয়েদি নির্যাতন, অনিয়ম-দুর্নীতি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বন্দিদের খাবার, স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কারাগারে ভালো স্থানে থাকার ব্যবস্থা, টাকার বিনিময়ে সুস্থ হাজতি ও কয়েদিকে হাসপাতালে রাখা হচ্ছে। দুর্ধর্ষ আসামিরা কারাগারে বসেই অর্থের বিনিময়ে মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে খুনের নির্দেশনা। টাকার বিনিময়ে ব্যবসায়ী, সোনা চোরাচালানি ও মাদক ব্যবসায়ীরাও কারাগারে বিলাসী জীবনযাপন করছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে তিন দুর্ধর্ষ জঙ্গি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা কারাগারে বসেই নেওয়া হয়।

কারাগারে অনিয়ম-দুর্নীতি চিহ্নিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে কারা ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ২০টি সুপারিশ করা হয়।

গত বছরের এপ্রিলে ওই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এর মাসতিনেক পরে প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে ওই প্রতিবেদন নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটিতে আলোচনা হয়। তবে এখনও ওই তদন্ত কমিটির সুপারিশের অধিকাংশ এজেন্ডাই ফাইলবন্দি রয়েছে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, কমিটির দেওয়া সুপারিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নিয়ে কারাগারের ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। কারাগারের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়েছে।

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নেওয়া নানা ধরনের পদক্ষেপে কারাগারে বিদ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে। কারাগারে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারাগারগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে মন্ত্রণালয় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন দিনাজপুর২৪.কমকে বলেন, আমরা আন্তরিকভাবে কারাগারকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছি। জনবল সংকট এক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। দ্রুত অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ‘আমদানি’ সেল থেকে আসামি বিক্রি করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষকে টাকা দিয়ে আসামি কেনে দাগী আসামিরা। প্রতিদিন ১৫০-২০০ নতুন আসামি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢোকে। আসামি কেনা বাবদ জনপ্রতি ৫-২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এর পর নতুন আসামির দায়িত্ব ওই দাগী আসামিরা নিয়ে থাকে। আসামি ক্রয়চক্রের সদস্যরা হলো- জল্লাদ শাজাহান, কয়েদি খোরশেদ, হারুন, সোবহান, রফিক, শামসুল, আলমগীর ও হেলাল। কয়েদিরা কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনটি ভাগে থাকে।

মোটামুটি ভালো খাওয়া ও থাকার জন্য মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা ও মাঝারি মানের খাবারের জন্য আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হয়। বড়মাপের ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাচালানি ও মাদক ব্যবসায়ীরা বিলাসী জীবন যাপনের জন্য কারা হাসপাতালে থাকে। এজন্য জনপ্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা গুনতে হয়। তদন্ত কমিটি সুপারিশে উল্লেখ করে- শীর্ষ সন্ত্রাসী, দাগী অপরাধী থেকে শুরু করে বন্দিদের অবৈধভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার ঠেকাতে হলে কারাগারের ভেতরে মোবাইল ফোন বুথ স্থাপন করতে হবে।

দর্শনার্থীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ ঠেকাতে যৌথ নজরদারি ও বন্দিদের মানসম্মত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করতে নীতিমালা প্রণয়ন অবশ্যক। পাশাপাশি স্বল্প মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের উন্নত বিশ্বের মতো প্যারোলে কারাগারের বাইরে কাজ করার সুযোগ এবং প্রবেশ, প্যারোল সুবিধা দেওয়া, দুর্ধর্ষ প্রকৃতির আসামিদের আদালতে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে আদালত ও কারাগারের মধ্যে আইনসিদ্ধ ভিডিও লিংকেজ স্থাপন করতে হবে।

মধ্য মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর কারাগার মনিটরিং ব্যবস্থাপনা চালু করা; কারাগারের ভেতরে ও বাইরে পর্যাপ্ত সংখ্যক সিসি টিভি সংযোগের ব্যবস্থা রাখা। কারাগারে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেশে-বিদেশে আধুনিক কারাগার ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন, কারাগার শব্দটির পরিবর্তে ‘সংশোধনাগার’ শব্দটি প্রয়োগ করে জনসাধারণের মধ্যে কারাগার সম্পর্কিত নেতিবাচক মনোভাবের পরিবর্তন এবং কারা কর্তৃপক্ষের ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ, কারাগারে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান কঠোরভাবে প্রতিপালন এবং বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত, কারাগারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনরত প্রহরীদের মধ্যে দ্রুত পারস্পরিক যোগাযোগের সুবিধার্থে ওয়াকিটকি সেটসহ অন্য আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ সম্পর্কে বলা হয়েছে- অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচার প্রক্রিয়ার শুরুতে দোষ স্বীকার করলে আইনগতভাবে কী কী সুবিধা পাবে তার দিকনির্দেশনা থাকলে অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ হবে। এতে একদিকে মামলার জট কমবে, অন্যদিকে কারাবন্দি আসামির সংখ্যাও কমবে।

তাই ‘আরলি গিল্টি’ এর আইনগত বিধান প্রণয়ন ছাড়াও স্বেচ্ছায় ও নির্ভয়ে দোষ স্বীকারের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত দাগী আসামি ও বিচারাধীন আসামিদের পৃথকভাবে রাখার ব্যবস্থা, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দিদের লোকালয় থেকে দূরে প্রত্যন্ত কারাগারে পৃথকভাবে রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় আনার কথা বলা হয়। কারাগারগুলোয় মানসম্মত খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কোনো অপরাধীচক্র যেন এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হতে না পারে সেজন্য একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি অনেক কমবে বলে মনে করে কমিটি। স্বাধীনতার পর ৪টি কেন্দ্রীয় কারাগার, ১৩টি জেলা কারাগার ও ৪৩টি উপ-কারাগার নিয়ে বাংলাদেশ জেলের (বিডিজে) যাত্রা শুরু হয়।

কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়ায় ১৯৯৭ সালে দেশের উপ-কারাগারগুলোকে জেলা কারাগারে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে দেশে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৫৫টি জেলা কারাগার রয়েছে। তবে কারাগারের সংখ্যা বাড়লেও বন্দিদের আত্মসংশোধনের সুফল আসছে না। বরং অপরাধমূলক কর্মকান্ড বন্দিদের উস্কে দিচ্ছেন কারাগারের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী। এমন চিত্র দেশের ৩০টি কারাগারে সংঘটিত হয়েছে। এসব কারাগারের একাধিক কর্মকর্তা ও কারারক্ষী একই কর্মস্থলে ৩ থেকে ১৫ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সরকার পরিবর্তন হলেও অদৃশ্য ইশারায় তাদের অন্য কোথাও বদলি হতে হয় না।

অথচ এদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, কারাভ্যন্তরে থাকা সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের সহায়তা, কারাগারের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, কারাগারের তথ্য পাচার, কারাগারে বসে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের খুনের পরিকল্পনায় সহায়তা ও আসামিদের মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত সচিবের (আইন ও পরিকল্পনা) নেতৃত্বাধীন কমিটির ২০ দফা স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশে আরও বলা হয়েছে- কারাবন্দিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করা।

সাজাপ্রাপ্ত কিংবা বিচারাধীন দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের সঙ্গে যারা সাক্ষাৎপ্রার্থী তাদের ভোটার আইডি কার্ডের সত্যায়িত ফটোকপি, ছবিসহ মোবাইল ফোন নম্বর, জীবন বৃত্তান্ত সংগ্রহ করে সাক্ষাতের অনুমতি দিতে হবে। এটি শুধু বন্দিদের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এছাড়াও হাজতি-কয়েদিদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে কারাগারের ভেতরে বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা এবং পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ, আদালতে আসামিদের আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে যুতসই পরিবহনের ব্যবস্থা, ভয়ঙ্কর দাগী আসামিদের হাতকড়া বা ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।(ডেস্ক)