(দিনাজপুর২৪.কম) সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চোর অপবাদে শিশু সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত সৌদি আরবে  আটক কামরুল ইসলামকে  দ্রুত ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তিনি বলেন, তাকে ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।  আইনী প্রক্রিয়া শেষে তাকে ফিরিয়ে এনে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
 আজ মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজ কার্যালয়ের সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
 এ সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, রাজন গরিব পরিবারের সন্তান। তার পরিবারকে সহায়তা জন্য প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলব।
 এ ধরনের ঘটনার কারণ হিসেবে সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি  এই ধরণের ঘটনার প্রতিবাদ করতে সবাই এগিয়ে আসতে আহ্বান করেন।
 এর আগে সোমবার জেদ্দায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা কামরুল ইসলামকে আটক করে পুলিশে দেয়। এ ঘটনায় মুহিত আলম ও তার স্ত্রী লিপি বেগমসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
 গত বুধবার কুমারগাঁও বাসস্টেশন সংলগ্ন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের মাইক্রোবাস চালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে ১৩ বছরের শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনকে চুরির অপবাদ দিয়ে বর্বর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়।
 হত্যার পর তার মরদেহ মাইক্রোবাসে করে কুমারগাঁও গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি খালি মাঠে মরদেহটি রাখার সময় স্থানীয় লোকজনের কাছে বিষয়টি ধরা পড়ে। তারা মরদেহ রাখতে যাওয়া কয়েকজনকে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে জনতা মুহিত আলম নামে একজনকে আটক করলেও পালিয়ে যায় অন্যরা।
 পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে ঘটনার বর্ণনা দেয় মুহিত। ঘটনার একদিন পর লাশ দেখে পরিবারের লোকজন শনাক্ত করেন রাজনকে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। মামলায় রাজনের লাশ ফেলার সময় হাতেনাতে আটক মুহিত ও তার ভাই কামরুল ইসলাম (সৌদি প্রবাসী) তাদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়নাকে আসামি করা হয়। এ ঘটনার পর দ্রুত দেশ ছেড়ে সৌদি আরব চলে যান অভিযুক্ত কামরুল ইসলাম।
 রাজন হত্যার পর গত শনিবার রাতে ফেসবুকে একটি ভিডিও ফুটেজের সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে প্রকৃত ঘটনা। ২৮ মিনিটের ভিডিও ফুটেজে ফুটে উঠেছে শিশু রাজনকে বর্বর নির্যাতনের চিত্র। ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, চোর সন্দেহে রাজনকে কুমারগাঁও বাসস্টেশনের একটি দোকানঘরের বারান্দার খুঁটিতে বেঁধে রাখা। এতে তিন-চারজনের কণ্ঠস্বর শোনা গেলেও ভিডিওতে দুজনের চেহারা দেখা যায়।
 ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, রাজনকে চোর অপবাদ দিয়ে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করতে। প্রায় ১৭ মিনিট রাজনকে অনেকটা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রোল দিয়ে পেটানো হয় এবং নানা প্রশ্ন করা হয়। একপর্যায়ে মাটিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে পানি খাওয়ার আকুতি জানায় রাজন। কিন্তু পানির বদলে ‘ঘাম খা’ বলে মাটিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।
 কয়েক মিনিটের জন্য রাজনকে হাতের বাঁধন খুলে রশি লাগিয়ে হাঁটতে দেওয়া হয়। ‘হাড়গোড় তো দেখি সব ঠিক আছে’ এই বলে রাজনের বাঁ হাত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে কয়েক দফা পেটানো হয়।
 ভিডিওচিত্র ধারণ করার সময় যে সময় উল্লেখ রয়েছে তাতে দেখা গেছে সকাল ৭টা। একদিকে রাজনের মুখে আর্তচিৎকার, অন্যদিকে নির্যাতনকারীদের মুখে অট্টহাসি ও নানা কটূক্তি। ভিডিও চিত্রে রাজনের নখে, মাথা ও পেটে রোল দিয়ে আঘাত করে এক সময় বাঁ হাত ও ডান পা ধরে মোচড়াতেও দেখা যায়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে শিশু রাজন।
 বেওয়ারিশ হিসাবে একদিন রাজনের মরদেহ রাখা হয় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। সেখানে রাজনের পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।
 এ ব্যাপারে জালালাবাদ থানার ওসি আক্তার হোসেন বলেন, নির্যাতন ভিডিওচিত্রে ধারণ করার বিষয়টি দেখেছি। যারা দেখেছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথাও হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে মামলার আসামি চারজনই সম্পৃক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর দুজন থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
 এদিকে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনের খুনিদের ফাঁসির দাবিতে মানবন্ধন করেছে এলাকাবাসী। রোববার দুপুরে রাজনের বাসার সামনে এলাকাবাসী মানবন্ধন করে। এতে শতাধিক নারী পুরুষ ও শিশু অংশ নিয়ে রাজনের খুনিদের ফাঁসি দাবি জানায়। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া প্রতিবাদী নারী পুরুষদের কণ্ঠে ছিল ঘাতকদের প্রতি ঘৃণা ও নিহত রাজনের প্রতি সমবেদনা।(ডেস্ক)