-সংগ্রহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) কাঁদছে নারায়ণগঞ্জ! সহমর্মিতা জানাচ্ছে পুরো দেশ। সারি সারি লাশের খাট এখন ফতুল্লার পশ্চিম তল্লায়। টানানো হয়েছে সামিয়ানা। আসছে সিজদায়, মুনাজাতে, রুকু অবস্থায় থাকা মুসল্লিদের লাশ! চলছে আহাজারি। ‘হে আল্লাহ! তুমি যে কয়জনকে নিছ আর নিও না। তুমি এত পাষাণ হইয়ো না।

যারা এখনো জীবিত আছে,  তাদের তুমি রহমতের চাঁদরে আবৃত্ত রাখো। সুস্থ করে দাও। মায়ের ডাক, সন্তানের ডাক, স্ত্রীর ডাক তুমি শোন। তুমি ছাড়া আর কারো কাছে চাওয়ার। তুমি রহম করো। আমরা যে তোমাকে ডাকতে গিয়েছিলাম।’

গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদের পাশের খোলা মাঠে এবাবেই বিলাপ করে কান্না করছিলেন নিহত পরিবারের কয়েকজন স্বজনরা।

সেদিন রাতে অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক চলছিল ফতুল্লার তল্লা এলাকাটি।  গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতের এক দুর্ঘটনা কাঁদিয়ে তুলে সকলকে। মসজিদের ভেতরে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত অর্ধশত মুসল্লি দগ্ধের ঘটনায় এখন পুরো তল্লার লোকজনের চোখে পানি।

বিভিন্ন এলাকা থেকেও সহমর্মিতা জানাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কেউ মেনে নিতে পারছে না এ দুর্ঘটনা। মসজিদের ভেতরের এ দুর্ঘটনার পেছনে যাদের গাফিলতি রয়েছে তাদের কঠোর শাস্তি দাবি উঠেছে এলাকাবাসীসহ
সারা দেশের। শুক্রবার রাত পৌনে ৯টায় দুর্ঘটনার পর সকলে মসজিদের এয়ার কন্ডিশনার বিস্ফোরণে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি হান্নান মিয়া নিজেও এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। তিনি কয়েকদিন আগেও তিতাস গ্যাসকে এ লাইন সংস্কারের কথা বলেছিলেন।

কিন্তু তিতাস তখন ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না দেয়ার কারণে লাইন মেরামত বা সংস্কার করেনি। ফলে লিকেজ হয়ে অন্য দিনের মতোই গ্যাস জমে যায় মসজিদে। আর গরমের কারণে এসি চালানোর ফলে বাতাস বের হতে না পারায় গ্যাস জমে যায়। আর সেই থেকেই মূলত দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বিস্ফোরণের ঘটনায় মসজিদের মুয়াজ্জিন, স্কুলছাত্রসহ মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। গতকাল শনিবার দুপুরে শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়।

ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মৃতরা হলো জয়নাল আবেদিন (৪০), মাইনুদ্দিন (১২), নয়ন (২৭), কাঞ্চন হাওলাদার (৫০), মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৮), রিফাত (১৮), মোস্তফা কামাল (৩৪), জুনায়েদ (১৮), সাব্বির (২১), কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), হুমায়ুন কবির (৭০), ইব্রাহিম (৪৩), জুনায়েদ (১৭), জামাল (৪০), জুবায়ের (৭) ও রাসেল (৩৪)। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি অপর ২১ জনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক, পুড়ে গেছে শ্বাসনালী।

নিহতদের মধ্যে সাব্বির সরকারি তোলারাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র জুবায়ের ও তার ভাই সাব্বির নারায়ণগঞ্জ কলেজের ছাত্র। নুর উদ্দিন বলেন, বড় ছেলে মো. সাব্বির নারায়ণঞ্জের একটি কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষে লেখাপড়া করতেন। আর তার ছোট ছেলে নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। দুর্ঘটনার সময় বড় দুই ভাইয়ের সঙ্গে তার ছোট ছেলে ইয়াসিনও (১২) ছিলো।

তারা তিনজনই এক সঙ্গে নামাজ পড়তে ওই মসজিদে গিয়েছিলেন। তবে ইয়াসিন পেছনের সারিতে দাঁড়ানোর কারণে বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় সে সুস্থ আছে।

কান্না করতে করতে নুর উদ্দিন বলেন, ‘ছোট ছেলে যুবায়েরের মৃত্যুর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে আমাদের এখনো কেউ কিছু বলেনি। আমরাও জানার চেষ্টা করছি। তবে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে পারি না।

শিশু জুবায়ের মা গার্মেন্টকর্মী রাহিমা বেগম বলেন, জুবায়ের বাবা জুলহাস ও আমি ফতুল্লার কায়েমপুরে পৃথক দুটি গার্মেন্টে কাজ করি। এক বছর বয়সে জুবায়েরকে গ্রামের বাড়ি বরিশালের গন্ডাদুলা গ্রামে তার দাদির কাছে রেখে ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকায় ভাড়া বাসায় উঠি।

এরপর স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজে যোগ দেই। গ্রাম থেকে আমার শাশুড়ি ফোন করে জানায়, জুবায়ের স্কুলে যেতে চায়, পড়তে চায়। এরপর জুবায়ের বাবাকে বললাম ছেলে তো বড় হয়েছে। স্কুলে পড়ার বয়স হইছে। জুবায়েররে লইয়া আও। কুরবানির ঈদের পর জুবায়েরকে নিয়ে আসি আমাদের কাছে।

এরপর বাড়ির কাছে সবুজবাগ মডেল কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তিও করেছি। স্কুল থেকে মাস্টাররা বললো করোনা গেলে স্কুলে দিয়ে যাবেন। এখন তো জুবায়ের আর কোনোদিন স্কুলে যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘জুবায়ের তার বাবার সঙ্গে প্রতি ওয়াক্তে নামাজ পড়তে যেতো। শুক্রবারও গিয়েছিল। তার বাবার অবস্থাও ভালো না। আমি এখন কী করমু।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক বিস্ফোরণের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন এবং দগ্ধদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন।’ বিস্ফোরণের ঘটনায় পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, তিতাস গ্যাস ও নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন আলাদাভাবে এসবক কমিটি গঠন করে। ওই ঘটনার পরদিন শনিবার সকালে এসব কমিটি গঠন করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিম জানান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খাদিজা তাহেরী ববিকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নিহতের লাশ দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে বলে কোম্পানির নারায়ণগঞ্জ অফিসের ডিজিএম মফিজুল ইসলাম জানিয়েছেন।

কমিটির প্রধান করা হয়েছে তিতাস গ্যাসের ঢাকা অফিসের মহাব্যবস্থাপক আবদুল ওহাবকে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটিকে ১০ কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্মন, উপ-পরিচালক (অপারেশন্স) নুর হাসান ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আরেফিন।

বিস্ফোরণের ঘটনায় গভীর তদন্ত চেয়েছেন স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান। তিনি বলেছেন, ‘এটা দুর্ঘটনা বা নাশকতা আমি কোনটিই বলবো না। কিন্তু আমি নাশকতার বিষয়টিকেও ফেলে দিচ্ছি না।

আমার আশঙ্কা করছি এটা।’ শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর রাতে বিস্ফোরণের পরদিন গতকাল শনিবার দুপুর দেড়টায় শামীম ওসমান মসজিদ পরিদর্শন আসেন। তিনি মসজিদের ভেতরে ঘুরে দেখেন।

পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনাটিকে তুচ্ছভাবে দেখার সুযোগ নাই। এটা ছোট কোনো জিনিস না। শুধু গ্যাসের কারণেই এত বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে এটাকেই প্রাধান্য দিয়েই শেষ করা যাবে না।

কারণ এর আগেও আমাদের উপরেও ১৬ জুন বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। সে কারণেই আমি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানাচ্ছি।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার পৌনে ৯টায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই মসজিদের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময়ে মসজিদে থাকা মুসল্লিদের গায়ে আগুনের ফুলকি গিয়ে পড়লে একে একে দগ্ধ হতে থাকে। মসজিদের ভেতর থেকে আসতে থাকে মুসল্লিদের আত্মচিৎকার।

পরে আশেপাশের লোকজন দিয়ে তাদের উদ্ধার করে। তাদের অনেকের শরীরের কাপড় ছিলো না। দুর্ঘটনার পর সেখানে দেখা গেছে, মসজিদের ভেতরের কয়েকটি স্থানেই প্রচুর পানি জমে ছিলো। এসব পানিতে রক্ত ছিলো। লাল হয়ে ছিলো পানি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন মসজিদ থেকে একে একে মুসল্লিরা খালি গায়ে দগ্ধ হয়ে বের হতে থাকে। ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার করে একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে। তাদের চিৎকারে সেখানে হূদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একে একে মুসল্লিদের রিকশায় করে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়।

বাইতুস সালাত জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি গফুর মিয়া জানান, রাত পৌনে ৯টায় এশার নামাজ শেষ হওয়ার পরেই সুন্নত ও মোনাজাতের সময়ে বিকট শব্দ ঘটে। মসজিদের ভেতরের জানালাগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে ভিতরে বাহিরে ধোঁয়ায় ডেকে যায়।

তখন আমি বাইরে ছিলাম আর আমাদের মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি হান্নান মিয়া মসজিদের ভেতর নামাজে ছিলো। তখন দ্রুত আমিসহ এলাকাবাসী এগিয়ে এসে প্রায় ৪০ জনকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে শহরের ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠাই। সেখান থেকে অনেককেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে পাঠিয়েছেন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক। -ডেস্ক