(দিনাজপুর২৪.কম) খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে গ্রিক দার্শনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক থিওফ্রাসটাস লিখেছেন, ‘আরেকটি বৃক্ষ রয়েছে, যা অত্যন্ত বড় এবং যার ফল অসাধারণ মিষ্টি।’ বিশেষজ্ঞদের ধারণা সম্ভবত কাঁঠালের কথাই লিখেছিলেন থিওফ্রাসটাস। ফলটির উত্স ভারতবর্ষ। বাংলাদেশে এটি পরিচিত কাঁঠাল নামে। থাইল্যান্ডে বলা হয় কানুন। আর মালয়েশিয়ায় এটি নাংকা, চীনে পো লো মি, ভারতে কানঠাল, কাঁঠাল, পেনাসা এবং ভিয়েতনামে এটি মিট নামেপরিচিত। কাঁঠাল নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতে ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার বছর আগে কাঁঠালের আবাদ হতো। বৃক্ষে জন্মানো ফলের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়। জ্যৈষ্ঠ- আষাঢ়ের ফল কাঁঠাল।বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও জাতীয় ফল। আকারে বড়, সহজ প্রাপ্য, দামে সস্তা, একটি ফল পরিবারের সবাই মিলে খাওয়া যায়, পুষ্টিগুণ বেশি – এসব কারণেই জাতীয় ফলের খেতাব পায় কাঁঠাল। এখন আম-কাঁঠালের মৌ মৌ গন্ধ। আমের গন্ধ থেকে সহজেই পৃথক করা যায় কাঁঠালকে। বাঙালির সঙ্গে কাঁঠালের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য । বাংলা ভাষায় ‘কাঁঠালের আঠা’, ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’ ইত্যাকার নানা প্রবাদবাক্য আমরা হরহামেশাই ব্যবহার করে থাকি।উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরিভাষায়, সরোসিস নামের এ অতি বড় ফল বস্তুত স্ত্রীপুষ্পধর গোটা ক্যাটকিন মঞ্জুরির পরিবর্তিত রূপ, তাতে থাকে ১০০-৫০০ বড় বড় তৈলাক্ত বীজ। শাঁসাল যে অংশ খাওয়া যায় তা পুষ্পপুট। কাঁঠালের আদি নিবাস ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, যেখানে আজও বুনো কাঁঠাল ফলে। কাঁঠাল আসাম ও বার্মার চিরসবুজ বনেও ফলে। উষ্ণমন্ডল ও উপ-উষ্ণমন্ডলের বিস্তৃত নিম্নভূমিতে এখন কাঁঠাল ছড়িয়ে পড়েছে।

সারা বাংলাদেশে কম বেশি জন্মালেও নওগাঁ, দিনাজপুর, সাভার, ভালুকা, মধুপুর ও সিলেট কাঁঠাল প্রধান এলাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এদেশে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন কাঁঠাল ফলে। তবে এর কদর এখন কমে এসেছে। এ কারণে উত্পাদনও কম হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত তিনটি উন্নত কাঁঠালের জাত উদ্ভাবন করেছেন। সর্বশেষ গতবছরের সেপ্টেম্বরে একটি জাত অবমুক্ত করা হয়।

 কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার সাভার, গাজীপুরের শ্রীপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা, দিনাজপুর, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, টাঙ্গাইল, যশোর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট ও পাবনা জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঁঠাল উত্পন্ন হয়। এছাড়া দেশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কাঁঠাল গাছ রয়েছে।
 ভারতে ৭০ থেকে ৮০ পাউন্ডের ওজনের কাঁঠাল পাওয়া যায়। বাংলাদেশেও একমণের বেশি ওজন, এমন কাঁঠাল মিলছে। টাঙ্গাইলের মো. খালেদ নামে এক ব্যক্তি জানান, তার বাড়িতে একমণ ওজনের কাঁঠাল গাছে ধরেছিল। কয়েক ব্যক্তি মিলে এটি কিনে নিয়ে যান।
 সাভার অঞ্চলের রাজাসন, আশুলিয়া, সাদাপুর, কলমা এলাকায় কাঁঠালের ফলন বেশি হয়। কিন্তু বর্তমানে এ অঞ্চলে কাঁঠাল গাছ কমে যাচ্ছে। কমছে কাঁঠাল উত্পাদনও। বলাবাহুল্য এর কারণ হলো শিল্পায়ন ও নগরায়ন। শিল্প-কারখানা, বাড়িঘর তৈরিতে  জমির ব্যবহার বাড়ছে। কমছে কৃষি ও বাগানের জমি। হবিগঞ্জে ফলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার মুছাই। এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি আড়ত। এই আড়তে বিক্রির জন্য কৃষকরা তাদের কাঁঠাল নিয়ে আসেন। প্রতি ১শ’ হিসাবে নিলামের মাধ্যমে এই কাঁঠাল বিক্রি হয়। পাইকাররা নিজেদের মাঝে প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন কাঁঠাল কিনতে। ছোট সাইজের কাঁঠাল প্রতিশ’ বিক্রি হচ্ছে ১৪শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা করে। তবে বড় কাঁঠালের দাম বেশি। মুছাই থেকে ট্রাকভর্তি হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যায় এই কাঁঠাল। বিদেশেও রফতানি হয় হবিগঞ্জের কাঁঠাল।
 জাত : বাংলাদেশ ও ভারতে চাষকৃত কাঁঠালের জাত হলো গালা ও খাজা। গালা ও খাজা কাঁঠালের মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ‘রসখাজা’ নামে আরেকটি জাত আছে। এছাড়া আছে রুদ্রাক্ষি, সিঙ্গাপুর, সিলোন, বারোমাসি, গোলাপগন্ধা, চম্পাগন্ধা, পদ্মরাজ, হাজারি প্রভৃতি জাতের কাঁঠাল। এর মধ্যে হাজারি কাঁঠাল বাংলাদেশে আছে, বাকিগুলো পাওয়া যায় ভারতে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো বারি কাঁঠাল – ১, ২ ও ৩।
 রামগড়ের পাহাড়াঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ প্রায় তিন বছর সফল গবেষণার পর বারি কাঁঠাল-৩ নামের বারোমাসি কাঁঠালের নতুন জাত উদ্ভাবন করেন। প্রত্যন্ত এলাকায় সারাবছর ফল দেয়া একটি কাঁঠাল গাছের সন্ধান পাওয়ার পর রামগড় পাহাড়াঞ্চলে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ২০১১ সাল থেকে এ গাছটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তারা তিনবছর গাছটির সার্বিক তত্ত্বাবধান, পরিচর্যা ও জার্মপ্লাজম নির্বাচন করে একটি নতুন জাত উদ্ভাবনে সফল হন। তবে আকার, ওজন, রং, স্বাদ ও বৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করে টাঙ্গাইল, ভালুকাসহ  দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁঠালের স্থানীয় নাম রয়েছে। লাউয়ের মতো দেখতে কাঁঠালকে লাউ কাঁঠাল, মধু রঙের কাঁঠালকে মধুরসা কাঁঠাল, খাওয়ার অংশ শক্ত এমন কাঁঠালকে চাইলা কাঁঠাল, দুধের মতো স্বাদ ও রঙ এমন কাঁঠালকে দুধরসা কাঁঠাল বলা হয়ে থাকে। এছাড়া কাঁঠালের স্থানীয় নামের মধ্যে রয়েছে – বেল কাঁঠাল, শসা কাঁঠাল, হাজারী কাঁঠাল, কুমুর কাঁঠাল, টেমা কাঁঠাল, ঢেওয়া কাঁঠাল, গুতমা কাঁঠাল, টেপা কাঁঠাল, সারিন্দ কাঁঠাল, গালা কাঁঠাল, পানিরসা কাঁঠাল, দুধরসা কাঁঠাল, মধুরসা কাঁঠাল, চিনিরসা কাঁঠাল, তরমুজ কাঁঠাল, কুমুর কাঁঠাল, রসগোল্লা কাঁঠাল, দুইসিজন কাঁঠাল, বিন্দি কাঁঠাল, বাইল্যা কাঁঠাল, পাতা কাঁঠাল, বল কাঁঠাল, খাজা কাঁঠাল প্রভৃতি।
 কাঁঠালের যত গুণ : পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, কাঁঠাল শুধু খেতে ভাল তা নয়, এর রয়েছে নানা গুণ, ক্ষমতা। রোগব্যাধি উপশমে কার্যকর। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয় অনেক গুণ। কোলস্টেরলমুক্ত এ ফলে নেই কোনো ক্ষতিকারক চর্বি। প্রচুর ক্যালরি পাওয়া যায়। রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘সি’। কাঁঠাল কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থায় খাওয়া যায়। বসন্তকাল থেকে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। কাঁঠাল পাকলে কোষ খাওয়া হয়। এ কোষ নিংড়ে রস বের করে খাওয়া হয়। থাইল্যান্ডে কাঁঠালের চিপস তৈরি করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে কাঁঠাল জনপ্রিয় করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শুকিয়ে সংরক্ষণের পাশাপাশি স্যুপ, চিপস, রস (জুস), আইসক্রিম ইত্যাদি খাবার তৈরিতেও কাঁঠাল ব্যবহার করা হচ্ছে। তারপর বিভিন্ন উপাদেয় খাবার কেক, পেস্ট্রি, দুধ ইত্যাদির সঙ্গে লিকুইড কাঁঠাল কোষ পরিবেশন করা হয়।
 বৃষ্টির পানি জমে থাকে না বা বন্যার পানি ওঠে না এমন উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি কাঁঠাল চাষের জন্য উপযোগী। পানি যদি দীর্ঘদিন শিকড়কে ডুবিয়ে রাখে, কিংবা বন্যার পানি আটকা পড়ে তাহলে কাঁঠাল গাছের ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি মারাও যেতে পারে।
 উন্নততর জাতের অভাব, প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ না থাকা, দুর্বল বিপণন ব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে কাঁঠালের উত্পাদন কমে যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক কৃষিবিদ সুনীল চন্দ্র ধর বলেন, সরকারিভাবে কাঁঠালের ফলন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।(ডেস্ক)