(দিনাজপুর২৪.কম) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের জন্য রক্তরস সংগ্রহ শুরু করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। এরই অংশ হিসেবে কোভিড-১৯ থেকে সেরা ওঠা দুই চিকিৎসক তাদের প্লাজমা দিয়েছেন।

আজ শনিবার ঢামেকের হাসপাতালের রক্তপরিসঞ্চালন বিভাগে নিজেদের প্লাজমা দেন ওই দুই চিকিৎসক। তাদের মধ্যে একজন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিকিৎসক (কিডনি রোগ বিভাগের মেডিকেল কর্মকর্তা) দিলদার হোসেন, অন্যজন মিটফোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসক (অ্যানেসথেসিওলজিস্ট) রওনক জামিল।

বাংলাদেশে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলোজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এ খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘আমাদের ডাকে প্রথম সাড়া দিলেন কোভিড–১৯ থেকে সেরে ওঠা দুই চিকিৎসক দিলদার হোসেন ও রওনক জামিল। তাদের দুজনের রক্তরস সংগ্রহ করা হয়েছে। আজ তিনজন এসেছিলেন প্লাজমা দিতে। তবে একজনেরটা নেওয়া সম্ভব হয়নি।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিকিৎসক দিলদার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন গত ২৫ এপ্রিল। গত ৯ মে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘রক্ত দান করার চেয়ে প্লাজমা দান অনেক সহজ। এখানে একটা অংশ নেওয়া হয়। তাই কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে উন্নত বিশ্বে ট্রায়াল হয়েছে। বাংলাদেশে আমিও প্লাজমা থেরাপির অংশ হতে চাই। এ কারণেই প্লাজমা দিলাম। আমি আগেও নিয়মিত রক্ত দিতাম। আমার কারণে একজন মানুষেরও যদি উপকার হয় সেটাই হবে বড় পাওয়া।’ আজ প্লাজমা দিয়ে নিজের কর্মস্থল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কাজে যোগ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

মিটফোর্ড হাসপাতালের অ্যানেসথেসিওলজিস্ট রওনক জামিল ৫ মে করোনা থেকে সেরে ওঠেন। আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তিনি বাড়ি থেকেই চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে ভয়ের কোনো কারণ নেই। এখন যারা সেরে উঠেছেন, তাদের প্লাজমা দান করাটা দরকার। এই প্লাজমা মরণাপন্ন রোগীদের দিলে তারা সেরে উঠবেন। সাধারণ মানুষেকে এ ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে হবে। চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যই মানুষের জীবন বাঁচানো। রক্ত দান করলে যেমন ভালো লাগে আজ তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লাগছে। আজকের দিনটি আমার জন্য স্পেশাল।’

অধ্যাপক ডা. এম এ খান বলেন, ‘সবকিছু ঠিক থাকলে সংগ্রহ করা এই প্লাজমা আগামী সপ্তাহে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের শরীরের প্রয়োগ করা যাবে। একজনের শরীর থেকে ৬০০ মিলিলিটার প্লাজমা নেওয়া যাবে। এ থেকে ২০০ মিলিলিটার করে তিনজনকে দেওয়া সম্ভব।’

ঢামেকের এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘অনেক সময় এমন হয় যে, একজনকে দুবার দেওয়া লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে কম রোগীকে দেওয়া যাবে। কোভিড–১৯ এ মারাত্মকভাবে আক্রান্ত রোগীকেই প্লাজমাথেরাপি দেওয়া হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকেই মূলত রোগীদের নেওয়া হবে। আগ্রহ প্রকাশ করায় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের রোগীদেরও নেওয়া হতে পারে।’

এ সপ্তাহে তারা আরও প্লাজমা সংগ্রহ করবেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সংগ্রহ করা প্লাজমায় অ্যান্টিবডি পরিমাপ করা হবে। এ চিকিৎসা প্রয়োগের অনুমোদনের প্রক্রিয়াও এই সময়ের মধ্যে শেষ করা হবে।’

যারা প্লাজমা থেরাপি দেবেন তাদের প্রশিক্ষণ, তথ্যসংগ্রহ, প্লাজমা দেওয়ার আগে কিছু পরীক্ষাও করতে হয় বলেও জানান ঢামেকের হেমাটোলোজি বিভাগের এই শিক্ষক। পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে স্পেন থেকে চলে এসেছে বলেও তথ্য দেন তিনি।

অধ্যাপক ডা. এম এ খান আরও জানান, টেস্ট করতে করা পরীক্ষাগুলো বেশ ব্যয়বহুল। তাই অনেকগুলো স্যাম্পল একসঙ্গে সংগ্রহ করার পর এই টেস্ট করা হবে। তা ছাড়া কিটগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যেহেতু পরীক্ষা করতে হবে, সেজন্য তারা সব ধরনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

প্লাজমা সংগ্রহের পর প্রয়োগের খরচ সম্পর্কেও জানান বাংলাদেশে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান। তিনি বলেন, ‘একজনের কাছ থেকে প্লাজমা সংগ্রহ করতে খরচ হয় ১২ হাজার টাকা। এখন তাদের সামনে দুটো চ্যালেঞ্জ- একটি দাতা সংগ্রহ করা, অন্যটি অর্থের ব্যবস্থা করা।’ তা ছাড়া পরীক্ষার সময়ও বাড়তি কিছু টাকা খরচ হয় বলে জানান তিনি।

ডা. খান আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা যখন এটার পরিসর বাড়াব, তখন পরীক্ষার জন্য আরও কিট লাগবে। সেজন্য ফান্ড দরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। যেহেতু সরকারি ব্যাপার, তাই কিছুটা সময় দরকার।’

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এ ভাইরাস মোকাবেলা করে টিকে থাকতে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসকে আক্রমণ করে। আক্রান্ত ব্যক্তির প্লাজমায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ওই অ্যান্টিবডিই অসুস্থদের সারিয়ে তোলার জন্য ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশেও বিষয়টির সম্ভাব্যতা দেখতে এপ্রিলের শুরুতে আগ্রহের কথা জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজির অধ্যাপক ডা. এম এ খান। ১৯ এপ্রিল অধ্যাপক ডা. এম এ খানকে সভাপতি করে ৪ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

কমিটিরি অন্যান্য সদস্যরা হলেন—ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মাজহারুল হক তপন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। -ডেস্ক