(দিনাজপুর২৪.কম) করোনাভাইরাস। বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হওয়া ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে পুরো বিশ্ব। মহামারী ভাইরাসটির কারণে স্থবির হয়ে গেছে পুরো বিশ্ব।

বন্ধ রয়েছে সকল সরকারি ও বেসরকারি অফিসও। বাংলাদেশেও তার ব্যার্তয় ঘটেনি। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে দেশের বিচার বিভাগের ওপরও। বন্ধ রয়েছে আদালত অঙ্গনও।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কবে সেটাও বুঝে উঠা সময় সাপেক্ষ। ফলে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছে বিচারপ্রার্থী সাধারণ জনগণ। এমন উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বাড়ছে মামলা জট। থেমে নেই অপরাধ।

ফলে মামলার সংখ্যাও দ্রুত গতিতে বাড়ছে। তাই জাতির এই ক্রান্তিকালে অনলাইনে আদালত পরিচালনার পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সোচ্চার হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের অনেক আইনজীবী। ভার্চুয়াল আদালত নিয়ে চলছে আলোচনা তুলে ধরছেন সবার ব্যাক্তিগত মতামত।

তাদের দাবি, ছোট পরিসরে হলেও অনলাইনে আদালতের কার্যক্রম চালু করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কেননা ভায়োলেশন, ক্রাইমতো থেমে নেই। তাই আদালতের কার্যক্রম থেমে থাকতে পারে না। আদালত বন্ধ থাকায় নাগরিকরা সংবিধানে প্রদত্ত আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটা সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেন এসব আইনজীবীরা।

এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রামণ বাড়তে থাকায় ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনায়ও বিরোধীতা করেছেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবীদের আরেকটি পক্ষ। তাদের অভিমত, গুটি কয়েক এলিট আইনজীবী ও এলিট বিচারপ্রার্থীর জন্য হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট নয়। এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতিকে সর্বস্তরের আইনজীবীদের সুরক্ষা ও পেশার কল্যাণের জন্য সব ধরনের কোর্ট বন্ধ রাখতে প্রধান বিচারপতিকে ভুমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে মহামারি করোনাভাইরাসের এসময়ে বিচারপ্রার্থীদের অধিকার রক্ষায় অনলাইনের মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায় সীমিত আকারে হলেও কোর্ট চালু করতে আইনজীবীদের দাবি জোরালো হচ্ছে। বিনা বিচারে কারাবন্দিদের অধিকার রক্ষা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য আদালত চালু করতে অনলাইনের এক আলোচনায় এমনটি উঠে এসেছে।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও বারের নেতাদের ভার্চুয়াল কোর্ট চালুর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অন্য বিচারপতিদের (ব্রাদার জজ) সঙ্গে বসে এ বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানা যাচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, যেহেতু মহামারি এই করোনা ভাইরাস কবে থামবে সেটার কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই সরকার ও আইনমন্ত্রনালয় চাইলে আইনের মধ্যে থেকেই ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করতে পারেন। তাহলে মামলা জট রোধ করা সম্ভব হবে।

তারা পরামর্শ দিয়ে বলেন, জরুরি বিষয় শুনানির জন্য সীমিত পরিসরে এক বা অধিক বেঞ্চ অথবা দু’একটি বেঞ্চ গঠন করে অনলাইনভিত্তিক সীমিত পরিসরে আদালত কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। যেহেতু দেশের জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কোনো প্রতিকারের পথ এ মুহূর্তে খোলা নেই।

এছাড়া বিভিন্ন জরুরি বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগও বন্ধ। তাই অনলাইনই এখন একমাত্র উপায় হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় স্বল্প পরিসরে হলেও আদালত খুলতে প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন ও সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।

মূলত তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন অন্য বিচারপতিদের (ব্রাদার জজ) সঙ্গে বসে এ বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপ্রিমকোর্টের একটি সুত্র জানায়, ভার্চুয়াল কোর্ট নিয়ে বিচারপতিদের মধ্যে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। আশা করা যায় রোববার থেকে অনলাইন আদালত চালু হবে। সুপ্রিমকোর্ট প্রসাশন ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রীর সাথে কথা বলে এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছেন। এখন শুধু ঘোষণার বাকী আছে।

জানা যায়, করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও বিচারকার্য চলমান রাখতে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের হাইকোর্ট অনলাইনে মামলা শুনানি করে জরুরি বিষয়ে আদেশ দিচ্ছেন। এমনকি ইরান, ইতালি ও মালদ্বীপেও ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম চলছে।

এদিকে জরুরি বিষয় শুনানির জন্য সীমিত পরিসরে এক বা অধিক বেঞ্চ অথবা দু’একটি বেঞ্চ গঠন করে অনলাইনভিত্তিক সীমিত পরিসরে আদালত কার্যক্রম চালুর জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের ১৪ জন আইনজীবী।

এর আগে চিলড্রেন’স চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের (সিসিবি) পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আব্দুল হালিম ও পরিচালক অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান একই আবেদন করেন।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ থাকায় আমাদের কিছু সমস্যা হচ্ছে। যেমন যারা জেলে আছেন তাদের তো সমস্যা হচ্ছে। বর্তমান সমস্যার আগে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ছোটখাটো অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাদের মামলাগুলোর শুনানি হচ্ছে না।

ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট যদি তাদের রিফিউজ করে, তখন তাদের কোনো উপায় থাকছে না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট খোলা থাকলে তাদের এই সমস্যায় পড়তে হতো না। কারণ, প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে জামিনে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা। সে অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোর্ট চালু করতে গেলেও কিছু সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে আমিন উদ্দিন বলেন, ভিডিও কনফারেন্সে বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোর্ট চালু করা সম্ভব না।

কারণ, হাইকোর্ট রুলসে আছে, দরখাস্ত জমা দিতে হবে। তারপর মামলাটি আদালতের কার্যতালিকায় আসবে। তারপর শুনানি করতে হবে। কিন্তু এ বিষয়গুলো করলে, লোক সমাগম হবে। আর লোক সমাগম হলে, কোনো কারণে যদি ভাইরাস ছড়ায়, তাহলে তো সবার জন্য ক্ষতিকর হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে, আমি প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেছি স্বল্প পরিসরে আদালত খোলার জন্য। আশা করি, উনি একটা ব্যবস্থা করবেন।

এ বিষয়ে বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, প্রধান বিচারপতিকে বলেছি, তিনি যদি জনসমাগম এড়াতে চান তাহলে আমরা আইনজীবীরা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় জামিনের দরখাস্ত কিংবা জরুরি পিটিশন জমা দিয়ে আসব। আপনি সেগুলো সংশ্লিষ্ট বিচারককে দেন, তিনি মামলার গুরুত্ব কিংবা জরুরি বিষয় বিবেচনা করবেন।

এদিকে অনলাইনে আদালত পরিচালনার তীব্র বিরোধীতা করে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী এক ফেসবুক পোস্ট দেন।

তাতে তিনি লিখেছেন, ‘‘অনলাইন ভিত্তিক সীমিত আদালত কার্যক্রম এর আবেদনের তীব্র বিরোধীতা করছি। সুপ্রিমকোর্ট সর্বস্তরের আইনজীবীদের পদভারে আবার মুখরিত হবে ইনশাআল্লাহ। গুটি কয়েক এলিট আইনজীবী ও এলিট বিচারপ্রার্থীর জন্য হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট নয়। এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতিকে সর্বস্তরের আইনজীবীদের সুরক্ষা ও পেশার কল্যাণের জন্য ভুমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।’’

ভার্চুয়াল কোর্ট চালু নিয়ে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান বলেন, ‘অনলাইনে কোর্ট চালু করে জরুরি বিষয়ে আদেশ দিতে ষোল আইনজীবীর চিঠি আমরা পেয়েছি। তাছাড়া সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি ও সম্পাদকও বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট প্রসাশনের সাথে আলোচনা করেছে।অন্যদের দেয়া চিঠি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। চিঠির বিষয়বস্তু প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়েছে। -সূত্র : আ. সংবাদ