করোনায় ঢাকার বাসা ছেড়ে অনেকেই গ্রামে চলে যাচ্ছেন, টু-লেটের সারিও দীর্ঘ হচ্ছে

(দিনাজপুর২৪.কম) মহামারী করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট ভয়াবহ দুর্যোগে মানুষের আয় কমেছে; বিশেষ করে মধ্য ও নি¤œবিত্তের অন্নের সংস্থানই কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ এই শ্রেণির হাজার হাজার মানুষ হয় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, নয় তো বেতন পাচ্ছেন না কিংবা যেখানে চাকরি করছেন সেখানে বেতন কমিয়ে অর্ধেক করা হয়েছে। চাকরিজীবীর বাইরে ছোট কিংবা মাঝারিগোছের ব্যবসায়ীদের সংসারে টানাটানি লেগেছে, যার কারণে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সঙ্গে জীবনযুদ্ধে টিকতে না পেরে শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটছেন অনেকে। এর সঙ্গে অনেক স্বপ্নও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের; কিন্তু যারাই ঢাকা ছাড়ছেন, তাদের অধিকাংশের বাসাভাড়া জোগাড়ের দুশ্চিন্তার কারণে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ যতটুকু আয় হচ্ছে, তার দুই-তৃতীয়াংশ যাচ্ছে এই খাতে।

মহামারীর এই সময় অনেক কিছুতে ছাড় থাকলেও বাসাভাড়া কম নিচ্ছেন- এমনটি ব্যতিক্রম ঘটনা। কারণ বাসাভাড়াই যাদের আয়, তারা কী করবেন? হোল্ডিং ট্যাক্সসহ গ্যাস ও বিদ্যুতের বিলে কোনো ছাড় নেই। তা হলে তারাই বা কীভাবে চলবেনÑ এমন প্রশ্নও আছে। তার পরও এই দুর্যোগে বাসাভাড়ার ব্যাপারে সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলেও মত এসেছে। রাজধানীর বাসাভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন ছিল অনেকদিন ধরেই। বছর বছর বাসাভাড়া বৃদ্ধি পেলেও আয় বাড়েনি মানুষের। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশই চলে যাচ্ছে বাসাভাড়ার পেছনে।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মানুষজনের আয়ে যে প্রভাব পড়েছে, সেই বিবেচনায় বাড়িভাড়া কমানোর দাবি জানিয়েছিল কয়েকটি নাগরিক সংগঠন। বাড়িভাড়া মওকুফের দাবিতে ঢাকায় মানববন্ধনও হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক জরিপ থেকে জানা যায়, ২৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৩০ ভাগ, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া প্রায় অর্ধেক, ১২ শতাংশ আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করেন বাড়িভাড়া খাতে। এ ছাড়া ৪ শতাংশ ভাড়াটিয়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এতদিন কোনোভাবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর সংসার চললেও করোনাকালে চাকরি বা কাজ হারিয়েছেন অনেকেই। ফলে দুমুঠো খাবার জোগানোই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ বাসাভাড়া। অনেক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সন্তানের বাবার চোখে এখন হতাশা। তাদের হতাশার কারণ একটাইÑ মাস শেষে বাড়িভাড়া কোথা থেকে আসবে? যেখানে অফিস-আদালত সেভাবে শুরুই হয়নি কিংবা হলেও বেতন কমেছে অনেক।

সমাজ ও অপরাধ গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, শহর ছেড়ে মানুষ দলে দলে গ্রামে চলে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে সহানুভূতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সচ্ছলদের এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন প্রতিষ্ঠানপ্রধানরাও মানবিক আচরণের পরিচয় দিতে পারেন।

তিনি বলেন, মানুষের আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ায়। এটা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। এতদিন মানুষ কোনোভাবে টিকে থাকতে পারলেও বর্তমানে বিপুলসংখ্যক কর্মহীন মানুষ বিপাকে রয়েছেন। তারা বাধ্য হয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন? এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হব। বাড়িভাড়া মওকুফ বা কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে হবে।

ভাড়াটিয়া পরিষদর সভাপতি বাহরান সুলতান বাহার আমাদের সময়কে বলন, বাড়িভাড়া দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখা সমস্যা। মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারগুলার আয়ের বেশিরভাগই চল যাচ্ছে বাড়িভাড়ায়। এই করানাকালে আয় না থাকায় সবাই ছুটছে গ্রামে। তিনি বলেন, গত এক মাসে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ ও তাদর ওপর নির্ভরশীলরা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র চাইলেই বাড়িভাড়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে। বাড়িওয়ালারও এমন সংকট মুহূর্তে বাড়িভাড়া মওকুফ বা অর্ধেক নিতে পারেন।

করোনা মহামারীর কারণে এই বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে আগামী তিন মাসের মধ্যে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ চাকরি হারাতে যাচ্ছে। এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। এদের মধ্যে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতেই চাকরি হারাচ্ছে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ। বর্তমানে বিশ্বের পূর্ণ বা খ-কালীন মোট কর্মশক্তির প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পেশা কোনো না কোনোভাবে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আইএলও বলছে, বিভিন্ন আয়ের মানুষ এর ফলে ক্ষতির শিকার হবে; কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ২০০৮-২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার সময় যত মানুষ চাকরি হারিয়েছে, এই হার তার চেয়েও বেশি। আইএলওর তথ্য অনুযায়ী আবাসন ও খাদ্যের পাশাপাশি নির্মাণ, খুচরা বিক্রি, ব্যবসা এবং প্রশাসনিক খাতগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘কোভিড ১৯-এর সময় জীবিকা, ক্ষতি ও সহায়তা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি আয় কমেছে রেস্তোরাঁর কর্মীদের। তাদের রোজগার কমেছে ৯৯ শতাংশ। রোজগার কমার ক্ষেত্রে এর পরের অবস্থানে আছেন ভাঙারির কর্মীরা। তাদের রোজগার কমেছে ৮৮ শতাংশ। রিকশাচালকদের আয় কমেছে ৮৪ শতাংশ। দিনমজুরের আয় কমেছে ৮৩ শতাংশ। শিল্পীসমাজের আয়ও কমেছে ৮৩ শতাংশ। মালি ও কারখানার কর্মীদের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিকদের ৭৯ শতাংশ, কৃষিশ্রমিকদের ৭৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৭৩ শতাংশ, দোকান, সেলুন, পার্লারের রোজগার কমেছে ৭২ শতাংশ। পোশাককর্মীদের আয় কমেছে ৪৯ শতাংশ, কৃষকের ৪৪ শতাংশ, পিয়ন ও নিরাপত্তারক্ষীদের ৪৩ শতাংশ, অফিসের আনুষ্ঠানিক কর্মীদের কমেছে ৩৩ শতাংশ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আয় কমেছে ২৭ শতাংশ। অপর এক জরিপে দেখা যায়, কোভিড ১৯-এর কারণে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের কমপক্ষে এক সদস্য চাকরি হারিয়েছেন। মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে গড় পারিবারিক উপার্জন কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা ভাইরাসের কারণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। কোনো নিয়োগ পরীক্ষার নৈর্ব্যক্তিক ও লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও মৌখিক পরীক্ষা হয়নি। আবার কোনোটিতে মৌখিক পরীক্ষা শেষ হলেও চূড়ান্ত ফল হয়নি। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নির্ধারিত বয়সসীমা ৩০ বছর অনেকের শেষ হতে চলেছে; কিন্তু চাকরিপ্রত্যাশীদের নিয়ে সরকারের কোনো নির্দেশনা নেই।

গত কয়েকদিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক টু-লেট ঝুলতে দেখা গেছে। এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, জীবিকা নির্বাহ করতে না পেরে ঢাকা ছেড়েছে মানুষ। চাকরির প্রত্যাশায় থাকা মেসে জীবনযাপন করা বিপুলসংখ্যক তরুণও চলে গেছেন গ্রামের বাড়িতে।

রাজধানীর বিপুলসংখ্যক বাসা খালি হওয়ায় টু-লেট ঝুলছে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে। বিশেষ করে কিছু অভিজাত এলাকা বাদে সর্বত্রই টুলেটের ছড়াছড়ি। এসব বাড়ির মালিকরা বাসাভাড়া কম নেওয়ার পাশাপাশি দিচ্ছেন নানা অফারও। পানি ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত বিল নেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও তা ছাড় দিয়ে ভাড়াটিয়া খুঁজছেন বাড়িওয়ালারা।

কাঁটাবনের সৌখিন প্যালেস নামের একটি বাড়ির সামনে টু-লেট ঝুলছে দুমাস ধরে; কিন্তু ভাড়াটিয়া মিলছে না। ২৫ হাজার টাকায় এতদিন ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে এলেও বর্তমানে তা ২০ হাজার টাকায় দিতে চাচ্ছেন। এর পরও ভাড়াটিয়া নেই। একই অবস্থা রাজধানীর মালিবাগের একটি ভবনেরও। ছয়তলা ভবনটির তিনটি ফ্ল্যাট খালি হয়েছে গত মাসে; কিন্তু এখন পর্যন্ত ভাড়া হয়নি। বাড়িটির মালিক রায়হান আহাম্মেদ বলেন, ভাড়াটিয়া পাচ্ছি না। বাসাভাড়া কমিয়ে দেওয়ার পরও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

গত কয়েকদিনে পোস্তাগোলা ব্রিজ, বাবুবাজার, গাবতলী ও উত্তরা এলাকায় দেখা গেছেÑ প্রায় প্রতিদিনই শত শত মানুষ রাজধানী ছাড়ছে। ট্রাক-পিকআপের মাধ্যমে মালপত্র বোঝাই করে ঢাকা ছাড়ছেন তারা। গভীর রাতে ট্রাকভর্তি মালামাল নিয়ে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে অনেককে। বেশিরভাগই সংসারের বিভিন্ন জিনিসপত্র অল্পদামে বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন গ্রামে। ধার করে যোগার করছেন ট্রাকভাড়া।

গত শুক্রবার ট্রাকে করে মালামাল নিয়ে গ্রামে যাচ্ছিলেন মধুবাগের বাসিন্দা কামাল হোসেন। কাজ করতেন একটি বায়িং হাউসে; কিন্তু গত মাসে চাকরি হারান। এর পর ধারকর্জ করে এক মাস চললেও সংসার টেনে নিতে পারছিলেন না আর। অবশেষে সবকিছু নিয়ে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন গ্রামে।

এদিকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন হয়নি গত দুমাসে। কিছু প্রতিষ্ঠানে বেতনের অর্ধেক দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা-ও দেয়নি। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক ছয় মাসের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মৌখিকভাবে অফিসে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। রাজধানীতে বাসাভাড়া দিয়ে থাকার মতো সক্ষমতা নেই এদের। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে ঢাকা ছাড়তে হচ্ছে তাদের।

সিঅ্যান্ডএফ কোম্পানিতে কাজ করতেন রফিকুল ইসলাম শাহেদ। চারজনের সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিল; কিন্তু করোনার কারণে কাজ-কর্ম নেই। মালিক অবৈতনিক ছুটি দিয়েছেন চার মাস। এ দীর্ঘ সময় বাসাভাড়া দিয়ে ঢাকায় থাকার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই তার।

এ বিষয়ে অধ্যাপক তৌহিদুল হক আরও বলেন, বাড়িওয়ালারাও মানবিক আচরণ করতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরেই শহরে তুলনামূলক বেশি ভাড়া নেওয়ার প্রচলন। ঢাকায় একটি বাড়ি থাকা মানে নির্ভাবনার জীবন। স্বল্প সময়ের জন্য মানুষের কথা ভেবে তারা ভাড়া অর্ধেক বা মওকুফ করতে পারেন। এক্ষেত্রে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র বাড়িওয়ালাদের বাধ্য করবে। রাষ্ট্রের আরেকটি দিক খেয়াল রাখতে হবে, যারা বিত্তশালী রয়েছন, তারা যেনো তাদের অধীনস্তদের আয়ের বিষয়টি খেয়াল রাখেন। ছাঁটাই কোনো সমাধান নয়, সবাইকে নিয়ে স্বল্পআয়ের মাধ্যমেই এই সময়টা পার করতে হবে। আর একটা বিষয় রয়েছেÑ কমিউনিটি ইনিশিয়েটিভ। সবাইক সবার জন্য এগিয় আসত হবে। আর্থিক সমস্যা উত্তরণে এর বিকল্প নেই।

তিনি বলন, কর্মহীন হয়ে পড়া কিংবা যাদের বেতন কম পাচ্ছেন; তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলার মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রকে সহানুভূতিশীল হতে হবে। একজন মানুষ গ্রামে চলে যাওয়ার সাথে সাথে অনেক বিষয় জড়িত থাকে। সন্তানদের শিক্ষা, বয়স্কদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাগুলোও জড়িত।

মহামারী করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট ভয়াবহ দুর্যোগে মানুষের আয় কমেছে; বিশেষ করে মধ্য ও নি¤œবিত্তের অন্নের সংস্থানই কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ এই শ্রেণির হাজার হাজার মানুষ হয় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, নয় তো বেতন পাচ্ছেন না কিংবা যেখানে চাকরি করছেন সেখানে বেতন কমিয়ে অর্ধেক করা হয়েছে। চাকরিজীবীর বাইরে ছোট কিংবা মাঝারিগোছের ব্যবসায়ীদের সংসারে টানাটানি লেগেছে, যার কারণে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সঙ্গে জীবনযুদ্ধে টিকতে না পেরে শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটছেন অনেকে। এর সঙ্গে অনেক স্বপ্নও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের; কিন্তু যারাই ঢাকা ছাড়ছেন, তাদের অধিকাংশের বাসাভাড়া জোগাড়ের দুশ্চিন্তার কারণে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ যতটুকু আয় হচ্ছে, তার দুই-তৃতীয়াংশ যাচ্ছে এই খাতে।

মহামারীর এই সময় অনেক কিছুতে ছাড় থাকলেও বাসাভাড়া কম নিচ্ছেনÑ এমনটি ব্যতিক্রম ঘটনা। কারণ বাসাভাড়াই যাদের আয়, তারা কী করবেন? হোল্ডিং ট্যাক্সসহ গ্যাস ও বিদ্যুতের বিলে কোনো ছাড় নেই। তা হলে তারাই বা কীভাবে চলবেন- এমন প্রশ্নও আছে। তার পরও এই দুর্যোগে বাসাভাড়ার ব্যাপারে সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলেও মত এসেছে। রাজধানীর বাসাভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন ছিল অনেকদিন ধরেই। বছর বছর বাসাভাড়া বৃদ্ধি পেলেও আয় বাড়েনি মানুষের। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশই চলে যাচ্ছে বাসাভাড়ার পেছনে।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মানুষজনের আয়ে যে প্রভাব পড়েছে, সেই বিবেচনায় বাড়িভাড়া কমানোর দাবি জানিয়েছিল কয়েকটি নাগরিক সংগঠন। বাড়িভাড়া মওকুফের দাবিতে ঢাকায় মানববন্ধনও হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক জরিপ থেকে জানা যায়, ২৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৩০ ভাগ, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া প্রায় অর্ধেক, ১২ শতাংশ আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করেন বাড়িভাড়া খাতে। এ ছাড়া ৪ শতাংশ ভাড়াটিয়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এতদিন কোনোভাবে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষগুলোর সংসার চললেও করোনাকালে চাকরি বা কাজ হারিয়েছেন অনেকেই। ফলে দুমুঠো খাবার জোগানোই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ বাসাভাড়া। অনেক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সন্তানের বাবার চোখে এখন হতাশা। তাদের হতাশার কারণ একটাইÑ মাস শেষে বাড়িভাড়া কোথা থেকে আসবে? যেখানে অফিস-আদালত সেভাবে শুরুই হয়নি কিংবা হলেও বেতন কমেছে অনেক।

সমাজ ও অপরাধ গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, শহর ছেড়ে মানুষ দলে দলে গ্রামে চলে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে সহানুভূতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সচ্ছলদের এগিয়ে আসতে হবে। বিভিন প্রতিষ্ঠানপ্রধানরাও মানবিক আচরণের পরিচয় দিতে পারেন।

তিনি বলেন, মানুষের আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ায়। এটা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। এতদিন মানুষ কোনোভাবে টিকে থাকতে পারলেও বর্তমানে বিপুলসংখ্যক কর্মহীন মানুষ বিপাকে রয়েছেন। তারা বাধ্য হয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন? এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হব। বাড়িভাড়া মওকুফ বা কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে হবে।

ভাড়াটিয়া পরিষদর সভাপতি বাহরান সুলতান বাহার আমাদের সময়কে বলন, বাড়িভাড়া দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখা সমস্যা। মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারগুলার আয়ের বেশিরভাগই চল যাচ্ছে বাড়িভাড়ায়। এই করানাকালে আয় না থাকায় সবাই ছুটছে গ্রামে। তিনি বলেন, গত এক মাসে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ ও তাদর ওপর নির্ভরশীলরা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র চাইলেই বাড়িভাড়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে। বাড়িওয়ালারও এমন সংকট মুহূর্তে বাড়িভাড়া মওকুফ বা অর্ধেক নিতে পারেন।

করোনা মহামারীর কারণে এই বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে আগামী তিন মাসের মধ্যে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ চাকরি হারাতে যাচ্ছে। এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। এদের মধ্যে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতেই চাকরি হারাচ্ছে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ। বর্তমানে বিশ্বের পূর্ণ বা খ-কালীন মোট কর্মশক্তির প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পেশা কোনো না কোনোভাবে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আইএলও বলছে, বিভিন্ন আয়ের মানুষ এর ফলে ক্ষতির শিকার হবে; কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ২০০৮-২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার সময় যত মানুষ চাকরি হারিয়েছে, এই হার তার চেয়েও বেশি। আইএলওর তথ্য অনুযায়ী আবাসন ও খাদ্যের পাশাপাশি নির্মাণ, খুচরা বিক্রি, ব্যবসা এবং প্রশাসনিক খাতগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘কোভিড ১৯-এর সময় জীবিকা, ক্ষতি ও সহায়তা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি আয় কমেছে রেস্তোরাঁর কর্মীদের। তাদের রোজগার কমেছে ৯৯ শতাংশ। রোজগার কমার ক্ষেত্রে এর পরের অবস্থানে আছেন ভাঙারির কর্মীরা। তাদের রোজগার কমেছে ৮৮ শতাংশ। রিকশাচালকদের আয় কমেছে ৮৪ শতাংশ। দিনমজুরের আয় কমেছে ৮৩ শতাংশ। শিল্পীসমাজের আয়ও কমেছে ৮৩ শতাংশ। মালি ও কারখানার কর্মীদের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিকদের ৭৯ শতাংশ, কৃষিশ্রমিকদের ৭৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৭৩ শতাংশ, দোকান, সেলুন, পার্লারের রোজগার কমেছে ৭২ শতাংশ। পোশাককর্মীদের আয় কমেছে ৪৯ শতাংশ, কৃষকের ৪৪ শতাংশ, পিয়ন ও নিরাপত্তারক্ষীদের ৪৩ শতাংশ, অফিসের আনুষ্ঠানিক কর্মীদের কমেছে ৩৩ শতাংশ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আয় কমেছে ২৭ শতাংশ। অপর এক জরিপে দেখা যায়, কোভিড ১৯-এর কারণে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের কমপক্ষে এক সদস্য চাকরি হারিয়েছেন। মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে গড় পারিবারিক উপার্জন কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা ভাইরাসের কারণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। কোনো নিয়োগ পরীক্ষার নৈর্ব্যক্তিক ও লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও মৌখিক পরীক্ষা হয়নি। আবার কোনোটিতে মৌখিক পরীক্ষা শেষ হলেও চূড়ান্ত ফল হয়নি। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নির্ধারিত বয়সসীমা ৩০ বছর অনেকের শেষ হতে চলেছে; কিন্তু চাকরিপ্রত্যাশীদের নিয়ে সরকারের কোনো নির্দেশনা নেই।

গত কয়েকদিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক টু-লেট ঝুলতে দেখা গেছে। এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, জীবিকা নির্বাহ করতে না পেরে ঢাকা ছেড়েছে মানুষ। চাকরির প্রত্যাশায় থাকা মেসে জীবনযাপন করা বিপুলসংখ্যক তরুণও চলে গেছেন গ্রামের বাড়িতে।

রাজধানীর বিপুলসংখ্যক বাসা খালি হওয়ায় টু-লেট ঝুলছে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে। বিশেষ করে কিছু অভিজাত এলাকা বাদে সর্বত্রই টুলেটের ছড়াছড়ি। এসব বাড়ির মালিকরা বাসাভাড়া কম নেওয়ার পাশাপাশি দিচ্ছেন নানা অফারও। পানি ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত বিল নেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও তা ছাড় দিয়ে ভাড়াটিয়া খুঁজছেন বাড়িওয়ালারা।

কাঁটাবনের সৌখিন প্যালেস নামের একটি বাড়ির সামনে টু-লেট ঝুলছে দুমাস ধরে; কিন্তু ভাড়াটিয়া মিলছে না। ২৫ হাজার টাকায় এতদিন ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে এলেও বর্তমানে তা ২০ হাজার টাকায় দিতে চাচ্ছেন। এর পরও ভাড়াটিয়া নেই। একই অবস্থা রাজধানীর মালিবাগের একটি ভবনেরও। ছয়তলা ভবনটির তিনটি ফ্ল্যাট খালি হয়েছে গত মাসে; কিন্তু এখন পর্যন্ত ভাড়া হয়নি। বাড়িটির মালিক রায়হান আহাম্মেদ বলেন, ভাড়াটিয়া পাচ্ছি না। বাসাভাড়া কমিয়ে দেওয়ার পরও পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

গত কয়েকদিনে পোস্তাগোলা ব্রিজ, বাবুবাজার, গাবতলী ও উত্তরা এলাকায় দেখা গেছেÑ প্রায় প্রতিদিনই শত শত মানুষ রাজধানী ছাড়ছে। ট্রাক-পিকআপের মাধ্যমে মালপত্র বোঝাই করে ঢাকা ছাড়ছেন তারা। গভীর রাতে ট্রাকভর্তি মালামাল নিয়ে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে অনেককে।

বেশিরভাগই সংসারের বিভিন্ন জিনিসপত্র অল্পদামে বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন গ্রামে। ধার করে যোগার করছেন ট্রাকভাড়া।

গত শুক্রবার ট্রাকে করে মালামাল নিয়ে গ্রামে যাচ্ছিলেন মধুবাগের বাসিন্দা কামাল হোসেন। কাজ করতেন একটি বায়িং হাউসে; কিন্তু গত মাসে চাকরি হারান। এর পর ধারকর্জ করে এক মাস চললেও সংসার টেনে নিতে পারছিলেন না আর। অবশেষে সবকিছু নিয়ে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন গ্রামে।

এদিকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন হয়নি গত দুমাসে। কিছু প্রতিষ্ঠানে বেতনের অর্ধেক দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা-ও দেয়নি। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক ছয় মাসের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মৌখিকভাবে অফিসে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। রাজধানীতে বাসাভাড়া দিয়ে থাকার মতো সক্ষমতা নেই এদের। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে ঢাকা ছাড়তে হচ্ছে তাদের।

সিঅ্যান্ডএফ কোম্পানিতে কাজ করতেন রফিকুল ইসলাম শাহেদ। চারজনের সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিল; কিন্তু করোনার কারণে কাজ-কর্ম নেই। মালিক অবৈতনিক ছুটি দিয়েছেন চার মাস। এ দীর্ঘ সময় বাসাভাড়া দিয়ে ঢাকায় থাকার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই তার।

এ বিষয়ে অধ্যাপক তৌহিদুল হক আরও বলেন, বাড়িওয়ালারাও মানবিক আচরণ করতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরেই শহরে তুলনামূলক বেশি ভাড়া নেওয়ার প্রচলন। ঢাকায় একটি বাড়ি থাকা মানে নির্ভাবনার জীবন। স্বল্প সময়ের জন্য মানুষের কথা ভেবে তারা ভাড়া অর্ধেক বা মওকুফ করতে পারেন। এক্ষেত্রে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র বাড়িওয়ালাদের বাধ্য করবে। রাষ্ট্রের আরেকটি দিক খেয়াল রাখতে হবে, যারা বিত্তশালী রয়েছন, তারা যেনো তাদের অধীনস্তদের আয়ের বিষয়টি খেয়াল রাখেন। ছাঁটাই কোনো সমাধান নয়, সবাইকে নিয়ে স্বল্পআয়ের মাধ্যমেই এই সময়টা পার করতে হবে। আর একটা বিষয় রয়েছেÑ কমিউনিটি ইনিশিয়েটিভ। সবাইক সবার জন্য এগিয় আসত হবে। আর্থিক সমস্যা উত্তরণে এর বিকল্প নেই।

তিনি বলন, কর্মহীন হয়ে পড়া কিংবা যাদের বেতন কম পাচ্ছেন; তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলার মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রকে সহানুভূতিশীল হতে হবে। একজন মানুষ গ্রামে চলে যাওয়ার সাথে সাথে অনেক বিষয় জড়িত থাকে। সন্তানদের শিক্ষা, বয়স্কদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাগুলোও জড়িত। সূত্র : আ. সময়