(দিনাজপুর২৪.কম) শাসিত সংস্থার উদ্বৃত্ত টাকা কোষাগারে নেয়া সংক্রান্ত আইন ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টি ও বিএনপিরা সংসদ সদস্যরা এর বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেছেন, আর্থিক খাতে লুটপাটের কারণে এখন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর অর্থের দিকে চোখ পড়েছে সরকারের।

এ বিলের বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, কদিন পরে আমার অ্যাকাউন্টের টাকা নিয়ে নেবে কি না, সেই ভয়ে আছি। টাকা এখন ব্যাংক থেকে নিয়ে বাসায় নিয়ে যাবে কি না ভাবছি। শেয়ারবাজার ধ্বংস করে ফেলেছে। তাই এই বিলটি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানাব।

বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদে স্বশাসিত সংস্থার উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে নেয়া সংক্রান্ত ‘স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন ফাইন্যান্সিয়াল কর্পোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থা সমূহের উদ্ধৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন-২০২০’ বিলটি পাসের বিরোধিতা করে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় সংসদের সভাপতিত্বে ছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

বিলটি পাসের জন্য অর্থমন্ত্রী আ হম মুস্তফা কামাল প্রস্তাব করলে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির কয়েকজন সংসদ সদস্য এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেন। এ সময় পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সংসদে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।

এই আইন পাসের ফলে ৬১টি প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত টাকা নিতে পারবে সরকার। পরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যারা অন্যায় করেছে (তাদের) বিচারে নিয়ে যাব।‘ তবে সংসদে তাকে ‘ব্যবসায়ী’ বলে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে বলেও উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজার আরও ভালো করা উচিত। যে জায়গায় থাকা উচিত, সেখানে নেই।

বিলটি বাছাই কমিটিতে দেয়ার প্রস্তাব করে বিএনপির রুমিন ফারহানা বলেন, এদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়া এবং সরকারি ধারাবাহিক লুটপাটের এক প্রতীক এই আইন।

তিনি বলেন, সরকার রাজস্ব থেকে কেন উন্নয়ন করতে পারে না? শেয়ারবাজার লুট, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ, প্রকল্পের নামে সীমাহীন লুটপাট হচ্ছে। টাকা ব্যাংকে আছে। সেই টাকা নিয়ে নিলে শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, ব্যাংকের হাতে টাকা থাকবে না। সরকারের এখন চোখ গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের দিকে।

অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে রুমিন বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী অসাধারণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সাধারণ অবস্থা থেকে ব্যবসায়ী হয়েছেন। উনি অর্থনীতি বোঝেন না-এটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। তাহলে সমস্যটা কোথায়? উনার সদিচ্ছার অভাব। এত মেধাবী তিনি কিন্তু শেয়ারবাজার, খেলাপি ঋণ নিয়ে কিছু করলেন না। কেন মেধাবী অর্থমন্ত্রী এদিকে নজর দিচ্ছেন না? উনি ধনী সমাজের জন্য অর্থমন্ত্রী হন নাই। কেন খেটে খাওয়া মানুষের দিকে উনার নজর নেই?’

জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, ‘কদিন পরে আমার অ্যাকাউন্টের টাকা নিয়ে নেবে কি না, সেই ভয়ে আছি। টাকা এখন ব্যাংক থেকে নিয়ে বাসায় নিয়ে যাব কি না ভাবছি। আমি এটুকু বলতে চাচ্ছি, অর্থমন্ত্রী শিক্ষিত লোক। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। উনার সময়ে পুঁজিবাজারে ১০ হাজার ইনডেক্স উঠেছিল। যখন উনি পরিকল্পনামন্ত্রী তখনই তিনি বলেছিলেন, চার হাজার হওয়ার কথা, কীভাবে ১০ হাজার হলো? উনি জানতেন না? ব্যাংকের মালিক সমিতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রী বসেন। কীভাবে হয় এটা?’

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিরঙ্কুশ সংখ্যগরিষ্ঠের ক্ষমতা দেখাবেন না। পৃথিবীতে অনেক দেশ ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, এটা একটা কালো আইন। আইন করে সমস্ত টাকা তুলে নেবে। উন্নয়নের জন্য অর্থ দরকার আছে। কিন্তু সামর্থ্য কতটুকু? এই টাকাগুলো ব্যাংকে জমা আছে। টাকা নেয়া হলে ব্যাংকগুলো মারাত্মক বিশৃঙ্খলায় পড়বে। প্রতিষ্ঠানগুলোর স্পৃহা ধ্বংস হয়ে যাবে। ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ নেই। শেয়ারবাজার ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। আমি এই বিলটি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানাব।’

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, বিলটি পাস হলে অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে যাবে। এই টাকার মালিক জনগণ। পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার করেন। ব্যাংকিং খাত ভেঙে পড়েছে, সেদিকে নজর দিন।

তিনি বলেন, ‘টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য ব্যাংক দায়ী। সালমান এফ রহমান এখানে আছেন, তিনি ব্যাংকের মালিক (আইএফআইসি)। ব্যাংকের মালিক জনগণ। ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশন এখানে বই দেয়, ওখানে কম্বল দেয়, অন্তত ১০০ ছবি দেয়। অর্থমন্ত্রীর ছবি ছাপা হয় না। টাকা কি উনার? এটা জনগণের টাকা। এই টাকা কেন অ্যালাউ করেন? টাকা যদি বেশি হয়ে থাকে জনগণের খেদমতের জন্য দিয়ে দেন।’

জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ী হলে যা হয়, তাই হয়েছে। আমি একজন অ্যাডভোকেট, এটা বললে কি অপরাধ হবে? উনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। কিন্তু উনার মূল পরিচয় একজন ব্যবসায়ী। এটাতে আহত হওয়ার কারণ নেই। আমরা আশা করেছিলাম, সাকসেসফুল বিজনেসম্যান। অর্থনীতিতে ভালো করবেন। কতদূর ভালো করেছেন উনি চিন্তা করবেন। ব্যাংকের মালিক ডিরেক্টররা ঋণ নিয়ে বসে আছেন। এটা কি দেশ? টাকা পাচার হয়, উনি ব্যবস্থা নেন না। বিভিন্ন সংস্থার টাকা খরচ করছেন। আগামী বছর ট্যাক্স না পেলে কী করবেন? ২০১৭ সালে আমাকে বেস্ট লেবার মিনিস্টারের অ্যাওয়ার্ড দিয়েছিল, কেন যে দিয়েছিল, তা আমি জানি না।’

জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘জনবিরোধী এ আইন পাস হলে সংসদের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটবে। ব্যাংক থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। দেখা যাবে সামনের বছর ১ লাখ কোটি টাকা নেবেন। এর কোনো শেষ নেই।’

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা শিপিং করপোরেশনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এখন এর টাকা নিতে হলে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমতি নিতে হবে। এটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান।

পাটোয়ারী বলেন, স্বাধীন দেশে এ ধরনের আইন হতে পারে না। মেগা প্রজেক্ট বাদ দিলে কী হবে? কিছুই হবে না। একটা আইন সিস্টেমকে কলাপস করে দেবে। একটা আইন অর্থনীতিতে কি লোটাস বা পদ্মফুল এনে দেবে? এতই ন্যাক্কারজনক আইন যে সংশোধনযোগ্য নয়।

বিরোধী সদস্যদের সমালোচনার জবাব দিতে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, ‘এত বক্তৃতা শুনতে ভালো লাগে নাই। আপনারা একসময় দায়িত্বে ছিলেন, কী কাজ করেছেন? পৃথিবীতে কোথায় কী হচ্ছে, জানা দরকার। বাংলাদেশ অন্য দেশের কাছে দৃষ্টান্ত। আপনারা বলছেন, ব্যাংক, শেয়ারবাজার সব খালি করে ফেলেছি। আপনাদের সময় পুঁজিবাজার কী ছিল? আপনাদের সময় ইনডেক্স কী ছিল? এবার সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা।’

মুজিবুল হক চুন্নুর উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একবার চিন্তা করে দেখেন সাইফুর রহমান (সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান) চ্যার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলেন। আমিও তাই। আমি সারাবিশ্বের এক নম্বর অর্থমন্ত্রী। পারসোনাল লেভেলে কথা বলবেন-এটা ঠিক নয়। আমিও অনেক কিছু বলতে পারি। সবার বিষয়েই আমি জানি।’

দেশের অর্থনীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একমাত্র রফতানি বাণিজ্য নেগেটিভ। এটা ছাড়া একটি খাতও নেই আমরা পিছিয়ে আছি। বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, জেপি মর্গান-সবাই মনে করে জিডিপি আট ভাগের কম হবে না।

রাজস্ব আয়ে ঘাটতির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ভ্যাট আইন নিয়ে আশাবাদী ছিলাম বাস্তবায়ন করতে পারিনি। আংশিক ভ্যাট মেশিন এনেছে। বাস্তবায়ন শুরু করতে পারিনি। রাজস্ব আহরণ কম বলছেন। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯৭ হাজার বছরের শেষে পুরোমাত্রায় আদায় হবে। নেগেটিভ থাকবে না। কারণ আমাদের সৎ ও শক্ত প্রধানমন্ত্রী আছেন।’

তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য এক-পিছিয়ে পড়ে থাকা মানুষকে মূলস্রোতে নিয়ে আসা। যত বড় ব্যবসায়ী তত বেশি ট্যাক্স দিচ্ছে। আইন সেভাবেই সাজানো। এ ধরনের আইন নতুন নয়। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন দশম সংসদে পাস হয়েছে। সেখানে এ ধরনের কথা বলা হয়েছে। একাদশ সংসদে উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইনে একই ধরনের কথা বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের কোষাগারে অর্থ জমা না পড়লে শৃঙ্খলা আসবে না।

বিদেশে টাকা পাচারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, টাকা পাচারের সংখ্যা কি বলতে পারছি? তাহলে জানি কীভাবে? আমি কি পার্টনার? তাহলে তো হয় অভিযোগ করতে হবে, নাহলে আদালতে সাক্ষ্য দিতে হবে। এই মুহূর্তে কতজন ব্যাংকার, কর্মকর্তা জেলে আছে, জানা দরকার। যারা অন্যায় করেছে (তাদের) বিচারে নিয়ে যাব। -ডেস্ক