স্টাফ রিপোর্টার (দিনাজপুর২৪.কম) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ঘোড়াঘাট উপজেলাকে সন্ত্রাস ও মাদক থেকে মুক্ত করার অঙ্গীকার করেছিলেন। একাধিক তথ্য ও সূত্র বলছে, ইউএনওর এসব কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ান স্থানীয় যুবলীগের কতিপয় নেতা, যারা উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার মদদপুষ্ট। কার্যত তার হয়েই যুবলীগের এসব নেতা কার্যসিদ্ধি করেন। অনেকে মনে করছেন, সেই নেতার অনৈতিক কর্মকান্ডের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার কারণেই ওয়াহিদা খানমের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা হয়েছে।

সরেজমিন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার একাধিক স্থানে গত দুদিন অনুসন্ধান করে এবং এলাকাবাসীসহ একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকাটিতে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন ওই নেতা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ছাড়িয়ে সেই নেতাই এখানে ক্ষমতাসীন দলের সর্বেসর্বা। তিনিই সব নিয়ন্ত্রণ করেন। হিলি সীমান্ত থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন মাদকদ্রব্য ঘোড়াঘাট উপজেলার একাধিক স্থান দিয়ে প্রবেশ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হয়। এসব পাচারচক্রের কাছ থেকে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করেন ওই নেতা। এ জন্য তিনি রীতিমতো লাইনম্যানও রেখেছেন। শুধু তাই নয়, অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার ২২টি উচ্চ বিদ্যালয়, ৯টি কলেজ, ১৩টি মাদ্রাসায় বিগত সময়ে জনবল নিয়োগে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। ঘোড়াঘাট ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণ করাকালে কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীদের কাছ থেকে চেকের মাধ্যমে ৬৩ লাখ গ্রহণ করা হয়। এতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ওই নেতার বিরুদ্ধে চলছে দুদকের অনুসন্ধান।

ওই নেতার সিন্ডিকেটের অন্যতম একজন মঈনুল মাস্টার। ক্ষমতাসীন দলের এ নামধারী নেতার বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমি দখল, সরকারি কাজে বাধা প্রদান, আসামি ছিনতাইসহ ৮টি মামলা রয়েছে।

উপজেলা পরিষদের একটি সূত্রে জানা যায়, ঘোড়াঘাট উপজেলার ডুগডুগি হাটে হাতেম আলী নামের একজনের পাকা দোকান ঘর ভেঙে দিয়ে মঈনুল মাস্টার ও তার সহযোগীরা দখল করে নেন। এ বিষয়ে ইউএনও ওয়াহিদা খানমের কাছে গত ২৭ আগস্ট একটি অভিযোগ করা হয় ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনও ওয়াহিদা খানম স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ প্রদান করা হয় মঈনুল মাস্টারকে। ১ সেপ্টেম্বরের ওই নোটিশে বলা হয়, পরদিন অর্থাৎ ২ সেপ্টেম্বর অভিযোগ তদন্তে ইউএনও সরেজমিন ঘটনাস্থলে যাবেন এবং মঈনুল মাস্টারকেও সেখানে উপস্থিত থাকতে বলা হয় নোটিশে। সূত্রের খবর, এ নোটিশ পেয়ে মঈনুল মাস্টার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান রাফে খন্দকার শাহেনশাহের কাছে যান। এর পর শাহেনশাহ ও মঈনুল মাস্টার দুজন মিলে ইউএনওর কাছে যান এবং তাকে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলেন। সেদিন দিনগত রাতেই ইউএনও ওয়াহিদা খানম সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হন। এ হামলাকা-ের পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন মঈনুল মাস্টার ও তার সহযোগীরা।

এ বিষয়ে শাহেনশাহের সঙ্গে কথা বলার জন্য একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও পাওয়া যায়নি।

ঘোড়াঘাট উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম আকাশ মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, যারা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, বালুমহাল ইজারা, পুকুর দখল ও মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারা সবাই আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতার আশীর্বাদপুষ্ট। তার হয়েই এসব অপকর্ম করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দিনাজপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি রাশেদ পারভেজ বলেন, জাহাঙ্গীর যুবলীগের আহ্বায়ক হলেও সেই কমিটি হয়েছে তিন বছর আগে। সাধারণ নিয়মে তিন মাসের বেশি হলে সেই কমিটির কার্যকারিতা থাকে না। এর পরও তাকে বহিষ্কারের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের ডিও নিয়ে সুপারিশসহ কেন্দ্রে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কারণ তাদের বহিষ্কারের ক্ষমতা যুবলীগের জেলা কমিটির নেই। তবে ইউএনওর ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর জাহাঙ্গীর ও মাসুদ রানাকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিষয়টি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল নিশ্চিত করেছেন।

আগেও অনেক অভিযোগ উঠেছে। এর পরও কেন জাহাঙ্গীরকে বহিষ্কার করা হয়নি? এমন প্রশ্নে মাইনুল হোসেন খান নিখিলবলেন, কেউ অভিযোগ করলেই তো হবে না। যথোপযুক্ত প্রমাণও থাকা দরকার। কাউকে বললাম আর সে চাঁদাবাজ হয়ে গেল, ব্যাপারটি তো তা নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে দেরি করিনি, করবও না। এর আগেও একটি অভিযোগ এসেছিল; কিন্তু এতে কোনো এভিডেন্স ছিল না। তাই আমরা বহিষ্কার করতে পারিনি। তিনি বলেন, ইউএনওর ওপর হামলার অভিযোগে এবার আমরা জাহাঙ্গীরকে বহিষ্কার করলাম। এর পর সন্ধ্যায় র‌্যাব জিজ্ঞাসাবাদ করে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেল না। তখন আমাদের জবাব কি থাকে? আমরা কোন পথে হাঁটব?

জানতে চাইলে দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইমাম চৌধুরী জানান, জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পুরো ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্তব্য করা যাচ্ছে না।

এদিকে যেসব বিষয় ঘোড়াঘাটে আলোচনার ঝড় উঠেছে যে, গত ১২ মে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নিজ তহবিল থেকে পৌরসভার মেয়র আবদুস সাত্তার মিলনের মাধ্যমে ইফতারসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নেন। এ ইফতারসামগ্রী ও ত্রাণ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং পৌর মেয়রকে তখন শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এ ঘটনায় মাসুদ রানা, ইয়াদ আলী ও নাহিদ আবদুর রৌফকে আসামি করা হয়। সে সময় ইউএনও ওয়াহিদা খানম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে ঘোড়াঘাট রানীগঞ্জ এলাকায় নুনদহ ঘাটে অবৈধভাবে শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছিলেন ৩ নম্বর শিংড়া ইউনিয়নের যুবলীগ সভাপতি মাসুদ। ইউএনও ওয়াহিদা খানম বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ ঘটনাটিও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার একটি কারণ হতে পারে স্থানীয়দের কেউ কেউ এমন ধারণাও করছেন।

সূত্র মতে, দিনাজপুর জেলার শুধু ঘোড়াঘাটই নয় দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, বালুমহাল ইজারা, পুকুর দখল ও মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপকর্ম ছড়িয়ে পড়েছে। -সূত্র : আ.সময়