(দিনাজপুর২৪.কম) আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে দলের নতুন নেতৃত্ব। এর আগেই ক্ষমতাসীন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত চলছে শুদ্ধি অভিযান। তাই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই ঠাঁই পেতে হবে নতুন নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্লিন ইমেজের নেতা নির্বাচনে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুদ্ধি অভিযানে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ নেতা হওয়ার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। শেষ হচ্ছে আত্মীয়তার সূত্র ধরে কিংবা নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ককে পুঁজি করে নেতা হওয়ার পথ।

নেতৃত্বে ঠাঁই পেতে নেতাদের দিতে হচ্ছে কঠিন পরীক্ষা। তাদের পরিবারের রাজনৈতিক ব্যাক গ্রাউন্ড, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দুর্দিনে দলের পাশে থাকার ইতিহাস, দলের জন্য ত্যাগ তিতিক্ষা, সাহস ও দক্ষতাকে নেতৃত্বের যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং ফৌজদারি মামলার সমতুল্য অপরাধ রয়েছে, এমন নেতৃত্ব যাচাই বাছাইয়ে প্রথমেই বাদ পড়ে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন খোদ আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড।

কারণ দলকে আরো জনপ্রিয় এবং শক্তিশালী করতে দুর্নীতিবাজ ও অপকর্মের হোতাদের ছেঁটে ফেলার প্রভাব আগামী ডিসেম্বরের জাতীয় সম্মেলনে দেখা যাবে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা ঢাকাসহ দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও মনোনয়ন চেয়ে পাননি, সরকারের লাভজনক কোনো পদে বসেননি কিংবা আর্থিক সুবিধা ভোগ করেননি এমন নেতাদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

গত বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক অনির্ধারিত বৈঠক করেন দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে দলের ত্যাগী নেতাদের তুলে আনার ব্যাপারে অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেন দলীয় প্রধান। বৈঠকে দলটির মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের জেলা ইউনিটের সম্মেলন করার নির্দেশ দেন তিনি। দলের সর্বস্তরে ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে শেখ হাসিনা বলেছেন, বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের জন্য কেউ কোনো তদবির নিয়ে আসবেন, কাউকে বাঁচাতে চাইবেন—আমি কিছু করতে পারব না। তিনি দলীয় নেতাদের বলেন, কে কী করেছেন আমি সব জানি। অপরাধীদের কেউ শেল্টার দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।

ওই অনির্ধারিত বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলের নেতাদের হুশিয়ার করে দিয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বলেছেন, দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য এই অভিযান চালাতে হবে। সর্বস্তরের নতুন কমিটিতে যাতে অনুপ্রবেশকারী ঠাঁই নিতে না পারে সেই দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে দলীয় নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা বৈঠক শেষে গত বুধবার রাতে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কথা বলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। চলমান অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারো নাম উল্লেখ করে আলোচনা হয়নি। তবে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। ওবায়দুল কাদের বলেন, স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতারা আগামী কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাবেন। আওয়ামী লীগের সম চিন্তার নয়—এমন কেউ যাতে দলের ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে না পরে সেজন্য সবাইকে সজাগ থাকতে বলেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।

এসব বিষয়ে আরো জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, দুর্নীতির গন্ধ রয়েছে এমন প্রভাবশালী নেতারাও ওই কাউন্সিলে পদ হারাতে পারেন। অন্যদিকে ক্লিন ইমেজের নেতারা চলে আসবেন ফ্রন্টলাইনে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের আগামী কাউন্সিলে পুরো দলকে ঢেলে সাজাতে ‘ক্লিন ইমেজকে’ প্রধান মানদন্ড করছে হাইকমান্ড।

জেলা-উপজেলায় নেতা নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, পদ প্রার্থীদের বিস্তারিত তথ্য আমরা খতিয়ে দেখছি। এক্ষেত্রে দলে অনুপ্রবেশ, অভিযোগ আছে কিনা, পরিবারের মতাদর্শ, নব্য আওয়ামী লীগার কিনা, দলে হাইব্রিড কিনা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, যেখানে সরকারপ্রধান অভিযুক্তদের ছাড় দিচ্ছেন না, সেখানে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনড় অবস্থানে রয়েছি। আওয়ামী লীগ সব সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

এদিকে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি’ আওয়ামী লীগের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল এবং টানা তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনায় কম-বেশি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানেও থেকেছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, টানা তিন দফায় ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছু দুর্নীতিবাজ এর সুযোগ নিয়েছেন। দল ও সহযোগী সংগঠনের দায়িত্বশীলদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশও জড়িয়ে পড়েছে। এসব দুর্নীতি আওয়ামী লীগকে বিব্রত করছে এবং উন্নয়ন অর্জনকেও ম্লান করছে। সেজন্য এবারের যে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ব্যাপকতা থাকবে দীর্ঘমেয়াদে।

দলীয় সূত্র জানায়, আগামী কাউন্সিলে সবচেয়ে বড় চমকের দেখা মিলবে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে অনেক প্রভাবশালী নেতার দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার রিপোর্ট এরই মধ্যে দলের হাইকমান্ডের নজরে এসেছে। অর্থাৎ কাউন্সিলে অনেক হেভিওয়েট নেতারা পদ হারালে অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না। আবার অনেক প্রতিশ্রুতিশীল নেতা উঠে আসবেন যাদের নামের পাশে ‘ক্লিন ইমেজ’ তকমা আছে।

নেতারা জানিয়েছেন, দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানে শুধু কেন্দ্রীয় নেতারাই নন, এর আওতায় আসছেন তৃণমূল পর্যায়ের নেতারাও। তৃণমূলেও ক্লিন ইমেজের নেতাদের তুলে আনা হবে। -ডেস্ক